বলতে বলতে সুলতান আইউবী এমন ধারায় থেমে যান, যেনো তার কিছু মনে পড়ে গেছে। তিনি পালাক্রমে তিন সালারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন- কিন্তু আমরা কততক্ষণ পর্যন্ত এভাবে কথা বলতে থাকবো? আমরা চারজন একে অপরকে বক্তব্য শোনাচ্ছি। আল্লাহর সৈনিকরা বক্তৃতা করে বেড়ায় না। আমাদেরকে কাজ করতে হবে। আমরা কর্মক্ষেত্রের পুরুষ। সারেম! তুমি নিশ্চয়ই আমার প্রথম নির্দেশনা মোতাবেক তোমার গেরিলা বাহিনীকে আমার বর্ণিত স্থানগুলোতে ছড়িয়ে রেখেছে। আর তুমি তো জানো, আমাদের এই ছাউনি অঞ্চল কিরূপ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ভালোভাবেই জানি, মুহতারাম সুলতান!- সারেম মিসরী উত্তর দেন আমরা বৈরুতের অবরোধ প্রত্যাহার করে যখন এদিকে চলে আসি, তখন আমাদের প্রত্যাশার বিপরীতে খৃস্টানরা আমাদের ধাওয়া করতে ফৌজ প্রেরণ করেনি। কিন্তু আমরা এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হইনি যে, খৃস্টানরা আমাদেরকে ক্ষমা করবে। আমি পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি, তারা আমাদের উপর প্রকাশ্যে আক্রমণ করবে না। আমাদের উপর তারা আমাদেরই ধারায় গেরিলা আক্রমণ চালাবে। বরং তাদের গেরিলা ও কমান্ডো আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। ছাউনি অঞ্চলের অনেক দূর থেকে ফিরিঙ্গি ও আমাদের টহল বাহিনীগুলোর ঘোট ঘোট সংঘাতের সংবাদ আসতে শুরু করেছে। আমি আমার গেরিলা ইউনিটগুলোকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে রেখেছি। আমার সন্দেহ, কাফেরদের আস্তানা বাইরে কোথাও নয়, মসুলেই বিদ্যমান এবং মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীন তাদের আশ্রয় ও সাহায্য প্রদান করছেন।
তা-ই যদি হয়ে থাকৈ, আমি সংবাদ পেয়ে যাবো- সুলতান আইউবী বললেন- ক্রুসেডারদের গোপন আস্তানা যদি মসুলেই হয়ে থাকে, তাহলে আমি তার ব্যবস্থা করবো।
সুলতান আইউবী অন্যান্য সালারদের উদ্দেশে বললেন- মুসলিম আমীরদের দুর্গগুলো মসুল ও হাবের মধ্যখানে অবিস্থত। আমারেকে সেগুলো দখল করতে হবে। আমি এই শহর দুটিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাই। তাহলে তারা একে অপরকে সহযোগিতা দিতে পারবে না। তাদের দূতরাও চলাচলের পথ পাবে না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, যাতে আমার তরবারী কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে খাপ থেকে বের না হয়। কিন্তু তাতে আমি সফল হইনি। আমি সেই শাসক ও আমীরদের খতম করে ছাড়বো, যারা খৃষ্টানদেরকে বন্ধু বানিয়ে রেখেছে। যেসব আমীর-শাসক জাতিকে বিভ্রান্ত করছে, আমি তাদের ঘাড় মটকে তবে ক্ষান্ত হবা।
সুলতান আইউবী মানচিত্রটা বের করে সালারদের দেখাতে শুরু করেন।
***
সম্রাট বল্ডউইন বৈরুতে তার প্রাসাদে সকল সেনা অধিনায়ক এবং জনাচারেক খৃষ্টান সম্রাটকে নিমন্ত্রণ করেছেন। সকলে এসে উপস্থিত হয়েছেন। বিশাল ভোজের আয়োজন। অসংখ্য খৃস্টান অতিথির মাঝে দুজন মুসলমানও মদের পেয়ালা হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। মদ পরিবেশনকারী মেয়েগুলো এরূপ পাতলা পোশাক পরিহিত, যেনো তারা বিবস্ত্র। মদের ক্রিয়া যতোটা বাড়ছে, মেয়েগুলোর সঙ্গে অতিথিদের অসদাচরণ ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেয়েগুলোও ধীরে ধীরে অধিক থেকে অধিকতর বেহায়াপনা প্রদর্শন করে চলছে। অন্যদের তুলনায় মুসলিম অতিথি দুজনের প্রতি মেয়েদের মনোযোগ বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষভাবে দুটি মেয়ে তাদের আশপাশে ফাং ফাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পোশাক ও আকার-গঠনে এই অতিথিদেরকে রাজপরিবারের সদস্য বলে মনে হচ্ছে।
এক খৃস্টান এসে বললো, সম্রাট বল্ডউইন আপনাদেরকে তার কক্ষে যেতে বলেছেন। মদের পেয়ালা রেখে দিয়ে তারা বল্ডউইনের কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করে। তাদেরকে যে সরু গলিটি অতিক্রম করে বন্ডউইনের কক্ষে যেতে হয়েছে, তাতে এক ব্যক্তি বর্শা হাতে সামরিক কায়দায় টহল দিচ্ছিলো। বিশেষ ধরনের পোশাক পরিহিত লোকটা। কোমরে তরবারী ঝুলছে। মাথায় সীসার চকমকে শিরোম্রাণ। প্রাসাদে এ ধরনের আরো কয়েকজন লোক বুক টানটান করে বিশেষ ভঙ্গিতে টহল দিয়ে ফিরছে দেখা যাচ্ছে। এরা প্রাসাদের খাস কর্মচারি, যাদের দায়িত্ব সালারদের কক্ষের সম্মুখে উপস্থিত থেকে পাহারা দেয়া এবং নিমন্ত্রণের সময় বারান্দা ও গলিপথে টহল দেয়া। প্রদীপের আলোতে তাদের পোশাক ও চাল-চলন ভালোই লাগছে। এরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকও বটে।
এই যে লোকটি মুসলমান দুজনকে বল্ডউইনের কক্ষের দিকে যেতে দেখলো, তার গায়ের রং গৌর। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে লোকগুলোর যাওয়া দেখতে থাকে। তারা বল্ডউইনের কক্ষে ঢুকে পড়লে কক্ষের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। দরজার সামনে তারই ন্যায় পোশাকের আরো দুজন লোক দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। তাদের একজন তাকে বললো- হ্যালো জ্যাকব! এদিকে ঘোরাফেরা করছো কেন? ওদিকে গিয়ে পরীদের নাচ দেখো। আমরা তো এখান থেকে এক পাও নড়তে পারছি না।
জ্যাকর রসিকতার ছলে উত্তর দেয়- এই যে দুজন লোক ভেতরে প্রবেশ করলো, মুসলমান বলে মনে হচ্ছে। এরা কারা?
তোমার প্রয়োজন কী?
প্রয়োজন তেমন কিছু নেই- জ্যাকব উত্তর দেয়। মুসলমানদের প্রতি আমাদের প্রচণ্ড ঘৃণা তো। কেউ আবার ঠুস করে দেয় কিনা। তাই জিজ্ঞেস করলাম। অতিথি হিসেবে তো আমাদের তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আছে। এরা মুসলমান অঞ্চলের মুসলমান- সঙ্গী উত্তর দেয়- আমি যতোটুকু জানি, এরা মসুল থেকে এসেছে। খুব সম্ভব ইযযুদ্দীনের দূত।
