সুলতান আইউবীর সামরিক উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রধান, একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিতু খাদেমুদ্দীন আল-বারূক এই অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক। এদিকের কিছুই তার কানে ঢুকছে না। চোখেও পড়ছে না কিছুই। পার্শ্বস্থিত মেয়েটি যাদু হয়ে জেঁকে বসেছে তার মাথায়। মেয়েটির প্রেম-সাগরে চালিয়ে গেছে সে। মন দেয়া-নেয়ার খেলা জমে উঠেছে দুজনের মধ্যে। মেয়েটিকে একস্থানে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলে আল-বার্ক। মেয়েটি বলে, আমি বুদ্ধের ক্রীতদাসী। আমি তার হাতে বন্দী হয়ে আছি। সে আমাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে। মেয়েটি আরো জানায়, বৃদ্ধের ঘরে চারটি স্ত্রী।
নিজের পদমর্যাদার কথা ভুলে যায় আল-বার্ক। প্রেম-পাগল তরুণের ন্যায় .. মিলনের জন্য মেয়েটিকে এমন সব স্থানে আসতে প্রস্তাব করে, যেখানে বখাটেরা ছাড়া যায় না আর কেউ। একটি জায়গা পছন্দ হয়ে যায় মেয়েটির। শহরের বাইরে পরিত্যক্ত পুরনো এক জীর্ণ ভবন। মেয়েটিকে বৃদ্ধের কবল থেকে মুক্ত। করার চেষ্টা করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয় আল-বার্ক। সাক্ষাতের দিন-ক্ষণ ঠিক করে আলাদা হয়ে যায় দুজন।
***
তৃতীয় রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে আল-বার্ক। একজন শাসকের শান নিয়ে বের হতো সে। কিন্তু আজ বের হলো চোরের ন্যায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাঁটা দেয় একদিকে। গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন কায়রো শহর। নীরবতা বিরাজ করছে। সর্বত্র। সামরিক মহড়া শেষ হয়ে গেছে দুদিন হলো। চলে গেছে বহিরাগত দর্শনার্থীরা। অস্থায়ীভাবে নির্মিত পতিতালয়গুলো তুলে দেয়া হয়েছে সরকারী নির্দেশে। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত চালাচ্ছে বহিরাগত কোন মেয়ে বা সন্দেহভাজন শহর কিংবা শহরতলীর কোথাও রয়ে গেলো কিনা। মেলার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। মাত্র দুদিনে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছে চার । হাজার যুবক । আরো ভর্তি হবে বলে আশা করছেন সুলতান আইউবী।
শহরের বাইরে চলে যায় আল-বার্ক। সে নির্ধারিত ভবনটির দিকে এগিয়ে । যাচ্ছে। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। নীরব-নিস্তব্ধ রজনী। মেয়েটি বলেছিলো, সে বৃদ্ধের কয়েদী। সারাক্ষণ তার চোখে চোখে থাকতে হয়। তবু আল-বার্কের আশা, মেয়েটি আসবে অবশ্যই। সম্ভাব্য বিপদের মোকাবেলা করার জন্য তার হাতে আছে খঞ্জর। নারী এমনি এক যাদু, যা একবার কারো · উপর সওয়ার হয়ে বসলে আর রক্ষা নেই। নারীর প্রেমেপড়া পুরুষটি পরোয়া করে না কিছুর-ই। তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায় ।
আল-বার্ক একজন পরিণত বয়সের পুরুষ। কিন্তু এখন সে একটি নির্বোধ আনাড়ী যুবক।
ভবনটির নিকটে চলে আসে আল-বারক। সম্মুখে অন্ধকারে আপাদমস্তক কালো চাদরে আবৃত একটি ছায়ামূর্তি চোখে পড়ে তার। চোখের পলকে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ছায়াটি ।
হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় আল-বার্ক। প্রেমের নেশা তার সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে–ডর-ভয়, আত্মমর্যাদাবোধ সব। সে পুরনো পরিত্যক্ত জীর্ণ ভবনটির সামনে এসে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক ইতিউতি তাকিয়ে ভাঙ্গা দেয়ালের ফাঁক। দিয়ে-ই ভিতরে প্রবেশ করে। কবরের অন্ধকার বিরাজ করছে ভবনটিতে। সম্মুখে একটি কক্ষ। মাথার উপর দিয়ে ফড় ফড় করে দ্রুতগতিতে উড়ে গেছে কি একটা পাখি। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা লাগে তার গায়ে। পরক্ষণেই চি চি শব্দ শুনতে পায় সে। বুঝা গেলো এগুলো চামচিকা।–এখান থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে যায় আল-বারক। ঢুকে পড়ে আরেকটি কক্ষে। কারো ক্ষীণ পদশব্দ তার কানে আসে। এখানে কেউ আছে বলে অনুমান করে। কোমর থেকে খঞ্জর বের করে হাতে নেয়। মাথার উপর তার ভীতিকর ফড় ফড় শব্দে চামচিকা উড়ছে। আল-বার্ক ক্ষীণ কণ্ঠে ডাক দেয়—আসেফা?
