সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করার জন্য এসেছে বোধ হয়- জ্যাকব বললো- এই দূতদের কে বলবে সালাহুদ্দীন আইউবীর শেষ হয়ে গেছে। রামাল্লায় পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসে বৈরুত অবরোধ করতে এসেছে। তার নৌ-বহর সামনে অগ্রসর হওয়ারই সাহস পায়নি। আমার আজীবন আক্ষেপ থাকবে, আমাদের বাহিনী আইউবীর বাহিনীকে ধাওয়া করেনি। অন্যথায় আইউবী আজ আমাদের কারাগারে থাকতো।
নিজের কাজ করো দোস্ত!- এক প্রহরী তাচ্ছিল্যের সুরে বললো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বন্দি হলে তার সাম্রাজ্যের তুমি মালিক হবে না। সম্রাট বল্ডউইন মৃত্যুবরণ করলেও বৈরুতের রাজত্ব তোমার নামে লিখে দেয়া হবে না।
জ্যাকব ওখান থেকে সরে আসে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই বদ্ধ কক্ষটি দেখতে থাকে, যার অভ্যন্তরে মুসলমান অতিথি দুজন হারিয়ে গেছে।
***
লোক দুজন মসুলের গভর্নর ইযযুদ্দীনেরই দূত। পূর্বে উল্লেখ করেছি, সুলতান আইউবী যখন বৈরুতের অবরোধ প্রত্যাহার করে মসুলের দিকে চলে গিয়েছিলেন, তখন ইযযুদ্দীন কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদকে বাগদাদের খলীফার নিকট এই আবেদন নিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, যেনো তিনি সুলতান আইউবীর সঙ্গে তাকে সন্ধি করিয়ে দেন। সহজ কথায়, ইযযুদ্দীন আবেদন করেছিলেন, যেনো তাকে সুলতান আইউবী থেকে রক্ষা করা হয়। খলীফা দায়িত্বটা শাইখুল উলামার হাতে অর্পণ করেন এবং সুলতান আইউবী ইযযুদ্দীনকে ক্ষমা করে দেন। ইযযুদ্দীন বাহ্যত সুলতান আইউরীর সম্মুখে অস্ত্র সমর্পণ করে চুক্তি করে নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তলে তলে খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইনের নিকট দুজন দূত পাঠিয়ে দেন। সেই দূত দুজনই এখন বল্ডউইনের কক্ষে উপবিষ্ট।
মসুলের গভর্নর বলেছেন, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে ধাওয়া না করে বিরাট ভুল করেছেন- বল্ডউইনের উদ্দেশে এক দূত বললো আপনি তার বাহিনীকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমাদের গবর্নর বলেছেন, আমি ইচ্ছে করলে লিখিত বার্তা দিতে পারতাম। কিন্তু পথে ধরা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি দামেশক অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করুন এবং নগরীটা অবরোধ করে দখল করে নিন। আপনার বাহিনী যেনো এমন পথে এবং এতা দ্রুত দামেশক পৌঁছে যায় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী সময় মতো দামে পৌঁছুতে না পারে। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনার আক্রমণের সংবাদ শুনে সালাহুদ্দীন আইউবী যখন এখান থেকে রওনা হবে, তখন মসুল ও হালবের বাহিনী মুখোমুখি এসে লড়াই করার পরিবর্তে আইউবীর বাহিনীর উপর কমান্ডো আক্রমণ চালাতে, থাকরে। এতে আইউবীর অগ্রযাত্রা অনেক মন্থর হয়ে যাবে আর আপনি সহজে দামেশক জয় করে ফেলতে পারবেন। আমাদের অঞ্চলগুলোতে ছোট ছোট যে কজন আমীর আছেন, আমি তাদেরকে দলে ভিড়িয়ে নেবো। আপনি তাদের দুর্গ ব্যবহার করতে পারবেন। আমি আপনার বাহিনীকে মসুলের অভ্যন্তরে অবস্থান করার অনুমতি দিতে পারি না। কারণ, তাতে প্রমাণিত হয়ে যাবে আপনার ও আমার মাঝে ঐক্য আছে। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে বুঝ দিয়ে রেখেছি, আমি তার বন্ধু।
