মিথ্যা ধর্মের পুজারীগণ!- মুসলিম কমান্ডার বললো- সৈনিকরা নারী শিশুদের পেছনে লুকায় না।
খৃস্টান সৈনিকরা বোধ হয় ভুলে গিয়েছিলো, পাড়ায় পুরুষ মানুষও আছে। তারা লোকগুলোকে অনেক সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলো। তারাও তাদের নারী-শিশুদের জীবনহানির ভয়ে তটস্থ। ইতিমধ্যে এক নারী হুংকার ছেড়ে বললো- এই কাফেরগুলো তো কাপুরুষ। তোমরা আমাদের জীবনের ভয় করছো কেন? মহিলা তার সম্মুখে দণ্ডায়মান তিন-চার বছর বয়সের একটা শিশুকে তুলে সম্মুখে মাটিতে ছুঁড়ে বললো- আমি সন্তুষ্টচিত্তে আমার এই সন্তানটিকে কুরবানী দিচ্ছি। তোমরা ঝাঁপিয়ে পড়ো। দশজন কাফেরের জীবন হরণ করার লক্ষ্যে আমি আমার এই সন্তানকে কুরবান করছি।
এক খৃস্টান তরবারী উঁচু করে মহিলাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু অতটুকু সুযোগ সে পেলো না। পেছন থেকে পাড়ার সকল পুরুষ বর্শা, লাঠি এবং যে যা হাতে পেয়েছে নিয়ে এসে খৃস্টান সৈনিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খৃস্টান সেনারা আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নারী ও শিশুদের পেছনে বসেছিলো। এবার তারা গ্রামবাসীদের মোকাবেলার জন্য উঠে দাঁড়ায়। অমনি মুসলিম সৈনিকরাও তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুতিনজন সৈনিক চীৎকার করে বলতে থাকে। মহিলারা পালিয়ে যাও। শিশুদেরকে একদিকে সরিয়ে নাও। মুসলিম সৈনিকদের ঘোড়াগুলো মরুঝড়ের ন্যায় ধেয়ে আসে। মহিলারা শিশুদের তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। দুপক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অল্পক্ষণের মধ্যে দুখৃস্টান সৈনিক ছাড়া সকলে মারা যায়। গ্রামবাসীরা তাদের লাশগুলো ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। তারা জীবিত খৃস্টানদেরকেরও নিজ হাতে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়। কিন্তু মুসলিম সেনাদলের কমান্ডার তাদের বড় কষ্টে বুঝাতে সক্ষম হয়, এদের মাধ্যমে এদের অন্যান্য সঙ্গীদের তথ্য বের করতে হবে। কাজেই এদের জীবিত বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন।
জীবিত দুখৃস্টান সেনাকে সুলতান আইউবীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহর হাতে তুলে দেয়া হলো। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাদের বললেন, ভালোয় ভালোয় তোমাদের অন্যান্য গেরিলাদের সব তথ্য বলে দাও। তারা ধরা খাওয়া পরাজিত সৈনিক। হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে সকল তথ্য বলে দেয়। এরা বল্ডউইনের বাহিনীর গেরিলা সৈনিক। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক কমপক্ষে এক হাজার গেরিলা সুলতান আইউবীর ফৌজ ও রসদের ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে বৈরুত থেকে প্রেরণ করা হয়েছে। এখনো তাদের স্থায়ী কোন আস্তানা গড়ে ওঠেনি। তারা সমগ্র অঞ্চলে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এভাবে ছোট পাড়া-পল্লী দখল করে সেখান থেকে খাদ্য ইত্যাদি সগ্রহ করতে এবং সুলতান আইউবীর সৈনিকদের কোণঠাসা করে রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জীবিত দুই সেনাকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে নিয়ে যাওয়া হলো। সুলতান তাদের বক্তব্য শুনেন এবং নির্দেশ দেন- দূরে কোথাও নিয়ে এদের হত্যা করে ফেলল। এরা খুনী ও লুটের অপরাধে অপরাধী।
সুলতান তার সালারদের বললেন- এতে প্রমাণিত হচ্ছে খৃস্টান গেরিলাদের মসুল কিংবা অন্য কোন দুর্গে অবস্থান গ্রহণের অনুমতি মেলেনি। অন্যথায় এই গ্রামটাকে আস্তানা বানাতো না। সুলতান নির্দেশ দেন। এ ধরনের প্রতিটি গ্রামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করে খোঁজ নাও। সৈনিকদেরকে কঠোরভাবে বলে দেবে, যেনো তারা গ্রামবাসীদের সঙ্গে কোন প্রকার দুর্ব্যবহার না করে। তারা তাদের ও ঘোড়র খাদ্য ফৌজের রসদ থেকে সংগ্রহ করবে। গ্রামবাসীদের থেকে একটি দানাও যেনো গ্রহণ না করে।
***
গোয়েন্দাদেরকে ঝুঁকি মাথায় নিয়েই কাজ করতে হয়। তথ্য সংগ্রহে তাদের অসাধ্য সাধনও করতে হয় আবার চেষ্টা করতে হয়, যাতে ধরা না পড়ে। হাসান গোয়েন্দা। এ মুহূর্তে তাকে যোগ্যতার পুরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। তার সারার সেই কথাগুলো মনে পড়ছে, যার দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, মেয়েটা মুসলমানদের ভালোবাসে। হাসান এও অনুভব করেছে যে, সারার মনে সন্দেহ জেগে গেছে, হাসান মুসলমান। ভাবতে ভাবতে হাসানের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
দূর থেকে ফজরের আযান কানে আসতে শুরু করেছে। আযানের অর্থবহ সুললিত বাক্যগুলো তার মন-মস্তিষ্কে ইসলাম ও মহান আল্লাহর মহত্ত্ব জাগিয়ে তোলে। আল্লাহই তাকে সাহায্য করতে পারেন। হাসান ওঠে অজু করে কক্ষের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। খৃস্টানদের এই জগতে হাসান মুসলমান নয়- খৃস্টান। হাসান আল ইদরীস নয়- গলবার্ট জ্যাকব।
ছোট্ট একটি কক্ষে একা থাকে হাসান। কক্ষে ক্রুশের সঙ্গে হযরত ঈসার প্রতিকৃতি ঝুলানো থাকে। দেয়ালে কোন চিত্রকরের আঁকা মেরির ছবি। হাসান প্রতিকৃতি, ছবি ও ক্রুশ দেয়াল থেকে সরিয়ে খাটের নীচে রেখে দেয়। দরজার ভেতর দিকের শেকলটা আটকে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে শুরু করে। হাসান প্রতিদিনই এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়ে থাকে। কিন্তু আজ ফজরের নামাযে যে আবেগময় অবস্থার সৃষ্টি হলো, তেমনটি অতীতে কোনদিন হয়নি। হাসানের চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে আসে। হাসান তেলাওয়াত করছে। আজ আবেগ তার নিয়ন্ত্রণ মানছে না। ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতায়ীন (আমি কেবল তোমারই ইবাদত করছি এবং একমাত্র তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি) বলার সময় তার কণ্ঠটা বেশ উঁচু হয়ে যায়। জীবনে তার এই প্রথমবার অনুভব হলো যেনো আল্লাহ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং এতে নিকটে যে ইচ্ছা করলে সে আল্লাহকে স্পর্শ করতে পারে।
