সুলতান আইউবীর নেতৃত্বে উপবিষ্ট ও দণ্ডায়মান দর্শনার্থীদের সম্মুখ দিয়ে সামনে বেরিয়ে আসে এসব আরোহী ও পদাতিক বাহিনী। রাস্তা থেকে মোড় ঘুরে আবার মাঠে ফিরে এসেছেন সুলতান। সম্মুখে তার পতাকাবাহীদের ঘোড়া। ডানে-বাঁয়ে ও পিছনে রক্ষীবাহিনী। তাদের পিছনে নায়েব ও সালারদের বাহন।
মাঠে এসেই হঠাৎ থেমে যান সুলতান আইউবী। এক লাফে নেমে পড়েন ঘোড়ার পিঠ থেকে। হাত নেড়ে দর্শনার্থীদের সালাম ও অভিনন্দন জানাতে জানাতে চলে যান শামিয়ানার নীচে। দাঁড়িয়ে যায় সকলে। সুলতান আইউবী সবাইকে সালাম করে বসে পড়েন নির্দিষ্ট আসনে।
আরোহী ও পদাতিক বাহিনী মাঠ পেরিয়ে খানিক দূর অতিক্রম করে অদৃশ্য হয়ে যায় টিলার আড়ালে। দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে মাঠে প্রবেশ করে এক অশ্বারোহী। এক হাতে তার ঘোড়ার লাগাম, অপর হাতে উটের রশি। ঘোড়ার গতির সঙ্গে তাল রেখে একটি উটও ছুটে আসছে তার পিছনে। মাঠের মধ্যখানে এসে আরোহী হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে যায় ঘোড়াটির পিঠে। লাফ দিয়ে চলে যায় উটের পিঠে। দাঁড়িয়ে থাকে সটান। আবার লাফিয়ে চলে আসে গোড়ার পিঠে। সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাটিতে। ঘোড়া ও উটসহ এগিয়ে যায় কয়েক পা । লাফিয়ে চড়ে বসে ঘোড়ার পিঠে । তার ঘোড়া ও উট ছুটে চলছে সমান তালে। ঘোড়ার পিঠ থেকে চলে যায় উটের পিঠে। ছুটে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় একদিকে ।
খাদেমুদ্দীন আল-বারক মাথাটা সামান্য এলিয়ে দেয় বাঁ দিকে। এখন তার মুখ আর মেয়েটির মাথার মাঝে ব্যবধান দু থেকে তিন ইঞ্চি। তার প্রতি তাকায় মেয়েটি। মুখ টিপে হাসে আল-বারূক। লজ্জা পায় মেয়েটি। বৃদ্ধ তাকায় দু জনের প্রতি। কপালে ভাজ পড়ে যায় তার।
আচমকা ঘোড়াগাড়িতে করে নিয়ে আসা ডেকচির মত পাত্রগুলো টিলার পিছন থেকে উড়ে এসে নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে মাঠে। একের পর এক পাত্র এসে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে আর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হচ্ছে। তেল ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। অন্তত একশত পাত্র নিক্ষিপ্ত হয় এবং তার তরল পদার্থগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এমন সময়ে টিলার উপর আত্মপ্রকাশ করে ছয়জন তীরন্দাজ। তারা জ্বলন্ত সলিতাওয়ালা তীর ছুঁড়ে। মাঠের বিক্ষিপ্ত তরল পদার্থের উপর এসে নিক্ষিপ্ত হয় তীরগুলো। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুন জ্বলে ওঠে। মাঠের এক হাজার বর্গগজ জায়গা জুড়ে এখন আগুন জ্বলছে।
ঠিক এমন সময়ে একদিক থেকে তীরগতিতে ছুটে আসে চার অশ্বারোহী। কিন্তু কি আশ্চর্য! তারা আগুনের কাছে এসে থামলো না। গতি হ্রাসও করলো না। শাঁ শাঁ করে ঢুকে পড়ল জ্বলন্ত শিখার মধ্যে। নির্বাক অনিমেষ নয়নে তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে দর্শনার্থীরা। লোকগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে নিশ্চিত। কিন্তু না, তারা জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মধ্যে দিব্যি দৌড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যায় অন্যদিক দিয়ে। খুশীতে আত্মহারা হয়ে যায় দর্শনার্থীরা। আনন্দের আতিশয্যে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তারা তাকবীর ধ্বনি তোলে। আগুন ধরে গিয়েছিলো দু আরোহীর কাপড়ে। তারা ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে পানির উপর লাফিয়ে পড়ে। গড়ানি খায় দু তিনবার। তাদের কাপড়ের আগুন নিভে যায় ।
