এক রাতে সারা মহলের কাজ-কর্ম শেষ করে নিজ কক্ষের দিকে যাচ্ছিলো। পথে জ্যাকবের দেখা পেয়ে যায়। সারা বললো- একাকী যাচ্ছি, আমাকে কক্ষে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসো।
একা যেতে ভয় পাচ্ছো বুঝি?- জ্যাকব বললো- এখান থেকে তোমাকে কেউ অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারবে না।
এখন আর আমি অন্যের দ্বারা অপহৃত হওয়ার ভয় করি না- সারা বললো- আমার নিজেই নিজেকে অপহরণ করার পালা এসে গেছে। আমার সঙ্গে চলো। একা যেতে ভয় করি না বটে, তবে তোমার সঙ্গ কামনা করি।
সারার মতো একটি সুন্দরী মেয়ের জ্যাকবকে ভালোবাসা বিস্ময়কর কোন ঘটনা নয়। এমন সুশ্রী, সুদর্শন যুবককে কার ভালো না লাগে। আরো কয়েকটি মেয়ে ভালোবাসার ডালি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলো। কিন্তু জ্যাকব কাউকে পাত্তা দেয়নি। কারণ, এ্যাকব জানে এরা অপবিত্র ও সম্ভ্রমহারা মেয়ে। জ্যাকব তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজের দাম বাড়িয়ে নিয়েছে। প্রথম সাক্ষাতে জ্যাকব সারাকেও তেমনি চরিত্রহীন মেয়ে মনে করেছিলো। কিন্তু সারার চাল-চলন, রং-ঢং তার ভালো লেগে যায়। সারা যখন জানতে পারে জ্যাকব মদপান করে না, তখন তাকে আরো ভালো লাগতে শুরু করে। একদিন সারা জ্যাকবের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শোনার জন্য বললো- তুমি কোনদিন আমার নাচের প্রশংসা করোনি। অন্যরা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে আমার বিদ্যা ও দেহের তারিফ করে।
তুমি আমার মুখ থেকে তোমার বিদ্যার প্রশংসা কখনো শুনবে না জ্যাকব উত্তর দেয়- তবে তোমার দেহে যাদুর ন্যায় ক্রিয়া আছে। ভালো শরীর। খোদা তোমার চেহারায় যে আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন, তা তার বান্দাদের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করে ফেলে। কিন্তু নাচের অবস্থায় এই দেহটা মোটেও ভালো লাগে না। তুমি যখন কাউকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচাও, তখনো তোমাকে ভালো লাগে না। তোমার এই দেহটা যদি কোন একজন পুরুষের মালিকানায় চলে যেতো, সে ছয় কালেমা পাঠ করে এই দেহটা সম্মান ও মমতার সঙ্গে আবৃত করে নিয়ে যেতো,তাহলে এর উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হতো। তুমি তো খোদাকে অপমান করছে।
জ্যাকব!- সারা বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- তুমি কোন্ ছয় কলেমার কথা বলছো? তাছাড়া খৃস্টানরা তো বধূদেরকে আবৃত করে নেয় না! তুমি কী বললে?
