এই মুসলমানদের উপর বেশি আস্থা রাখবেন না- এক সেনাপতি বল্ডউইনকে বললো- প্রয়োজন হলে তারা আপনাকে কিছু না জানিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে ঐক্য গড়তে সময় লাগবে না।
আমার একটা আস্তানা দরকার- বল্ডউইন বললেন- মসুল আমার আস্তানা হয়ে গেলে আমি ধীরে ধীরে পুরো বাহিনীই সেখানে নিয়ে যাবো এবং ইযযুদ্দীনকে সেখান থেকে উৎখাত করবো। আমাদের সকলের পরিকল্পনা এই হওয়া উচিত, আমরা মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেবো না। আমরা তাদেরকে আপসে লড়াতে থাকবো এবং ধীরে ধীরে তাদের ভূখণ্ডগুলো দখল করে নেবো। আমরা দেখেছি, মুসলমানদেরকে ভোগ বিলাসিতার ও ক্ষমতার লোভ দেখালে তারা তাদের ব্যক্তিত্ব ও ধর্ম আমাদের পায়ের উপর রেখে দেয়। ইযযুদ্দীন-ইমাদুদ্দীন ও অন্যান্য ছোটখাট মুসলমান আমীরগণ শুধু এ কারণে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরোধী যে, তারা প্রত্যেকে স্বাধীন শাসক হতে এবং বিলাসী জীবন লাভ করতে আগ্রহী। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর মধ্যে ভোগ-বিলাসিতা ও ক্ষমতার লোভ নেই। তিনি সকলকে এক রণাঙ্গনে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদেরকে ফিলিস্তীন থেকে উৎখাত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু তিনি যাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন, তারা যুদ্ধ-বিগ্রহে ভয় পায়। আমি আশাবাদী, ইযযুদ্দীন ও সাঙ্গরা আমাদের হাত থেকে বের হবে না। কেউ যদি বের হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আমরা তাকে হাশিশিদের দ্বারা হত্যা করিয়ে ফেলবো।
বল্ডউইন তার সেনাপতিদের আরো কতিপয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করে বললেন- ইষুদ্দীনের এই দূতদেরকে এতো খাতির-যত্ন করো, যেনো তাদের বিবেক মরে যায় এবং তাদের জাতি-ধর্মের কথা ভুলে যায়। বল্ডউইন যে বিষয়টি কঠোরভাবে পালন করতে আদেশ করেন তাহলো, এই কক্ষে দূতদের সঙ্গে যা যা আলোচনা, কথোপকথন ও সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেনো তা কক্ষের বাইরে না যায়। বল্ডউইন বললেন- বৈরুতে সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা আছে।
উভয় দূত মদ ও নারীর নেশায় মাতাল হতে চলেছে। অতিথিগণ এদিক ওদিক ছড়িয়ে মদপান ও গালগল্প করছে। জ্যাকব এই দূত দুজনকে খুঁজে ফিরছে। হঠাৎ সে তাদের একজনকে আলাদা পেয়ে যায়। জ্যাকব তাকে সামরিক কায়দায় সালাম জানায় এবং জিজ্ঞেস করে- আপনি বোধ হয় মসুলের মেহমান? আমরা মসুলবাসীদের অনেক ভালোবাসি।
আমরা মসুলের শাসক ইযুদ্দীনের দূত- দূত মদমাতাল ঢুলু ঢুলু কণ্ঠে বললো- আমরা জানতে এসেছি, বৈরুতের খৃস্টানদের অন্তরে মসুলের মুসলমাদের কী পরিমাণ ভালোবাসা আছে। দূতের কণ্ঠটা যেমন টলমল করছে, তেমনি পা দুটোও কাঁপছে। লোকটা এতো বেশি পান করেছে যে, পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। সে জ্যাকবের কাঁধের উপর সজোরে হাত মেরে বললো- মদের এই এক গুণ যে, মানুষের অন্তর থেকে ধর্ম বেরিয়ে যায় এবং তদস্থলে ভালোবাসা এসে স্থান করে নেয়। আমি ক্রুশ ভালোবাসি। তোমার এই বর্শাটার প্রতি আমার ভালোবাসা আছে। যেদিন এই বর্শা সালাহুদ্দীন আইউবীর বুকে বিদ্ধ হবে, সেদিন আমি প্রধান সেনাপতি হয়ে যাবো।
