শহীদদের মুক্ত বৃথা যাবে না মাননীয় সুলতান- কণ্ঠটা কমান্ডো বাহিনীর অধিনায়ক সারেম মিসরীর, যিনি সুলতান আইউবীর তাবুর দরজায় এসে দাঁড়িয়ে ভেতরের কথোপকথন শুনছিলেন।
কোন শহীদের মা নিজ পুত্রের রক্তের হিসাব চাইবেন না। রাসূলের কালেমা পাঠকারী মায়েদের দুধ যমযমের পানির চেয়ে পবিত্র ও মর্যাদাবান। সেই দুধে প্রতিপালিত পুত্ররা আপনার নির্দেশে নয়- আল্লাহর আদেশে যুদ্ধ করছে। তাদের রক্তের দায় আপনি নিজ কাঁধে তুলে নেবেন না। আপনি গাদ্দারদের রক্তের কথা বলুন। আমাদের তারবারী গাদ্দারদের রক্তের পিয়াসী।
তুমি আমার মনোবলে জীবনদান করেছে সারেম- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন- আমার এই দুই বন্ধুও আমাকে বলছিলো, আপনার হতাশ ও আবেগপ্রবণ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
কোনই প্রয়োজন নেই- সারেম মিসরী বললেন- পরাজয় পরাজয়ই। কিন্তু স্থায়ী নয়। আমরা এই পরাজয়কে বিজয়ে পরিবর্তন করে ফেলতে পারি এবং তা করে দেখাবো ইনশাআল্লাহ।
বিষয়টা যদি রণাঙ্গনের হতো, তাহলে একটি বাহু কাটা গেলেও আমি নিরাশ ও পেরেশান হতাম না- সুলতান আইউবী বললেন- সমস্যা তো হলো দুশমন মাটির নীচে চলে গেছে। ইহুদী-খৃস্টানরা আমাদের জাতির মাঝে এমন সব বিষাক্ত প্রভাব বিস্তার করছে, যা অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও যাদুময়। দেশের জনগণ ও সেনাবাহিনী সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত। সৈনিক ও সাধারণ জনগণ এসব প্রভাব গ্রহণ করে না। এই বিষ বরণ করে নিচ্ছে এমন গুটিতক মানুষ, জাতির উপর যাদের প্রভাব বিদ্যমান। এরা হচ্ছে আমীর ও শাসক গোষ্ঠী। কতিপয় ধর্মীয় নেতাও এদের অন্তর্ভুক্ত। আছে কিছু সালারও, যারা প্রজাতন্ত্রের শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এরা ঈমান নিলামকারীদের দল, যারা সহজ-সরল মানুষগুলোকে ধর্মের ধোকা দিয়ে তাদের মাঝে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছে এবং তাদের মুসলমান ভাইদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। বিজাতিরা এ জাতীয় মুসলিম আমীর ও শাসকদেরকে তাদের অনুগত বানিয়ে নিচ্ছে এবং তাদের দ্বারা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী কাজ করাচ্ছে। এরা সাধারণ মানুষকে ধর্মের ধোকা দিয়ে নিজেদের চরিত্রটাকে আড়াল করে রাখছে।
কিন্তু আমরা আলেম নই- এক সালার বললেন- আমরা মসজিদের খতিব-ইমাম নই যে তরবারী ফেলে দিয়ে আমরা জনসাধারণকে ওয়াজ করে বেড়াবো। আমাদেরকে এই সমস্যার সমাধান তরবাররি মাধ্যমেই করতে হবে। এই পাথরগুলোকে ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলতে হবে।
এরা কুরআন অস্বীকারকারী- সুলতান আইউবী বললেন- কুরআনের নির্দেশ অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধু ভেবো না। তাদের কথা শোনো না। তোমরা জানো না, তাদের অন্তর আমাদের বিরুদ্ধে পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ।