জ্যাকব ভয় পেয়ে যায়। পরক্ষণে হঠাৎ খিল খিল হেসে ওঠে বললো আমার মন-মস্তিষ্কে সবসময় মুসলমান সাওয়ার থাকে। নিজে তো বিয়ে করিনি, মুসলমানদের বিয়ে দেখেছি।
জ্যাকব বুঝাতে চেষ্টা করে ছয় কলেমা কথাটা তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সারা তার প্রতি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েই থাকে। তারপর সারা চুপসে গিয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে শূন্যে অকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর অস্থিরের ন্যায় জ্যাকবের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে- তুমি মুসলমান নও তো জ্যাকব? আমার বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে, তুমি গুপ্তচর। হতে পারে চাকরির খাতিরে নিজেকে খৃস্টান পরিচয় দিয়ে রেখেছো কিংবা ইসলাম ত্যাগ করে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে।
জ্যাকব নামের মানুষ মুসলমান হয় না সারা- জ্যাকব বললো- আমার নাম গলবার্ট জ্যাকব। তুমি এতো অস্থির হয়েছে কেন সারা! মনে হচ্ছে, তোমার হৃদয়ে মুসলমানদের প্রতি এত ঘৃণা যে ছয় কলেমা উচ্চারণটাও শুনতে চাচ্ছে না।
আমি তোমাকে একটি গোপন কথা বলে দিচ্ছি- সারা বললো বিষয়টা হয়তো তোমার ভালো লাগবে না। আমার কাছে মুসলমান খুবই ভালো লাগে। তার কারণটা বোধ হয় এই যে, মুসলমান ছয় কলেমা পড়িয়ে বধূদেরকে আবৃত করে নিয়ে যায়। সারা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো নারীকে যখন বিবস্ত্র করে ফেলা হয়, তখন সে অনুভব করে আবৃত হওয়ার মধ্যে তার যে আত্মিক শান্তি ও স্থিরতা ছিলো, তা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। নারীর নাচে কোন স্বাদ নেই এবং রূপের যাদু প্রয়োগ করে পুরুষদেরকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচানোর মধ্যেও শান্তি নেই। আমি যখন একাকী আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন আয়নায় নিজেকে একজন ঘৃণ্য নারী বলে মনে হয়। নিজের প্রতিবিম্বকে আমি আবৃত করতে পারি না। তার উপর পর্দা চড়াতে পারি না। তবে আমার আত্মার উপর কালো আবরণ পড়ে গেছে।
পেশাটার প্রতি তোমার এতোই যখন ঘৃণা, তো পালিয়ে যাও না কেন? জ্যাকব বললো।
কোথায় যাবো?- সারা বললো- এখান থেকে পালাবো তো বেশ্যালয়ে চলে যাবো। আচ্ছা, তুমি আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার নাচ?
আমার সেই সারাকে ভালো লাগে, যে নাচ-গানের পেশাকে ঘৃণা করে এবং এর জন্য বেজায় বিরক্ত ও অস্থির থাকে- জ্যাকব বললো- আমি তো বলেছি, তুমি খোদাকে অপমান করছে।
আচ্ছা, তুমি ফৌজে এসেছো কীভাবে?- সারা বললো- তোমাকে গ্রামগঞ্জের কোন এক গীর্জার পাদ্রী হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। প্রতিদিন কী পরিমাণ মদপান করো?
মদের ঘ্রাণকেও আমি ঘৃণা করি।
তাহলে তুমি মুসলমান- সারা দৃঢ়কণ্ঠে বললো- তুমি নও তো তোমার পিতা মুসলমান ছিলেন। তুমি নারীকে আবৃত দেখতে চাও। নাচ পছন্দ করো না। মদের প্রতি তোমার প্রচণ্ড ঘৃণা। আর সম্ভবত এ কারণেই আমাকে তোমার ভালো লাগে। আমাকে তো যেই দেখে ভোগের চোখে দেখে। তুমি আমার হৃদয়ের ব্যথা বুঝো না?
বুঝি সারা- জ্যাকব বললো- এই ব্যাথাটা আমার হৃদয় অনুভব করেছে।
এরপর কয়েকবার সারা-জ্যাকবের সাক্ষাৎ ঘটে। সারা জ্যাকবের সঙ্গে হৃদয়ের কথা বলতে থাকে। মেয়েটি জ্যাকবকে একাধিকবার বলেছে, তোমার চাল-চলন ও চিন্তা-চেতনা মুসলমানদের মতো। জ্যাকব সারাকে জিজ্ঞেস করেছে, মুসলমানদের তুমি এতো বেশি পছন্দ করো কেন? সারা কখনো সন্তোষজনক উত্তর দেয়নি। তবে উভয়ে এটুকু অবশ্যই অনুভব করেছে, তারা একে অপরের হৃদয়ে ঢুকে পড়েছে।