জ্যাকব ওখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ডিউটি তো তার টহল দেয়া। সে ইযুদ্দীনের দূতকে নড়বড়ে অবস্থায় ফেলে সরে আসে। কিছুক্ষণ পর সে দেখতে পায়, দূতকে দুজন লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ইযযুদ্দীনের মুসলমান দূত অধিক মদপান করে চৈতন্য হারিয়ে ফেলেছে।
এখন মধ্যরাত। জ্যাকবের ডিউটি শেষ। নাচ-গান চলছে। জ্যাকব ও তার সঙ্গীদের স্থানে অন্য লোক এসে পড়েছে। জ্যাকব নিজ কক্ষে চলে যায়। ডিউটির পোশাক খুলে সাধারণ পোশাক পরিধান করে। লোকটা অনেক ক্লান্ত। এখনই তার শুয়ে পড়া উচিত। কিন্তু জ্যাকব বাইরে বেরিয়ে যায়। গতি তার অন্যদিকে। কিন্তু হঠাৎ কী যেনো ভেবে মহলের মেয়েরা যেখানে থাকে, সেদিকে চলে যায়।
এটি একটি ভবন। এর একটি অংশ এতোই সুন্দর ও মনোরম, যেনো এটি রাজকন্যাদের আবাস। এটি সেই মেয়েদের আবাস, যাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা এবং মুসলিম আমীর-সালার ও শাসকদেরকে ক্রুশের জালে ফাঁসানোর জন্য মুসলমানদের অঞ্চলে প্রেরণ করে থাকে। খৃষ্টানদের দখলকৃত মুসলিম ভূখণ্ডের মুসলমান গোয়েন্দাদের ধরার জন্যও এদেরকে ব্যবহার করা হয়।
এই ভবনেরই অপর এক অংশে নর্তকী-গায়িকারা বাস করে। তাদের মূল্য মর্যাদা গোয়েন্দা মেয়েদের সমান না হলেও রূপ-সৌন্দর্যে কোন অংশেই কম নয়। মহলে নিমন্ত্রণ ও ভোজসভায় নেচে-গেয়ে অতিথিদের মনোরঞ্জন করা তাদের দায়িত্ব। বাইরে থেকে মেহমান আসলে নাচ-গান ছিলো অবধারিত। আজ রাত মসুলের দূতদের সম্মানে যে ভোজের আয়োজন হয়েছিলো, তাতেও নাচ-গানের ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু সারা এই অনুষ্ঠানে ছিলো না। অত্যন্ত সুন্দরী এক মেয়ে সারা। মেয়েটার গাত্রবর্ণ ও চুল-চোখের রং ইউরোপিয়ান মেয়েদের মতো নয়। বোধ হয় বৈরুতের মেয়ে। মিসর কিংবা ইউনানেরও হতে পারে। তবে কেউ জানে না, সারার বাড়ি কোথায়।
জ্যাকব যাচ্ছিলো অন্য একদিকে। হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় আজ যারা নাচ-গান করলো, তাদের মধ্যে তো সারা ছিলো না। ব্যাপার কী! হতে পারে মেয়েটা অসুস্থ কিংবা এই পেশায় সে বিরক্ত। তাই পালিয়ে রয়েছে। জ্যাকব জানে, এই পেশায় সারা খুশি নয়। কারণ, এ কাজে সে নিজে আসেনি, ভুল বুঝিয়ে আনা হয়েছে। জ্যাকবও এই ভবনের কাছেই এক স্থানে থাকে এবং মহলে ডিউটি করে। একদিন এমনি এক ভোজসভায় হঠাৎ সারার সঙ্গে জ্যাকবের দেখা হয়েছিলো। সকলের দৃষ্টিতে সারা অহংকারী মেয়ে। কারো সঙ্গে কথা বলে না। কী কারণে কে জানে জ্যাকবকে তার ভালো লাগতে শুরু করেছে। জ্যাকবেরও সারাকে বেশ ভালো লাগে।
