একদিন সন্ধ্যার আগে চৌকির দুজন সৈনিক পাহাড়ের এক স্থানে লুকিয়ে বসে যায়। সূর্য অস্ত্র যাচ্ছে বলে। দুটি তীর ধেয়ে আসে। দুটিই এই দুসৈনিকের গায়ে-পিঠে আঘাত হানে। দুজনই শহীদ হয়ে যায়। ভোরে তাদের আধখাওয়া লাশ তুলে আনা হলো। রাতে নেকড়েরা লাশের অর্ধেকটা খেয়ে ফেলেছে। স্পষ্ট বুঝা গেলো, এটা খৃস্টান গেরিলাদের কাজ।
একদিন দশ সৈনিকের একটি টহল দল অনুসন্ধানের জন্য প্রেরণ করা হলো। তারা পার্বত্য অঞ্চলে ঢুকে পড়ে চারজনের দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। একস্থানে দশ-বারো বছরের একটি কিশোর দেখা গেলো। ছেলেটা সৈনিকদের দেখে দৌড়ে একটি উঁচু টিলার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। ছেলেটা রাখাল হতে পারে। কিন্তু ওখানে কোন ভেড়া-বকরি বা উট কিছুই ছিলো না। সৈনিকরা সে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছুলে টিলার অভ্যন্তরে ছোট্ট একটি গুহা দেখতে পায়। ছেলেটি তারই ভেতরে ঢুকে গিয়ে থাকবে।
সৈনিকরা গুহার মুখে কান লাগায়। ভেতর থেকে ফিস ফিস কথা বলার শব্দ শুনতে পায়। একটি কিশোরের গুহার ভেতরে ঢুকে যাওয়া বিস্ময়কর কোন ঘটনা ছিলো না। কিন্তু সৈনিকরা ছেলেটাকে খৃস্টান গেরিলাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলো। তারা অনেক ডাকাডাকি করে। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়া আসছে না। সৈনিকরা হুমকি দেয়, ভেতরে যে ই আছো বেরিয়ে আসো। অন্যথায় আমরা ভেতরে ঢুকে সবাইকে হত্যা করে ফেলবো। এবার ভেতর থেকে এক যুবতী বেরিয়ে আসে। সে স্থানীয় ভাষায় সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। পরে কেঁদে ফেলে বললো, আপনারা আমাকে হত্যা করে ফেলুন। বিনিময়ে আমার সন্তানদের ক্ষমা করে দিন। মেয়েটির দুটি সন্তান। একটির বয়স দশ-বারো বছর, যে বাইরে থেকে ছুটে এসে গুহায় ঢুকেছে। অপরটির বয়স কয়েক মাস। মহিলা তাকে ভেতরে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে।
সৈনিকরা তাকে বললো, আমরা মুসলিম সৈনিক। আমরা তোমার কোন ক্ষতি করবো না। কিন্তু মেয়েটি একদিকে তাদের গালাগাল করছে, অপরদিকে অনুনয়-বিনয় করছে। সে জানালো, দুদিন আগে এই পাড়ায় পনের-ষোলজন সৈনিক আসে এবং পাড়াটা দখল করে নেয়। তারা পাড়ার প্রতিটি ঘর তল্লাশি করে। আমার স্বামীকে তারা হত্যা করে ফেলে। খৃস্টান সৈন্যরা পাড়ার সকল শিশু-যুবক-বৃদ্ধ ও মহিলাদের এক স্থানে একত্রিত করে বললো, কেউ যেনো জানতে না পারে এই গ্রামে সৈন্য আছে। তারা তাদের এবং তাদের ঘোড়াগুলোর পানাহারের দায়িত্ব গ্রামবাসীর উপর চাপিয়ে দেয়। তাদের কমান্ডার তরবারী বের করে। আমার স্বামী সকলের সামনে দাঁড়ানো ছিলো। কমান্ডার তাকে বাহু ধরে টেনে আরো সম্মুখে নিয়ে তরবারীর এক আঘাতে তার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর কমান্ডার সকলকে হুঁশিয়ার করে দেয়, কেউ আমার আদেশ অমান্য করলে তাকেও এমনি পরিণতি বরণ করতে হবে।
