একে আপনি পরাজয় বলবেন না- সুলতান আইউবীর হতাশা দেখে এক সালার বললেন- বৈরুত যেখানে ছিলো সেখানেই আছে এবং সেখানেই থাকবে। আমরা নগরীটা পুনরায় আক্রমণ করবো।
এতো বড় একটা শিকার আমার হাত থেকে বেরিয়ে গেছে- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন- আমি নগরীটা অবরোধ এবং দখল করতে এসেছিলাম। কিন্তু ফল হলো বিপরীত। আমি নিজেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়লাম এবং অবরোধ প্রত্যাহার করে পেছনে সরে আসতে বাধ্য হলাম। এটা পরাজয় নয় তো কী? আমাদেরকে মেনে নেয়া উচিত এটা পরাজয়। আমার সালার-উপদেষ্টাদের মধ্যেও গাদ্দার আছে।
তাঁবুতে নীরবতা নেমে আসে। কারো মুখে টু-শব্দটি নেই। সে সময়ে সুলতান আইউৰী নাসীবা নামক স্থানে সেনা ছাউনিতে অবস্থান করছিলেন। বহু দিন কেটে গেছে। বাহিনী অনেক ক্লান্ত। বহু জখম ও আছে। সুলতান তাঁর এই বাহিনীকে কায়রো থেকে বৈরুতে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিয়ে এসেছিলেন। বাহিনী কয়েক মাসের পথ কয়েক দিনে অতিক্রম করে এসেছে। গন্তব্যে এসে পৌঁছানোর পরপরই খৃস্টানদের অবরোধ থেকে বের হওয়ার জন্য তাদেরকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে এবং পরক্ষণেই দ্রুতগতিতে পিছনে সরে আসতে হয়েছিলো। বাহিনীকে পরিপূর্ণ বিশ্রাম দেয়ার জন্য সুলতান আইউবী নাসীবা নামক স্থানে ছাউনি স্থাপনের নির্দেশ দেন। কিন্তু বিশ্রাম ছিলো শুধু বাহিনীর জন্য। সুলতানের নিজের কোন বিশ্রাম নেই। চোখে ঘুমটি পর্যন্ত নেই তাঁর। দিনে হয় তাঁবুতে পায়চারি করছেন কিংবা বাইরে বের হয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছেন। সালারদের সাথেও তেমন কথা বলছেন না। ঠিক এমন এক অবস্থায় এক সালার তাকে বললেন, আপনি একে পরাজয় বলবেন না। সুলতানের উত্তর শুনে সালার নিশ্চুপ হয়ে যান। সুলতান তাঁবুতে পায়চারি করতে থাকেন। সেখানে আরো একজন সালার ছিলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত উভয়ে নীরব থাকেন। লতান আইউবীর মেজাজে রাগ বলতে ছিলো না। তথাপি সালারগণ তার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেতেন।
তোমরা দুজনে কী চিন্তা করছো? সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
আমি ভাবছি, আপনি যদি এভাবে হতাশা ও ক্ষুব্ধ অবস্থায় থাকেন, তাহলে আপনার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত আরো ক্ষতিকর হতে পারে- এক সালার বললেন- রামাল্লার পরাজয়ের সময়ও আমি আপনাকে এই অবস্থায় দেখিনি। আপনি ঠাণ্ডা হোন এবং এই আবেগময় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন।
আর আমি ভাবছি- অপর সালার বললেন- কাফেররা আমাদের মূলে ঢুকে পড়েছে। এই মুহূর্তে আমরা যে ভূখণ্ডে অবস্থান করছি, এটি আমাদেরই ভূমি। আমাদের যুদ্ধ খৃষ্টানদের সঙ্গে। আর আমাদের লক্ষ্য ফিলিস্তীনের স্বাধীনতা। অথচ মুসলিম আমীরদের একজনও আমাদের সঙ্গে আসেনি। ইযযুদ্দীন-ইমাদুদ্দীন কোথায়? তারা কি আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়নি যে, প্রয়োজনের সময় তারা আমাদেরকে সৈন্য দেবে? তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে, এখনো তারা খৃস্টানদের হাতের পুতুল। তো আমরা কি এভাবেই পরস্পর লড়াই করতে থাকবো?
