খানিক পর দরজা খুলে যায়।
কে?
হাসান। জ্যাকব উত্তর দেয়।
এতো রাতে কেন?- যে লোকটি দরজা খুললো সে জিজ্ঞেস করে ভেতরে এসে পড়ো। কেউ দেখেনি তো?
না- জ্যাকব উত্তর দেয়- কাফেরদের জেয়াফত থেকে এই মাত্র অবসর হলাম। জরুরি এক সংবাদ নিয়ে এসেছি।
জ্যাকব ভেতরে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। এখন সে জ্যাকব নয়- হাসান আল-ইদরীস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর। এক বছর আগে নিজেকে খৃস্টান পরিচয় দিয়ে এবং গলবার্ট জ্যাকব নাম ধারণ করে খৃস্টান বাহিনীতে চাকরি নিয়েছিলো। গৌর বর্ণের যুবক। প্রশিক্ষণ মোতাবেক অত্যন্ত চতুর ও বাকপটু। দেহের আকার-গঠনের সুবাদে উক্ত প্রাসাদের বিশেষ দায়িত্বের জন্য নিযুক্ত হয়। এখান থেকে কায়রোতে তথ্য সরবরাহ করতে থাকে। তার দলনেতার নাম হাতেম। জ্যাকব এসে এখন যে ঘরে প্রবেশ করলো, হাতেম এ ঘরেই থাকে।
মসুলের দুজন দূত বল্ডউইনের নিকট এসেছে- হাসান আল-ইদরীস তার নেতাকে বললো- আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, তারা মসুল থেকে এসেছে এবং মুসলমান। বল্ডউইন তাদেরকে নিজ কক্ষে নিয়ে যান। তারা যে মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীনের বার্তা নিয়ে এসেছে, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।
আর সেই বার্তাটা হচ্ছে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে চুক্তির বার্তা- নেতা বললো- তা উভয় পক্ষের মাঝে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে তা কি জানতে পেরেছো? সুলতান তো, এখন পর্যন্ত ধোকায় রয়েছেন যে, ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীন আমাদের বন্ধু কিংবা অন্তত পক্ষে আমাদের বিপক্ষে যুদ্ধ করবে না।
তাদের আলাপ-আলোচনা রুদ্ধ কক্ষে হয়েছে হাসান বললো- আমার ধারণা, যা কিছু সিদ্ধান্ত হওয়ার ছিলো হয়ে গেছে। আমি তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে বেশ আনন্দিত দেখা গেছে। অভাগা এতো মদপান করেছিলো যে, নেশার ঘোরে বলে দিয়েছে, তারা মুসলমান এবং মসুল থেকে এসেছে। আমাকে বলেছিলো, সে আমাদের অর্থাৎ খৃস্টানদের ভালোবাসা দেখতে চায়। লোকটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, লুটিয়ে পড়লো।
মসুল থেকে দুজন লোক এসেছিলো সুলতানকে শুধু এটুকু সংবাদ প্রেরণ করা যথেষ্ট হবে না- হাতেম বললো- আমরা সুলতানের নিকট অত্যন্ত লজ্জিত, তাঁর কাছে এই সংবাদটা পৌঁছাতে পারলাম না যে, আপনি বৈরুত অবরোধের পরিকল্পনা ত্যাগ করুন। কেননা, বল্ডউইন আপনার এই পরিকল্পনার সংবাদ জেনে গেছে।
তাতে আমাদের কোন ত্রুটি ছিলো না- হাসান বললো- ইসহাক তুর্কি যথাসময়ে রওনা হয়ে গিয়েছিলো। সে তো ধোকা দেয়ার মতো মানুষ ছিলো না। পথে হয়তো মরুভূমির নির্মম আচরণের শিকার হয়েছে, নয়তো ধরা পড়েছে।
বৈরুত অবরোধে সুলতান আইউবীর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, আমাদের তার প্রতিকার করতে হবে- হাতেম বললো- তার জন্য এই সংবাদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, মসুল বৈরুতের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি করছে। কিন্তু চুক্তিতে কী কী শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং পরিকল্পনা কী ঠিক হয়েছে, পুরো তথ্যই সুলতানকে জানানো প্রয়োজন। এ মুহূর্তে সুলতান আইউবী বড় ঝুঁকির মধ্যে বসে আছেন। হয়তো ভাবছেন, তিনি বন্ধুদের মাঝে নিরাপদ রয়েছেন। কিন্তু আসলে তিনি শত্রুর বেষ্টনীর মধ্যে ছাউনি ফেলেছেন। হাতেম হাসানকে জিজ্ঞেস করে- ভেতরের সংবাদ সংগ্রহের কোন ব্যবস্থা করা যায় না?
