***
জেয়াফতের রাতে জ্যাকব যখন ডিউটি শেষ করে একদিকে যাচ্ছিলো, তখন মাঝপথে সে গতি পরিবর্তন করে সারার বাসভবনের দিকে হাঁটা দেয়। জেয়াফতে সারার অনুপস্থিতির কারণ হতে পারে, সে অসুস্থ। তাই খবরটা নেয়া দরকার। উক্ত ভবনে কারো যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। তারপরও জ্যাকব ঝুঁকিটা এ জন্য বরণ করে নেয় যে, মেয়েরা সকলে আসরে চলে গেছে। চাকরানী মহিলারাও এ সময়ে ভবনে নেই। জ্যাকব অন্ধকার দিক থেকে হাঁটা দেয়। সারার কক্ষ তার জানা ছিলো। পা টিপে টিপে সে কক্ষের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দরজায় হাত লাগালে কপাট খুলে যায়। একটি কক্ষ অতিক্রম করে অপর কক্ষে চলে যায় জ্যাকব। ওখানে একটি বাতি জ্বলছে, যার ক্ষীণ আলোতে সারা শুয়ে আছে দেখা যাচ্ছে। এ মুহূর্তে মেয়েটাকে একটা দুগ্ধপোষ্য নিষ্পাপ শিশুর ন্যায় মনে হলো জ্যাকবের। জানালাটা খোলা। য়োম উপসগারের শীতল বায়ুর তীব্র ঝাঁপটায় সারার মাথার বিক্ষিপ্ত চুলগুলো ধীরে ধীরে নড়ছে। গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে সারা। জ্যাকব সারার কপালে হাত রাখে। এই বয়সের একটা ঘুমন্ত মেয়ের কপাল যতোটুকু গরম থাকার কথা, তার চেয়ে বেশি গরম নয়। অতএব, সারার জ্বর হয়নি।
তুমি গুলবাগিচার ফুল, যে ফুল রাজা-বাদশাহদের শয়ন কক্ষে এসে শুকিয়ে যায়- জ্যাকব মনে মনে সারাকে উদ্দেশ করে বললো- তুমি ভোরের তারকা, যেটি সূর্যের আলোতে নির্বাপিত হয়ে যায়, রাত এলে আবার জ্বলে ওঠে। তোমার জীবন রাতের আঁধারে ঘুরপাক খাচ্ছে। তোমার ভাগ্য অন্ধকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তোমাকে আমার ভালো লাগে কেন? তুমি আমাকে বারবার কেন জিজ্ঞেস করছে, আমি ছয় কলেমার উল্লেখ কেন করেছি? তুমি কোন মুসলিম মায়ের কোলে জন্মলাভ করেনি তো? তোমার শিরায় কোন মুসলমান পিতার রক্ত নেই তো? এই রহস্য উন্মোচন করবে কে? আমি তোমার জন্য রহস্য। তুমিও আমার জন্য রহস্য।
জ্যাকবের মনে পড়ে যায়, খৃস্টান সৈন্যরা মুসলমানদের কাফেলা লুণ্ঠন করে থাকে। মুসলিম মেয়েদের তুলে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে নিজেদের রঙে রঙিন করে গুপ্তচরবৃত্তি, বেহায়াপনা ও নাচ-গানের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। সারাও এমনি এক হতভাগী মেয়ে হতে পারে। অন্যথায় এই খৃস্টান জাতিটা তো অনুভূতি ও চেতনার দিক থেকে মৃত হয়ে এবং বেহায়াপনার মধ্যে পুরোপুরি জীবিত থাকতে পারে। কিন্তু সারা পারছে না কেন? জ্যাকব ভুলে যায়, সে কোথায় দাঁড়িয় আছে। কোন পুরুষের এই ভবনের দিকে পা বাড়ানোর অনুমতি নেই। কিন্তু জ্যাকব এখন সারার কক্ষে তার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সারা তার হৃদয়ে এমনভাবেই ঢুকে পড়েছে যে, কোন ঝুঁকিই ঝুঁকি বলে মনে হচ্ছে না জ্যাকবের। জ্যাকব বাতিটা নিভিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে সারার চোখ খুলে যায়।
জ্যাকব সারার সন্ত্রস্ত কণ্ঠ শুনতে পায় কে?
জ্যাকব।
এ সময়ে তুমি এখানে কেন?- সারা এমন কণ্ঠে বললো যাতে প্রেমও আছে, সমবেদনাও আছে- কেউ দেখে ফেললে সোজা কারাগার, ছাড়া উপায় থাকবে না। আমাকে বাইরে ডেকে নিলেই পারতে!
জেয়াফতে তোমাকে না দেখে ভাবলাম, তোমার অসুখ-টসুখ হলো কিনা। তাই ঝুঁকি মাথায় নিয়ে চলে এলাম- জ্যাকব অন্ধকারে সারার খাটের উপর বসতে বসতে বললো- কেউ যাতে দেখতে না পায় তাই বাতিটা নিভিয়ে দিলাম। অন্য কোন উদ্দেশ্যে আসিনি সারা। জানি না, কী আকর্ষণ আছে, যা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমার কোন অসুখ হয়নি তো?
আমার আত্মা অসুস্থ- সারা বললো- আমি যখনই আসরে জেয়াফতে নাচি, আমার হৃদয় সঙ্গে থাকে না। আমার দেহ নাচে বটে; কিন্তু আত্মা মরে যায়। আজ যখন আমাকে জানানো হলো মসুল থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুজন মেহমান এসেছেন, শুনে আত্মার সঙ্গে আমার দেহটাও নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। শুনে আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। এই রাজা-বাদশাহদের যুদ্ধ, শান্তি ও বন্ধুত্বের চুক্তিতে আমার কোন আন্তরিকতা নেই। কিন্তু যখন কানে আসলো, মসুল থেকে দুজন মেহমান আসছেন, তখন আমার মনে হলো, খৃস্টান ও মুসলমানদের দুপক্ষের কোন এক পক্ষের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমি ঠিক করে ওঠতে পারিনি, আমার আত্মিক সম্পর্কটা আসলে কার সঙ্গে। শুধু এই অনুভূতিটা জেগে ওঠলো, আমি এই আসরে নাচতে পারবো না। আমি …লের মেহমানদের মুখোমুখি হতে পারবো না। হতে পারে আমাকে দেখে তারা ওখান থেকেই পালিয়ে যাবে।
কেন?- জ্যাকব জিজ্ঞেস করে- মসুলের লোকদের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?
বলতে পারবো না- সারা বললো- আমি তো নিজেকেও বলতে ভয় পাচ্ছি, মসুলবাসীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?
সারা- জ্যাকব সারার একটা হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো আমার থেকে মনের কথা কেন গোপন করছো? তোমাকে কি কোন কাফেলা থেকে অপহরণ করা হয়েছিলো? তুমি কোন্ পিতার কন্যা?
সারা কোন উত্তর দিতে পারে না। হঠাৎ জ্যাকব খানিকটা চকিত হয়ে ওঠে। উভয়ে খোলা জানালার দিকে তাকায়। জানালায় একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। সারা জ্যকবের কানে কানে বললো- খাটের নীচে চলে যাও। জ্যাকব অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে। তারপর নিঃশব্দে ধীরে ধীরে খাটের নীচে চলে যায়। সারা শুয়ে পড়ে।
সারা- জানালায় দণ্ডায়মান ছায়াটির কণ্ঠ ভেসে আসে। এক বৃদ্ধ মহিলার কণ্ঠ। নর্তকী-গায়িকাদের দেখাশোনা করা তার দায়িত্ব।
