নামায় শেষ করে হাসান দুআর জন্য হাত তুলে। চক্ষু বন্ধ হয়ে যায়। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে- মুসলমানের প্রথম কেবলা মসজিদে আকসার খোদা! তোমার নাম উচ্চারণকারী, তোমার রাসূলের কালেমা পাঠকারী মুসলমান কাফেরদের ভয়ে তোমার মসজিদে আকসায় তোমার সমীপে সেজদাবনত হতে ভয় পাচ্ছে। তোমার প্রথম কেবলা আজ বিরান হয়ে গেছে। যে ভূখণ্ড তোমার রাসূলের পদধূলিতে পবিত্র ও বরকতময় হয়েছিলো, তার উপর আজ ক্রুশের ছায়া পড়ে আছে। যে বনী ইসরাইলকে তুমি বিতাড়িত করে দিয়েছিলে, তারা আজ তোমার প্রথম কেবলাকে হাইকেলে সুলায়মানী বলছে। হে আমার আল্লাহ! আমাকে তুমি তোমার বড়ত্বের প্রমাণ দাও। বললো, তুমি মহান নাকি ইহুদীদের খোদা মহান। বলল, ঈসা তোমার কাছে আছেন নাকি ক্রুসেডারদের ক্রুশের উপর ঝুলছেন। আমাকে তোমার মহত্ত্বের প্রমাণ, দাও। তোমার কুরআনের মহত্ত্বের প্রমাণ দাও। তোমার রসূলের মহত্ত্বের প্রমাণ দাও। আমাকে, ইহুদী ও খৃস্টানদেরকে তোমার রাসূল ও কুরআনের মহত্ত্ব বুঝাবার যোগ্যতা দান করো। যে পাহাড়গুরো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এবং তোমার প্রথম কেবলার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে, আমাকে সেগুলো চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়ার যুক্তি ও সাহস দান করো। আমাকে তুমি আলো দান করো, যেনো এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আমি আমার কর্তব্যের গন্তব্য দেখতে পাই। আমাকে তুমি এমন কঠিন পরীক্ষায় নিক্ষেপ করো, যেনো আমার জীবন তোমার নামে কুরবান হয়ে যায়। তবে প্রতিশ্রুতি দাও, আমার জীবন বৃথা যাবে না। আমাকে তুমি সেই সাহস ও আলো দান করে, যার মাধ্যমে আমি তোমার জন্য শাহাদাতবরণকারী মর্দে মুজাহিদদের প্রতি ফোঁটা রক্তের প্রতিশোধ নিতে পারি। আমাকে তুমি সাহস দান করো, যেনো আমি কুফরের প্রতিটি দুর্গকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারি। তুমি আমাদের সকলকে সাহস ও হেদায়াত দান করো, যেনো আমরা আমাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারি, যেনো অনাগত প্রজন্ম বলতে না পারে আমরা আত্মমর্যাদাহীন মানুষ ছিলাম। আজ পাথরের মূর্তিরাও তোমার নামে ঠাট্টা করছে। তুমি আমাকে বীরত্ব দান করো, যেনো আমি এই মূর্তিগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তোমার নাম সমুন্নত করতে পারি। হে আমার আল্লাহ! অন্যথায় তুমি আমার দেহের রক্তগুলো পানি করে দাও। আমাকে এমন আত্মমর্যাদাহীন করে দাও, যেন আমি ভুলেই যাই আত্মমর্যাদা কাকে বলে। তুমি আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে নিয়ে নাও, যেনো আমি ইসলামের কন্যাদের নির্লজ্জ ও বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে না পাই। তুমি আমার শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে নাও, যেনো আমি তোমার নাম শুনতে না পাই। যেনো আমি সেই মুসলমানদের ফরিয়াদ গুনতে না পাই, যারা ফিলিস্তীনে ইহুদী-খৃষ্টানদের গোলাম হয়ে আছে।
হাসানের কণ্ঠ উঁচু হয়ে যায়- তুমি কোথায়? তুমি কি আছো, নাকি নেই? বলো আমার আল্লাহ! বলল, আমাকে বাশক্তিদানকারী আল্লাহ! বলো, ইসলাম সত্য, নাকি ক্রুশ সত্য। অন্যথায় আমাকেই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার দাও, সত্য কে ইসলাম না কুশ। বলল, বলল।
কণ্ঠটা ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে হাসান আল-ইদরীসের। খোদার দরবারে আকুতির চূড়ান্তে পৌঁছে গেছে লোকটা। এখন মনে হচ্ছে যেনো ছাদটা দুলছে। পরক্ষণেই এমন বিকট শব্দে আকাশে বজ্রপাত ঘটে, যেনো হাসানের কক্ষটা দুলে ওঠে। হাসান কক্ষের দরজায় বিজলির ঝলকানি দেখতে পায়। এবার সে কণ্ঠটা আরো উঁচু করে বলে ওঠে- হে আল্লাহ! এই বত্র দ্বারা আমাদের মসজিদে আকসাকে ভস্ম করে দাও। মুসাফির মনযিল উভয়কে তুমি ধ্বংস করে দাও।
আবারো বজ্রপাত ঘটে। বৈরুতের সমুদ্রোপকূল নিকটেই ছিলো। ঋতুটা নদ-নদীর শান্ত থাকার। কিন্তু এক্ষুণে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের পাহাড়সম ঊর্মিমালার ভয়ানক গর্জন এমন ধারায় হাসানের কানে এসে প্রবেশ করছে, যেনো রোম উপসাগরের ক্ষেপে যাওয়া ঢেউগুলো তার কক্ষের দেয়ালের সঙ্গে আছড়ে পড়ছে। বিজলীর চমক, বজ্রের গর্জন এবং সমুদ্রের উতলা একত্রিত হয়ে মহাপ্রলয়ের রূপ ধারণ করেছে। হাসানের কণ্ঠ আরো বেশি উঁচু হয়ে যায়।
এমনি একটি ঝড় আমার মধ্যে তুলে দাও, যেন আমি কুফরের প্রতিটি চিহ্নকে উড়িয়ে ও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারি। মসজিদের আকসার আঙ্গিনায় তুমি আমার খুন বইয়ে দাও। আমি লজ্জিত যে, প্রথম কেবলার মহান প্রহরী, সুলতান সালাহুদ্দীন এখানে তোমাদের সৈনিকদের নিয়ে এলেন আর আমি তাকে সতর্ক করতে পারলাম না, আপনি আসবেন না; বৈরুতে আপনার জন্য ফাঁদ প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আমি অক্ষম ছিলাম। তবুও স্বীকার করি, এটা আমার মস্তবড় গুনাহ। তুমি আমাকে এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সাহস ও বীরত্ব দান করো। অন্যথায় আমার বিবেক আমাকে দংশন করবে যে, তোমার খোদা বলতে আসলে কেউ নেই। আমাকে তুমি এই মূর্তিগুলোর সম্মুখে লজ্জিত করো না। তুমি যদি আমার দুআ কবুল না করো, তাহলে কেয়ামতের দিন আমার মৃতদেহে জীবন দিও না। অন্যথায় আমি তোমার কলার ধরে ফেলবো এবং তোমার সৃষ্টিকে বলবো, এই সেই খোদা যিনি আপন রাসূলের লাজ রক্ষা করেননি।
ইনি এমন এক খোদা, যদি রাসূলের অনুসারীদেরকে এতে অক্ষম ও অসহায় করে তুলেছিলেন যে, প্রথম কেবলা বিরান হয়ে গিয়েছিলো এবং তার উপর ক্রুশের অপচ্ছায়া পতিত হয়েছিলো।