এই শোরগোল, আনন্দ-উল্লাস এবং অশ্বারোহীদের বীরত্ব প্রদর্শনের দৃশ্যের প্রতি আল-বার্কের মন নেই। সে এর থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন। পার্শ্বের রূপসী মেয়েটিকে নিয়ে-ই ঘুরপাক খাচ্ছে তার সব ভাবনা-চিন্তা। সে প্রেম-সাগরে হারিয়ে যায়।
আল-বার্কের প্রতি এক নজর তাকিয়ে মুচকি একটি হাসি দিয়েই আবার বৃদ্ধের প্রতি দৃষ্টিপাত করে মেয়েটি। এবার কেন যেন উঠে চলে গেলো বৃদ্ধ। মেয়েটি তার গমন পথে তাকিয়ে থাকে। আল-বার্কের জানা ছিলো, মেয়েটি বৃদ্ধের সঙ্গে এসেছে। তাই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে তোমার পিতা কোথায় চলে গেলেন?
ইনি আমার পিতা নন–স্বামী। জবাব দেয় মেয়েটি।
স্বামী? তা এই বিয়ে কি তোমার বাবা-মা দিয়েছেন? বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে আল-বার্ক।
না, তিনি আমায় কিনে এনেছেন। ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে জবাব দেয় মেয়েটি।
এখন গেলেন কোথায়? প্রশ্ন করে আল-বার্ক।
আমার প্রতি নারাজ হয়ে চলে গেছেন। তার সন্দেহ, আমি আপনার সঙ্গে প্রেম নিবেদন করছি। জবাব দেয় মেয়েটি।
আচ্ছা, সত্যিই কি তুমি আমার প্রতি ভালবাসার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছো? কৌতূহলী কণ্ঠে জানতে চায় আল-বার্ক।
স্বলাজ হাসি ফুটে উঠে মেয়েটির ওষ্ঠাধরে। ফিসফিস করে বলে, বুড়োটাকে আমার আর ভালো লাগে না; এর ব্যাপারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এর থেকে যদি কেউ আমাকে মুক্ত না করে, তবে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার কোন পথ থাকবে না।
সামরিক মহড়া ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি দর্শনার্থীরা। তারা দেখেছিলো শুধু সুদানী ফৌজ, যারা শ্বেতহস্তী হয়ে বসেছিলো রাজকোষের উপর। তাদের কমাণ্ডাররা বাইরে বের হতো রাজা-বাদশাহদের ন্যায়। সঙ্গে সেনাবহর থাকলে তারা পল্লীবাসীদের জন্য আপদ হয়ে দেখা দিতো। জনগণের গরু-ছাগল ছিনিয়ে নিয়ে যেতো। কারো নিকট উন্নত জাতের একটি ঘোড়া দেখলে সেটি কেড়ে নিয়ে যেতো। মানুষ বুঝতো, সরকার সৈন্য পুষে প্রজাদের উপর নিপীড়ন চালানোর-ই জন্য।
কিন্তু সুলতান আইউবীর বাহিনী সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সুলতানের বাহিনীর একটি অংশ মহড়ার মাধ্যমে আজ অনুপম বীরত্ব প্রদর্শন করলো। অপর এক অংশ সুলতানের পরামর্শে একাকার হয়ে গেছে জনতার মধ্যে। উদ্দেশ্য, জনতার সঙ্গে মিশে, কথা বলে এই ধারণা সৃষ্টি করা যে, আমরা তোমাদের ভাই, তোমাদেরই একজন। তোমাদের কল্যাণেই আমাদের আবির্ভাব;; নগণের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী অসৎ সৈন্যদের জন্য কঠোর শাস্তি : } } করে. এই সুলতান আইউবী।
