আকাশটা আবারো গর্জে ওঠে। হাসানের কক্ষের দরজা-জানালা ও ছাদ সজোরে কেঁপে ওঠে। ছাদের উপর এমন শব্দ হতে শুরু করে, যেনো ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ঝড়-বৃষ্টিতে আকাশ-জমিন কাঁপছে। ভয়ে আবেগে হাসানের পক্ষে আর স্থির থাকা সম্ভব হচ্ছে না। মাঝে-মধ্যে মনে হচ্ছে, যেনো সে স্বপ্ন দেখছে। হাসান আল্লাহর সঙ্গে এভাবে কখনো কথা বলেনি। চুপচাপ নামায আদায় করে সংক্ষেপে দুআ করে জ্যাকবে পরিণত হয়ে যেতো হাসান।
আজ রাত হাতেমকে রিপোর্ট করে যখন হাসান ফিরে এলো, তখন তার মনের অবস্থা ছিলো অন্যদিনের চেয়ে ব্যতিক্রম। তার ঘুম পাচ্ছিলো। কিন্তু সম্মুখে এমন একটি সমস্যা যে ভাবতে ভাবতে হাসান পাগলের মতো হয়ে যেতে শুরু করে। তার জন্য সহজ পথ এই ছিলো, যে সমস্যার কোন সমাধান নেই, তা মাথা থেকে ফেলে দিতো। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী, আলী বিন সুফিয়ান এবং তার নেতা হাতেম তো জানতেন না ইযযুদ্দীনের দূত বল্ডউইনের নিকট এসেছে এবং কিছু একটা চুক্তি হচ্ছে। নিজে চুপ থাকলেই হতো। চাকরির বেতন-ভাতাটা তো ঘরে বসে পিতা-মাতা ঠিকই পেয়ে যাচ্ছেন। বৈরুতে নিজে থাকছে রাজার হালে। কিন্তু হাসান আল ইদরীস একজন মর্দে মুমিন। কর্তব্যকে নামায-রোযারই মতো গুরুত্বপূর্ণ আমল মনে করে হাসান। হাসান মনে করে, জাতির প্রতিজন সদস্য যদি ভাবে কাজটা অন্য কেউ করবে, আমি না করলেও চলবে, তাহলে পরাজয়ই জাতির ভাগ্যলিপি হয়ে যেতে বাধ্য।
***
হাসান রাতে একতিল ঘুমায়নি। এখন জায়নামাযেই ঘুম চেপে ধরেছে তাকে। এই আবেগময় অবস্থায় তার ঘুম না পাবারই কথা ছিলো। কিন্তু এই নামায ও দুআর পর হাসান এমন শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করে যে, তার শান্তিময় আত্মা অস্থির দেহ ও মস্তিষ্ককে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। হাসান সেখানেই কাৎ হয়ে পড়ে থাকে। জায়নামাযটা লুকিয়ে ঈসার মূর্তি, মরিয়মের ছবি এবং ক্রুশটা খাটের নীচ থেকে তুলে এনে আপন আপন জায়গায় রেখে দেবে, সেই সুযোগটাও পেলো না। একটা সুখনিদ্রা এসে ঝাঁপটে ধরেছে যেনো তাকে। প্রয়োজন ছিলো, ভেতরে সব ঠিকঠাক করে দরজাটা খুলে রেখে জ্যাকবের বেশে শুয়ে পড়া।
হাসান স্বপ্নের জগতে চলে যায়। স্বপ্নে মসজিদে আকসা দেখে। এই মসজিদটা সে একবার দেখেছিলো। যখন বাইতুল মুকাদ্দাসে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিলো, তখন। মসজিদটা অনাবাদ ছিলো। তার উন্মুক্ত দরজাগুলো চোখ মেলে নামাযীদের চেয়ে চেয়ে দেখছিলো। কিন্তু মুসলমানরা নামায পড়ছে অন্যান্য মসজিদে কিংবা নিজ নিজ ঘরে। ইহুদী খৃস্টানদের সন্তানরা মসজিদের আঙ্গিনাটাকে খেলার মাঠ বানিয়ে রেখেছিলো। সেখানে অসংখ্য ছেলেমেয়ে জুতা পায়ে খেলা করছিলো। খৃষ্টানরা সেখানকার মুসলমানদের সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলো। হাসান মসজিদে আকসার পবিত্র ভূমি এবং মুসলমানদের জন্য তার গুরুত্ব ভালোভাবেই জানতো। সেখানে তার নাম ছিলো রেফ নেকালসন।