আলোচনা হয়েছে রুদ্ধ কক্ষে- হাসান উত্তর দেয়- বল্ডউইন তার সালার কিংবা উপদেষ্টাদের তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না। মসুলের দুব্যক্তির বক্ষ থেকে তথ্য বের করার চেষ্টা করা যেতে পারে। আমি উপায় বের করার চেষ্টা করবো। তাতে কাজ না হলে অন্য পন্থা অবলম্বন করবো। তারা যখন ফেরত রওনা হবে, তখন তাদের অপহরণ করে কথা বের করবো। তারপর প্রয়োজন হলে মেরে ফেলবো।
তাদের মেরে ফেললে তো আমাদের সমস্যার সমাধান হবে না- হাতেম বললো- আমাদের বল্ডউইন ও ইযযুদ্দীনের পরিকল্পনা জানা আবশ্যক।
আমি সে চেষ্টাই করবো- হাসান বললো- তথ্য বের করতে না পারলে তাদেরকে সুলতান আইউবীর নিকট পাঠিয়ে দেবো।
ঠিক আছে চেষ্টা চালাও- হাতেম বললো- সফল হলে যত তাড়তািড়ি সম্ভব আমাকে জানাও। আমি ভোরেই সুলতানের নিকট লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। তুমি যতো স্বল্প সময়ে সম্ভব তথ্য নেয়ার চেষ্টা করো।
দুআ করুন যেনো সফল হতে পারি। হাসান উঠে বেরিয়ে যায়।
***
খৃস্টান কমান্ডোদের জীবিত ধরার চেষ্টা করবে- সালার সারেম মিসরী তার গেলিরা বাহিনীর কমান্ডারদের নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন। তবে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলো না। যেখানেই আক্রমণ করবে, কার্যকর আঘাত হানবে এবং নিরাপদে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে। আক্রান্ত হলে দৃঢ়পদে লড়াই করবে এবং শত্রুকে বেরিয়ে যেতে দেবে না। এই এতোগুলো সৈনিক তোমাদের উপর ভরসা করে ঘুমায় আর এতোগুলো খাদ্যসামগ্রীর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তোমাদেরই।
নিজ কর্তব্যের পুরোপুরিই অনুভূতি আছে সারেম মিসরীর সৈন্যদের। সুলতান আইউবী তাঁবু অঞ্চল থেকে বেশ দূরে বিভিন্ন টিলার উপর বিশ থেকে চল্লিশজন সৈনিকের কয়েকটি চৌকি স্থাপন করে রেখেছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তাঁবু অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান করা তাদের দায়িত্ব। এমনি একটি চৌকি দুশমনের নিশানায় পরিণত হয়ে যায়। চৌকিটির পেছনে কয়েকটি উঁচু পর্বত এবং একটি উপত্যকা। এই উপত্যকার মধ্যদিয়ে বাহিনী অতিক্রম করতে পারে। এই লুকানো পথটির উপর দৃষ্টি রাখার জন্যই এই চৌকিটি স্থাপন করা হয়েছিলো। দুজন আরোহী দুটি ঘোড় নিয়ে সেখানে সর্বদা প্রস্তুত থাকতো। এখন সেখানে নিত্যদিনের রুটিন হয়ে গেছে যে, প্রতিদিন সূর্য অস্ত্র যাওয়ার পর তিন-চারটি তীর ছুটে আসছে এবং এক-দুজন সৈনিককে শেষ করে দিচ্ছে। একদিন সন্ধ্যাবেলা একটি ঘোড়ার গায়ে একসঙ্গে তিনটি তীর এসে বিদ্ধ হয় এবং ঘোড়াটি ছটফট করে মারা যায়। তীর নিকটের পাহাড় থেকে আসতো এবং পরক্ষণেই অন্ধকার ছেয়ে যেতো। সে কারণে তীর নিক্ষেপকারীদের খুঁজে বের করা যেতো না।