সুলতান আইউবী তাঁবুতে পায়চারি করছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে যান। আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আমার রাসূলের উম্মতের পতন শুরু হয়ে গেছে। মুসলমান যখন বিজাতির অনুসরণ শুরু করে, তার পরিণতি এটাই হয়, আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি ও ভুগছি। ইহুদী-খৃস্টানরা মুসলমানদেরকে তাদের গোলাম বানানোর জন্য মানব স্বভাবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটাকে কাজে লাগায়। তা হচ্ছে লোভ। ক্ষমতার লোভ, রাজা-রাজপুত্র হওয়ার লোভ এবং আমি তুলার ন্যায় নরম পালিচার উপর দিয়ে হাঁটবো আর সাধারণ মানুষ খালি পায়ে আমার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকবে এই লোভ। এসব লোভ যখন মানুষের অন্তরে ঢুকে পড়ে, তখন হৃদয় থেকে ঈমান চলে যায়। বিবেকের উপর এমন আবরণ পড়ে যায় যে, তার কাছে জাতীয় চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধ বলতে কিছু থাকে না। এমন মানুষ অর্থ, ক্ষমতা আর বিলাসিতা ছাড়া কিছুই বুঝে না। একজন মানুষ যখন এই চরিত্র ধারণ করে, তখন সে নিজ ধর্ম ও দেশ-জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকে গৌরবজনক চরিত্র মনে করে। খৃস্টানরা আমাদের অধিকাংশ আমীরকে এই স্তরে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। তারা তাদের সভ্যতার বেহায়াপনাকে মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের সভ্যতা যখন বদলে যায়, তখন ধর্ম একটা দুর্বল খোলসে পরিণত হয়, যা খুলে ছুঁড়ে ফেলা যায় এবং জাতিকে ধোকা দেয়ার জন্য গায়ে জড়িয়েও নেয়া যায়।
উভয় সালার চুপচাপ সুলতান আইউবীর বক্তব্য শুনছেন। সুলতান থেমে থেমে বলছিলেন। এবার থেমে যান। আবার গভীর একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন- তোমরা বুঝতে পারছে না, আমি কর্মক্ষেত্রের পুরুষ, এখন কিনা তাবুতে দাঁড়িয়ে নারীর ন্যায় কথা বলছি। এটিও আমার পরাজয়। এই মুহূর্তে আমাকে বাইতুল মুকাদ্দাস থাকার কথা ছিলো। আমার কপাল মসজিদে আকসয় সেজদা করতে ছটফট করছে। যেসব মুজাহিদ ফিলিস্তীনের মর্যাদা ও আযাদীর জন্য জীবন ত্যাগ করেছে, আমাকে তাদের রক্তের বদলা নিতে হবে।
সুলতান আইউবীর কণ্ঠে আক্রোশ চড়ে গেছে। তিনি পায়চারি করতে করতে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন- তোমরা কি সেই শিশুদের মুখ দেখাতে পারবে, যাদেরকে আমার নির্দেশ ও প্রত্যয় এতীম করেছে? তোমরা কি সেই নারীদের সম্মুখে গিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে, যাদের স্বামীরা আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলে আমাদের সঙ্গে এসেছিলো এবং তাদের রক্তাক্ত দেহ ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়েছে? তোমরা সেই সুদর্শন যুবকদের কীভাবে ভুলতে পারবে, যারা আমাদের থেকে বহু দূর দুমশনের অঞ্চলে গিয়ে শহীদ হয়েছে? আমি তো তাদের মায়েদের সম্মুখে যেতে ভয় পাই। ভয়টা এই জন্য যে, যদি কেউ বলে বসে, হয় আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও, নতুরা আমাকে প্রথম কেবলায় নিয়ে চলো। ওখানে গিয়ে আমি আমার পুত্রের শাহাদাঁতের শুকরিয়া নামায আদায় করবো। তখন আমি সেই মাকে কী জবাব দেবো?