এখন হাসান বৈরুতে স্বপ্নে মসজিদে আকসা দেখছে। মসজিদের গম্বুজের উপর অনেকগুলো পায়রা বসে আছে। সবগুলো পায়রা একসঙ্গে উড়ে শূন্যে উঠে স্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়ে যায়। ফুলিঙ্গগুলো মসজিদে আকসার আশপাশে পড়তে শুরু করে। খৃস্টান ও ইহুদীদের একটি ভিড় বেরিয়ে আসে। তাদের প্রত্যেকের গায়ের পোশাকে আগুন ধরে গেছে। তারা সকলে এদিক-ওদিক পালিয়ে যাচ্ছে। তারা চীৎকার ও হৈ-হুঁল্লোড় করছে। কিন্তু কারো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ স্ফুলিঙ্গগুলো রং-বেরঙের পাখিতে পরিণত হয়ে যায়। পাখিগুলো মসজিদে আকসার সবুজ গম্বুজের উপর গিয়ে বসতে শুরু করে। এখন মসজিদে না কোন ইহুদী আছে, না খৃস্টান।
হাসান ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে হাঁটা দেয়। আকাশটা নীল। দিনের আলোতেও নীল। মসজিদের দরজায় এমন চাকচিক্য দেখা যাচ্ছে যেনো বড় একটি আয়নার উপর সুর্যের কিরণ এসে পড়েছে।
হাসানের চোখ ধাধিয়ে যায়। সে চোখ দুটো বন্ধ করে আবার খোলে। কিন্তু এখন আর সেখানে সেই আলোর ঝিলিক নেই। দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। সারা। সারা মিটিমিটি হাসছে। হাসান বিস্ময়াভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারা মাথা থেকে পা পর্যন্ত চাঁদের ন্যায় সাদা চাদরে আবৃতা। শুধু মুখমণ্ডল আর হাত দুটো দেখা যাচ্ছে। তার হাসি মুখের দাঁতগুলো এতো শ্বেত-শুভ্র দেখাচ্ছে, যে শুভ্রতা এই পৃথিবীর মানুষ কখনো দেখেনি। সারা তার বাহু দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে দেয়। ঠোঁট দুটো বন্ধ। কিন্তু হাসান তার সুরেলা কণ্ঠ শুনতে পায়- এসো পড়ো, মসজিদে আকসা আমাদের। যে কাফের এই মসজিদে প্রবেশ করবে, আকাশ তার উপর আশুন বর্ষণ করবে। যে মুসলমান এই মসজিদের পবিত্রতা ভুলে গেছে, তারও উপর আগুন বর্ষিত হবে। আমি তার আঙ্গিনাকে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে দিয়েছি। আমার সব পাপ মুছে গেছে। আসে- আসো।
হাসানের চোখ খুলে যায়। সে আবার চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে। এই সুখময় স্বপ্ন থেকে ফিরে আসতে চাইছে না হাসান। কিন্তু মুদিত চোখে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না। হাসান বাস্তব জগতে ফিরে এসেছে। ছাদের উপরে এবং এদিক-ওদিক মুষলধারা বৃষ্টির কানফাটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রের ভয়ানক গর্জন। সমুদ্রটা এখন পূর্বের তুলনায় বেশি ক্ষিপ্ত। ঝড়-বৃষ্টি এবং রোম উপসাগরের এই তর্জন গর্জনের মধ্যেই হঠাৎ হাসানের মনে হলো, কে যেনো দরজায় করাঘাত করেছে। এটা তার কল্পনাও হতে পারে। তবু হাসান শয্যা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। ক্রুশ ও ঈসা-মরিয়মের প্রতিকৃতি দুটো নিজ নিজ স্থানে ঝুলিয়ে রাখে। দরজায় আবারো করাঘাত পড়ে। হাসান জায়নামাযটা ভাজ করে লুকিয়ে রেখে দরজা খুলে দেয়।
