আল-বার্কের পিছন থেকে সরে সামনে এগিয়ে আসে আসেফা। ক্ষোভ ও ঘৃণা মিশ্রিত কণ্ঠে বৃদ্ধকে উদ্দেশ করে বলে–সামনে আসো, আগে আমাকে খুন করো। আমি তোমাকে ঘৃণা করি, অভিসম্পাত দেই। কারো প্ররোচনায় নয়। আমি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছি।
সশস্ত্র চার ব্যক্তি আল-বার্ক ও আসেফার চারদিকে দণ্ডায়মান। বর্শাধারী লোকটি ধীরে ধীরে আসেফার প্রতি বর্শা এগিয়ে ধরে এবং আগাটা মেয়েটির পাজরে ঠেকিয়ে বলে–মরণের আগে বর্শার আগা কেমন দেখে নাও; কিন্তু এই বেটা তোমার আগে ছটফট করে তোমার সামনে মৃত্যুবরণ করবে, যার টানে তুমি এখানে ছুটে এসেছে।
আসেফা মুখে কোন জবাব না দিয়ে ঝট করে বর্শাটা ধরে ফেলে এবং ঝটকা এক টান দিয়ে বর্শাটা হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। আল-বার্ক থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে ঝাঝাল কণ্ঠে বলে–আসো, সাহস থাকলে আমার সামনে আসো। আমার আগে একে তোমরা কিভাবে হত্যা করবে, আমি দেখে ছাড়বো!
খঞ্জর উঁচিয়ে মেয়েটির সামনে চলে আসে আল-বার্ক। আসেফা যার হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিয়েছিলো, খঞ্জরের আঘাত হানে তার উপর । পিছন দিকে পালিয়ে যায় লোকটি। পার্শ্ব পরিবর্তন করে তার সঙ্গীরা। তরবারী উদ্যত করলেও তারা আল-বার্কের উপর আক্রমণ করে না। অথচ, এ-স্থানে একটা লোককে হত্যা করা ব্যাপার-ই নয়। গর্জন করে চলেছে আসো । বারবার এগিয়ে গিয়ে হামলা করে ঠিক, কিন্তু তার প্রতিটি আঘাত-ই ব্যর্থ হচ্ছে । আল-বার্ক খঞ্জর দ্বারা আঘাত হানে একজনের উপর। সঙ্গে সঙ্গে হাঁক ছেড়ে দুজন চলে আসে তার পিছনে। আসেফাও এক লাফে তার পিছনে চলে আসে। সে হাতের বর্শাটি দিয়ে তরবারীর মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু লাফ-ফাল আর তর্জন-গর্জন ছাড়া কিছু-ই করছে না সে।
একধারে দাঁড়িয়ে নিজের লোকদের উত্তেজিত করছে বৃদ্ধ। আল-বার্ক ও আসেফার উপর তারা বারবার আক্রমণ চালাচ্ছে। তাদের উপর বারবার আঁপিয়ে পড়ছে আসো । আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করছে আল-বার্ক। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, মেয়েটির উপর্যুপরি আক্রমণ সত্ত্বেও আহত হলো না একজনও। বৃদ্ধের লোকেরা তরবারী চালনায় পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা সত্ত্বেও আসেফা ও আল-বারূক অক্ষতই রয়ে গেলো। একটি আঁচড় লাগলো তাদের গায়ে। হঠাৎ বৃদ্ধ উচ্চকণ্ঠে বলে উঠে আক্রমণ থামাও। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় যুদ্ধ।
এমন বে-ওফা, অসভ্য মেয়েকে আমি আর ঘরে রাখতে চাই না। ঘুড়িটা যে এতো দুঃসাহসী, নির্ভীক, তা আগে আমি জানতাম না। এখন জোর করে ঘরে নিয়ে গেলেও সমস্যা; সুযোগ পেলে বেশ্যাটা আমাকে নির্ঘাত মেরেই ফেলবে। ঝাঝাল কণ্ঠে বললো বৃদ্ধ।
