সারা কোন উত্তর দেয়নি যেনো ডাকটা শোনেনি। মহিলা আবারো ডাক দেয়- সারা! সারা এবারও নিশ্চুপ। যেনো গভীর ঘুমে আচ্ছন। এবার মহিলা বিজ্ঞোচিত কণ্ঠে বললো– আমি জানি সারা! তুমি সজাগ আছো। উত্তর দাও। বাতি নেভানো কেন?
সারার মুখ থেকে এমন শব্দ বেরিয়ে আসে, যেনো সে বিড় বিড় করে জেগে ওঠেছে। কণ্ঠটাকে ঘুমজড়িত করে বললো- কে? কী হয়েছে?
ওদিক থেকে এসে বলছি কী হয়েছে- মহিলার ছায়াটা জানালা থেকে সরে যায়। দরজার দিক থেকে আসতে চাচ্ছে সে। সারা অবনত হয়ে জ্যাকবকে বললো- বেটি অন্যদিক থেকে আসছে। তুমি বেরিয়ে এসে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ো।
না সারা- জ্যাকব খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে বললো- আমি তাকে জানি। আসতে দাও। আমি ওর মুঠো গরম করে দেবো; তো খুশি মনে চলে যাবে।
না, বড় বজ্জাত মহিলা- সারা বললো- গোপনে গোপনে মেয়েদের দালালী করে বেড়ায়। তুমি এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। অন্যথায় আমার মিথ্যাচার আমাকে মেরে ফেলবে। তুমি চলে যাও, আমি ওকে সামলে নেবো।
মহিলা সবেমাত্র দরজায় এসে পৌঁছেছে। জ্যাকব জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়। সারা বাতি জ্বালিয়ে দেয়। মহিলা ভেতরে প্রবেশ করে। দৈহিক দিক থেকে মহিলা যতোটা না নারী, তার চেয়ে বেশি পুরুষ। এসেই সারার সঙ্গে বুঝাঁপড়া শুরু করে দেয়। সারা তাকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করে, এই কক্ষে অন্য কেউ ছিলো না। সম্ভবত ঘুমের ঘোরে কথা বলছিলো। মহিলা বললো, স্বপ্নে নারীর কণ্ঠ পুরুষের ন্যায় হয়ে যায় না। আমি তোমার কক্ষে পুরুষ কণ্ঠও শুনেছি।
এটা কী? মহিলা ঝুঁকে খাটের সন্নিকটে মেঝেতে পড়ে থাকা একটা রোমাল তুলে নিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। রোমালটা হাত দুয়েক লম্বা এবং ততোখানি চওড়া একখণ্ড কাপড়, যা কিনা পুরুষরা গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাথায় ব্যবহার করে থাকে। লোকটা কে ছিলো? তার থেকে তুমি কতো মূল্য নিয়েছো?
আমি বেশ্যা নই- সারা ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো- আমি নর্তকী। তুমি জানো, আমি কোন পুরুষের গায়ে মুখ লাগাই না।
শোন সারা!- মহিলা সারার পাশে বসে পড়ে এবং তার কাঁধে হাত রেখে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো- আমিও জানি, তুমি নর্তকী। কিন্তু তুমি জানো না একজন নর্তকী সেনাবাহিনীর অধিনায়ক কিংবা দেশের শাসক সম্রাট নয়। আমি শুধু এটুকু বলে দেবো, রাতে তোমার কাছে একজন পুরুষ এসেছিলো। ফল কী হবে তুমি ভালোভাবেই জানো। এমন ধারায় কথা বলো না যে তুমি শাহী নর্তকী। এখানে তোমার কোন মর্যাদা নেই।
আসল কথা বলো- সারা বরলো- যে দয়াটা করতে চাচ্ছো, তার বিনিময় কী নেবে বলো, আমি এখনই পরিশোধ করে দিচ্ছি।
তোমার থেকে আমি কিছুই নেবো না- মহিলা বললো- বিনিময়টা আমি অন্য কারো থেকে উসুল করবো। তুমি শুধু হা বলল।
সারা মহিলার মতলব বুঝে ফেলে। বাইরে থেকে শাহী মেহমান আসছেই কেবল। তাদের মধ্যে খৃস্টানও আছে। আছে মুসলমানও। এই সম্মানিত অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য মেয়েরা প্রস্তুত থাকে। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে আমলারা আসে, তাদের জন্য এ জাতীয় কোন বিলাসী আয়োজন হয় না। এই মহিলা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তাদের নিকট মেয়ে সরবরাহ করে থাকে এবং মোটা অংকের পুরস্কার লাভ করে থাকে। এটা তার গোপন ব্যবসা। কোন কোন রাজ অতিথি সরকারীভাবে প্রদত্ত মেয়ের দ্বারা তৃপ্ত না হয়ে এই মহিলার শরণাপন্ন হয়। মহিলা তাদের চাহিদা পূরণ করে থাকে। সারা এ যাবত কখনো তার হাতে আসেনি। কিন্তু এখন মেয়েটি তার জালে ফেঁসে গেছে। যদি বলে, তার কাছে জ্যাকব এসেছিলো এবং তাদের দুজনের সম্পর্কটা পবিত্র, তো মহিলা বিশ্বাসও করবে না এবং জ্যাকবও বিপদে পড়ে যাবে।
সারা!- মহিলা বললো- যদি নিজের ভয়ানক পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে আমার প্রস্তাব মেনে নাও। বাইরে থেকে দুজন মেহমান এসেছেন। অনেক ধনী। পরশু থেকেই তারা কর্মচারিদের বলে আসছেন, তাদের ভালো দুটো মেয়ে দরকার। এটা মূলত তাদের অভ্যাস। নিজেদের হেরেমে তাদের বিশ-ত্রিশটি করে মেয়ে থাকে। কাল তুমি তাদের একজনের কাছে চলে যাবে।
তারা কারা?- সারা জিজ্ঞেস করে- মুসলমান হলে আমি যাবো না।
তাহলে কয়েদখানায় যাও- মহিলা বললো- মাথা ঠিক রেখে চিন্তা করে কথা বলল! নিজের প্রতি তাকাও। তুমি কী? নিজের পেশাটা দেখো। ভদ্র সাজবার চেষ্টা করো না। তারা মন খুলে পুরস্কার দেবে। তুমিও ভাগ পাবে।
আর যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে? সারা বললো।
যারা তোমাকে ধরবে আমি তাদের হাত বেঁধে রাখি- মহিলা বললো কাল রাতে প্রস্তুত থাকবে। আমার আর জানবার প্রয়োজন হবে না, তোমার কাছে কে এসেছিলো।
মহিলা চলে যায়। সারার চোখ থেকে অশ্রু বেরুতে শুরু করে।
***
জ্যাকব পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়। কিন্তু সারা বিপদে পড়ে যাবে ভয়ে বেরিয়ে গেলো। তার আশা ছিলো সারা মহিলাকে সামলে নিতে সক্ষম হবে। কারণ, সে নিজেও নোংরা জগতের মেয়ে। জানালা টপকে বেরিয়ে জ্যাকব শহরের দিকে যাচ্ছে। তার মন-মস্তিষ্কে শুধুই সারা। সারার সঙ্গে এখন তার আন্তরিক ভালোবাসার সম্পর্ক। থেকে থেকে তার কেবলই ধারণা হচ্ছে, সারা কোন মুসলমান পিতার কন্যা। জ্যাকব হাঁটতে হাঁটতে নগরীর সরু ও অন্ধকার গলিপথে ঢুকে পড়ে। গলির মোড় ঘুরে ঘুরে একটি গৃহের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং দরজায় করাঘাত করে।