আরে, আপনি এসেছেন? খানিকটা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজেস করে মেয়েটি। কিন্তু কোন জবাবের অপেক্ষা না করেই ছুটে এসে গা ঘেষে দাঁড়ায় আল-বার্কের। লোকটাকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত চাপা কণ্ঠে বলতে শুরু করে শুধু আপনার খাতিরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে এসেছি। আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। বুড়োকে মদের সঙ্গে বড়ি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। জেগে ওঠলে বিপদ হবে।
কেন, মদের সঙ্গে বিষ খাওয়াতে পারলে না? জিজ্ঞেস করে আল-বার্ক।
আমি কখনো কাউকে খুন করিনি। আমি মানুষ হত্যা করতে পারি না। একজন পর পুরুষের সঙ্গে প্রেম-নিবেদন করার জন্য এমন এক ভয়ঙ্কর স্থানে আসতে হবে, এমনটি ভাবিনি আমি কখনো। জবাব দেয় মেয়েটি।
মেয়েটিকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরে আল-বার্ক। ভোগের নেশায় উন্মাতাল তার হৃদয়। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠে পিছনের কক্ষে। যে কক্ষটি অতিক্রম করে আল-বারূক এখানে এসে পৌঁছেছে, তার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে দুটি লণ্ঠন। লাঠির মাথায় তেলভেজা কাপড়ে আগুন জ্বালিয়ে বানানো প্রদীপ। আসেফাকে নিজের পিছনে নিয়ে লুকিয়ে ফেলে আল-বারূক। হাতে তার খঞ্জর। এরা কি এই পরিত্যক্ত ভবনে বসবাসকারী কাল-ভূত, নাকি মেয়েটিকে ধাওয়া করতে তার স্বামী এসে পড়লো? উত্তষ্ঠিত ভাবনার জগত থেকে এখনো ফিরে আসেনি আল-বারক । হঠাৎ গর্জে উঠে একটি কণ্ঠ, দুটাকেই খুন করে ফেলল।
একেবারে নিকটে চলে আসে লণ্ঠন দুটো। তার কম্পমান আলোয় চারজন লোক দেখতে পায় আল-বার্ক ও আসেফা। একজনের হাতে বর্শা, তিনজনের যতে তরবারী। এক মাথা মাটিতে গেড়ে লণ্ঠন দুটোকে দাঁড় করিয়ে রাখে। তারা। আলোকিত হয়ে উঠে ভবনটির আঙ্গিনা। আল-বার্কের চারপার্শ্বে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় ধীরে ধীরে চক্কর দিতে শুরু করে চারজন লোক। আসেফা তার পিছনে জড়সড় দণ্ডায়মান। পার্শ্বের কক্ষ থেকে আবার গর্জে উঠে একজন পেয়েছিস? জ্যান্ত ছাড়বি না কিন্তু। এটি মেয়েটির বৃদ্ধ স্বামীর কণ্ঠ।