আমি তোমাকে এর উপযুক্ত মূল্য দিয়ে দেবো; বলো কত দিয়ে কিনেছিলে। উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বললো আল-বার্ক।
ডান হাতটা প্রসারিত করে এগিয়ে আসে বৃদ্ধ। আল-বার্কের হাতে হাত মিলিয়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, মূল্য দিতে হবে না। আমার সম্পদের অভাব নেই। মেয়েটিকে তুমি এমনিতেই নিয়ে যাও। তোমার সঙ্গে ওর এতই যখন ভালোবাসা, তো ওকে আমি তোমার হাতে তুলে দিলাম। তাছাড়া ও যোদ্ধা বংশের সন্তান, আমি হলাম গিয়ে ব্যবসায়ী, সওদাগর মানুষ। তোমার ঘরে-ই ওকে ভালো মানাবে। তুমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সরকারের কর্মকর্তা। আমি সুলতানের অনুগত ও ভক্ত। তোমাকে আমি নারাজ করতে পারি না। আমি মেয়েটিকে তালাক দিয়ে দিলাম এবং তোমার জন্য হালাল করে দিলাম ….। চলো দোস্ত! আমরা যাই। বলেই তারা লণ্ঠন দুটো হাতে তুলে নিয়ে চলে যায়।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে আল-বার্ক। তার পায়ের তলার মাটি কাঁপতে শুরু করে যেন। এমন একটি অভাবিত ঘটনা ঘটে গেলো, তা যেন তার বিশ্বাস-ই হচ্ছে না। একে বৃদ্ধের প্রতারণা বলে সংশয় জাগে তার মনে। আশংকা জাগে, পথে ওঁৎ পেতে বসে থেকে তারা দুজনকে-ই তারা করে ফেলে কিনা।
একটি বর্শা ছিলো আসেফার হাতে। আল-বারূক সেটি নিজের হাতে নিয়ে খানিক অপেক্ষা করে মেয়েটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ভবন থেকে। ডানে-বাঁয়ে-পিছনে সতর্ক দৃষ্টি রেখে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে দুজন। কিছু একটা শব্দ কানে এলে-ই চকিত নয়নে থমকে দাঁড়ায়। অন্ধকারে চারদিক ইতিউতি দেখে নিয়ে আবার শুরু করে পথ চলা। শহরে প্রবেশ করার পর তারা দেহে জীবন ফিরে আসে। আসেফা আল-বারকের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, আপনি সত্যিই কি আমাকে বিশ্বাস করেন? জবাবে মুখে কিছু না বলে আল-বারক বুকের সঙ্গে চেপে ধরে মেয়েটিকে।আবেগের আতিশয্যে কোন শব্দ বের হচ্ছে না তার মুখ থেকে। একটি অচেনা মেয়ের প্রেম অতীত জীবনের সকল অর্জন ছিনিয়ে নিয়েছে আল-বারকের। আল-বার্কের স্ত্রী বয়সে তার সমান। এতকাল মন উজাড় করে ভালবাসা দিয়ে এসেছে সে তাকে। কিন্তু আসেফাকে পেয়ে এখন তার মনে হচ্ছে, স্ত্রীর কোন মূল্য-ই নেই তার কাছে।
সে যুগে নারী বেচাকেনা হত। একত্রে চারটি বউ রাখাকে ন্যায্য অধিকার মনে করতো পুরুষরা। বিত্তশালীরা তো বিবাহ ছাড়াই দুচারটি সুন্দরী মেয়ে ঘরে তুলতো। এই নারী-ই ধ্বংস করেছিলো মুসলিম আমীর-শাসকদের। স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য খুঁজে খুঁজে, সুন্দরী মেয়েদের সংগ্রহ করে স্বামীকে উপহার দিতো স্ত্রীরা।