এরা নামের মুসলমান- সারেম মিসরী বললেন- কুরআনের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।
এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ক্ষতিকর যে, তারা কুরআনও হাতে তুলে রেখেছে, আবার কাফেরদের ইশারায়ও নাচছে- সুলতান আইউবী বললেন- জাতি সবসময় এমন নেতাদের হাতেই প্রতারিত হয়েছে, যাদের হাতে কুরআন আর অন্তরে ক্রুশ। এরা আযানের শব্দ শুনে নিশ্চুপ হয়ে যায়। কিন্তু তাদের হৃদয়ে বাজে গীর্জার ঘণ্টা। জাতি তাদের আসল রূপ দেখতে পায় না, তাদের হৃদয়ের আওয়াজ শুনতে পায় না। এ কারণেই আমরা একটি গৃহযুদ্ধে একে অপরের রক্ত ঝরিয়েছি এবং আরেকটি গৃহযুদ্ধের তরবারী আমাদের ঘাড়ের উপর ঝুলছে।
এই তুফান আমরা প্রতিহত করবোই- এক সালার বললেন- আপনি আমাকে এ কথা বলার অনুমতি দিন যে, এখন আর আমরা কোন সন্ধি চুক্তি করবো না। আমাদেরকে আপন ভাইদের রক্ত ঝরাতে হবে এবং তাদের হাতে আমাদেরকে প্রাণও দিতে হবে।
সুলতান আইউবীর চেহারা মলিনতায় ছেয়ে যায়। তার চোখ দুটো যেনো দিগন্তে কিছু একটা দেখছে। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, তার দৃষ্টি অনাগত শতাব্দীগুলোর বুক বিদীর্ণ করে ফিরছে। তাঁবুতে পুনরায় গভীর নীরবতা নেমে আসে। তিন সালার তাদের সুলতানের এই প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছেন।
আমার প্রিয় বন্ধুগণ!- সুলতান আইউবী বললেন- আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার রাসূলের উম্মত আপসে লড়াই করে করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। ইহুদী-খৃস্টানরা তাদেরকে আজীবন গৃহযুদ্ধে লিপ্ত করে রাখবে। ক্ষমতার মোহ ভাইকে ভাইয়ের শত্রুতে পরিণত করে রাখবে। ফিলিস্তীন রক্তে লাল হতে থাকবে। মুসলিম শাসকগণ শতধা বিভক্ত হয়ে বিলাসিতায় ডুবে থাকবে। আমাদের প্রথম কেবলা আল্লাহর রাসূলের উম্মতকে চীৎকার করে ডাকতে থাকবে; কিন্তু কোন মুসলমান সাড়া দেবে না। কেউ যদি ফিলিস্তীনের মাটিকে মুক্ত করাতে উঠে দাঁড়ায়, তো সে হবে আমাদেরই ন্যায় কোন এক পাগল। এই পাগলদেরকে তাদেরই মুসলিম শাসকগণ ধোকা দেবে এবং তলে তলে বন্ধু হয়ে থাকবে। তোমরা বলেছে, আমরা এই ঝড় প্রতিহত করতে পারবো। কিন্তু আমাদের মৃত্যুর পর এই ঝড় পুনরায় উত্থিত হবে।
তখন আবার আরেকজন সালাহুদ্দীন জন্মলাভ করবেন- সালার সারেম মিসরী বললেন- তখন আরেকজন মূরুদ্দীন জঙ্গীর আবির্ভাব ঘটবে। মুসলিম মায়েরা মুজাহিদ জন্ম দিতে থাকবে।
আর এই মুজাহিদরা বিলাসী শাসকদের হাতের খেলনা হয়ে থাকবে সুলতান আইউবী খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন- আর সেই সময়টাও এসে যাবে, যখন সেনাবাহিনীও বিলাসী সৈনিকে পরিণত হবে এবং তাদের সালার কাফেরদের হাতে খেলতে থাকবে।