খৃস্টানরা গ্রামবাসীকে তাদের জন্য তিন-চারটি ঘর, খালি করে দিতে বাধ্য করে এবং মেয়েদের ডেকে নিয়ে তাদের সেবা করাতে শুরু করে। এই মেয়েটি রাতে সুযোগ পেয়ে বাচ্চাদের নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। এখন সে জানে না, খৃস্টান সৈনিকরা এখনো এখানে আছে কিনা।
গ্রামটির অবস্থান এখান থেকে খানিক দূরে। মুসলিম সৈনিকরা মেয়েটিকে এখানেই রেখে গ্রামের দিকে চলে যায়। পাহাড়ী অঞ্চলের বাইরে বিস্তৃত একটি মাঠ। ওখানেই পনের-বিশটি কুঁড়ে ঘরের একটি পল্লী। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এই টহল দলটি অশ্বারোহী। তারা ঘোড়া হাঁকিয়ে গ্রামে গিয়ে উপনীত হয়। দখলদার খৃস্টান সৈনিকরা এখনো গ্রামে অবস্থান করছে। তারা সম্ভবত পাহারার ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। অশ্বারোহী মুসলিম সৈনিকরা গ্রাম থেকে সামান্য দূরে থাকতেই সকল খৃষ্টান সৈন্য বেরিয়ে আসে। তাদের সম্মুখে কয়েকটি শিশু ও অনেকগুলো মহিলা। তারা শিশু ও নারীদেরকে একস্থানে একত্রিত করে দাঁড় করিয়ে রাখে এবং নিজেরা উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে তাদের চতুর্পাশ্বে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে যায়। একজন সুলতান আইউবীর সৈনিকদের উদ্দেশে চীৎকার করে বললো- তোমরা যদি আর এক পা অগ্রসর হও, তাহলে আমরা এই শিশু ও নারীদের হত্যা করে ফেলবো।
মুসলিম সৈনিকরা বিশ-পঁচিশ পা দূরে দাঁড়িয়ে যায়। তারা মুসলিম শিশু ও নারীদেরকে খৃষ্টানদের হাতে খুন করাতে চাচ্ছে না।
ওহে কাপুরুষগণ!- সুলতান আইউবীর গেরিলা দলটির কমান্ডার বললো- তোমরা যদি ক্রুশের খাতিরে লড়াই করতে এসে থাকে, তাহলে পুরুষের ন্যায় সম্মুখে এসে লড়াই করো। কাপুরুষের ন্যায় নারী ও শিশুদের ঢালের পেছনে দাঁড়িয়ে আছো কেন?
তোমরা ফিরে যাও- খৃস্টান কমান্ডার বললো- আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাব।
খৃস্টান সৈনিকরা যে শিশু ও নারীদের পণ বানিয়ে রেখেছিলো, তাদের মধ্যে থেকে এক মহিলা সুলতান আইউবীর সৈনিকদের উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে বললো- ইসলামের সৈনিকগণ! তোমরা দাঁড়িয়ে গেলে কেন? আমাদেরকে তোমাদের ঘোড়ার পদতলে পিষে ফেলল। এই কাফেরদের একজনকেও জীবিত ফিরে যেতে দিও না। আমরা শিশুদেরসহ মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত আছি।
খৃস্টান কমান্ডার পূর্ণ শক্তিতে তরবারীর এক আঘাত হানে। মহিলার মাথাটা কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যায়। সুলতান আইউবীর টহল সেনাদলের কমান্ডার তার সৈনিকদেরকে তীর-ধনুক বের করে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়। তারা মুহূর্ত মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যায়। সব কজন খৃস্টান সৈনিক নারী ও শিশুদের পেছনে বসে পড়ে।