দূত যখন বার্তাটা বলে শোনাচ্ছিলেন, তখন বল্ডউইনের সঙ্গে তার দুজন সেনাপতিও ছিলো। ইযষুদ্দীনের দূতও সামরিক উপদেষ্টা। যুদ্ধ-বিগ্রহের ব্যাপার-স্যাপার তার ভালোভাবেই জানা আছে। বল্ডউইন তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকেন। তিনি বুঝে ফেলেছেন, এই মুসলমানরা তার জালে এসে পড়েছে। তিনি শর্ত আরোপ করতে শুরু করেন।
ইযযুদ্দীনের বোধ হয় খবর নেই, সালাহুদ্দীন আইউবীকে অসতর্ক অবস্থায় ঝাঁপটে ধরা তার পক্ষে সম্ভব হবে না- বল্ডউইন বললেন আমরা দামেশক অবরোধ করে ফেললে তিনি বিদ্যুতিতে অগ্রযাত্রা করে আমাদের উপর পেছনে এদিক থেকে আক্রমণ করবেন। আমরা দামেশক অভিমুকে অভিযান পরিচালনা করবো আর আইউবী তা জানবে না এ হতে পারে না। আইউবী চিল-শকুনের ন্যায় বহুদূর থেকে শিকার দেখে ফেলেন এবং এমনভাবে ছোঁ মারেন যে, পেছনে সরে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমরা এখনো মুখোমুখি যুদ্ধ করার ঝুঁকি মাথায় নিতে পারি না। আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আপাতত ব্যবস্থা এটুকু করেছি যে, আমরা কমান্ডো বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছি। তারা সালাহুদ্দীন আইউবীকে শান্তিতে বসতে দেবে না। এসব বাহিনীর জন্য আমাদের স্বতন্ত্র আস্তানা দরকার। আপনারা যদি এই ব্যবস্থাটা করে দেন, তাহলে সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীকে এদের দ্বারাই হেস্তন্যাস্ত করে দিতে পারি। তখন তিনি না যুদ্ধ করতে সক্ষম হবেন, না পালাতে পারবেন। আপনারা আমাদের বাহিনীগুলোকে আশ্রয়, সাহায্য ও খাদ্য ইত্যাদি সরবরাহ করতে থাকবেন। আমরা সরবরাহ করবে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম। হাবের গবর্নর ইমাদুদ্দীনকেও বলে দেবেন, তিনি যেনো আমাদের উপর আস্থা রাখেন এবং আমাদের গেরিলা ইউনিটগুলোকে প্রয়োজনের সময় আশ্রয় ও সাহায্য দিতে থাকেন। অন্যান্য আমীর ও দুর্গপতিদেরও আপনাদের সঙ্গ দেয়া উচিত। নজর রাখতে হবে, তাদের কেউ যেনো সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে ঐক্য গড়তে না পারে।
ঐক্যের শর্তাদি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ইযযুদ্দীন তার দূতদের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন যেনো তারা শর্ত চূড়ান্ত করে আসে এবং খৃষ্টানদের যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া সমীচীন মনে হবে দিয়ে আসবে। তারা একটি মাত্র স্বার্থে তাদের ঈমান একজন খৃস্টান সম্রাটের নিকট বন্ধক রেখে এসেছে, তাদের শাসন ক্ষমতা নিরাপদ থাকবে। কাজ সমাধান করে দূতরা ভোজসভায় অংশগ্রহণের জন্য উঠে চলে যায়। মনটা তাদের মূলত মদ আর মদ পরিবেশনকারী মেয়েদের সঙ্গেই ঝুলে আছে।
