সংবাদটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। সুলতান আইউবীর নৌ-বাহিনী প্রধান হুসামুদ্দীন রীতিমতো ভাবনায় ডুবে যান। তারা পরস্পর মতবিনিময় করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ফিরিঙ্গিরা আমাদের আগমনের সংবাদ পেয়ে গেছে। বিষয়টা সুলতান জানেন কিনা কে জানে। সিদ্ধান্ত হলে, সুলতানকে সংবাদটা পৌঁছানো হবে। এ সময় তার বৈরুতের কাছাকাছি থাকার কথা।
তৎক্ষণাৎ জাহাজ থেকে দুটি নৌকা নামানো হলো। দুজন দূতকে দুটি ঘোড়া দিয়ে তীরে কোথায় অবতরণ করবে এবং কোন্দিকে যাবে বলে দেয়া হলো। দূতরা সুলতান আইউবীকে সংবাদ জানানোর জন্য রওনা হয়ে যায়।
***
দূতরা রাতারাতি গন্তব্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু ততোক্ষণে সুলতান আইউবী ফিরিঙ্গিদের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছেন। তিনি বৈরুত অবরোধ করেছিলেন। স্থলের সবদিকে সৈন্য ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। রিজার্ভ ফোর্সের একটি ইউনিটকেও জবাবি আক্রমণের লক্ষ্যে ব্যবহার করে ফেলেছেন সুলতান। ফিরিঙ্গিরা কঠোরভাবে তার মোকাবেলা করে। পরদিন অবরোধের অপর একটি অংশের উপর আক্রমণ হয়। সুলতান আইউবী তাদের বিরুদ্ধেও রিজার্ভ ফোর্স প্রেরণ করেন। এবার তিনি ভাবনায় পড়ে যান, আমি তো রিজার্ভ ফোর্স ব্যবহার করা ছাড়াই যুদ্ধ জয় করে নিতাম। কিন্তু এখানে তো রিজার্ভ ফোর্সের অর্ধেক শক্তি শুরুতেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো। তিনি অবরোধকে দুর্বল করতে চাচ্ছিলেন না। এবার তার মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করে।
সুলতান আইউবীর অনুসন্ধান ও গেরিলা ব্যবস্থাপনা ছিলো খুবই উন্নত। তিনি সংবাদ পেতে শুরু করেন, পেছনে, সবদিকে শত্রুর উপস্থিতি বিদ্যমান। একটি গেরিলা ইউনিটের একজন মাত্র সৈনিক রক্তরঞ্জিত অবস্থায় ফিরে এসেছে। লোকটি মাত্র এটুকু বলে শহীদ হয়ে গেছে যে, তার পুরো বাহিনী ফিরিঙ্গিদের বেষ্টনীতে এসে পড়েছিলো। সে ছাড়া আর একজনও জীবন রক্ষা করতে পারেনি এবং আমাদের এই অবরোধ ফিরিঙ্গিদের বিপুলসংখ্যক সৈন্যের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
তার পরক্ষণেই নৌ-দূতরা এসে পৌঁছে। তারা সুলতান আইউবীকে সংবাদ জানায় এবং হুসামুদ্দীনের জন্য নির্দেশ কামনা করে।
খৃষ্টানদেরকে আমি এরূপ প্রস্তুত অবস্থায় কখনো দেখিনি- সুলতান আইউবী তার হাইকমান্ডের সালার প্রমুখদের বললেন- স্পষ্ট বুঝতে পারছি, তারা সময়ের আগেই সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলো যে, আমরা বৈরুত অবরোধ করতে যাচ্ছি। এখন আমরা নিজেরাই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। ঠিকানা থেকে এতো দূরে এসে পরাজিত যুদ্ধ লড়া যায় না। তিনি হুসামুদ্দীনের দূতদেরকে বললেন- তোমরা হুসামুদ্দীনকে বহর নিয়ে ফিরে যেতে এবং তার সৈন্যদেরকে ইসকান্দারিয়া নেমে দামেশক রওনা হতে বলো।
দূতরা চলে গেলে সুলতান আইউবী মসুল অভিমুখে পিছপা হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু পিছপা হওয়াও সহজ নয়। এ কাজেও গেরিলাদের ব্যবহার করা হয়। রাতে বাহিনীকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে এনে বের করে দেয়া হলো। কিছু সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু গেরিলা ও পশ্চাৎ বাহিনী জীবন ও রক্তের নজরানা দিয়ে বাহিনীকে সেখান থেকে বের করে আনে। ফিরিঙ্গিরা ধাওয়া করেনি।
মসুলের পথে সুলতান আইউবীর মসুল থেকে আসা এক গোয়েন্দার সাক্ষাৎ ঘটে। সে ইসহাক তুর্কির রওনা হওয়া এবং মসুলের গবর্নর ইযুদ্দীনের পরিকল্পনা সম্পর্কে পুরোপুরি তথ্য প্রদান করে। সুলতান ক্ষোভে লাল হয়ে যান। তিনি মসুল অবরোধ করার আদেশ জারি করেন।
কাজী রাহউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ১৯৮২ সালের ১০ নবেম্বর মোতাবেক ৫৭৮ হিজরীর ১১ রজব বুধবার মসুলের নিকটে গিয়ে পৌঁছেন। আমি তখন মসুল ছিলাম। ইযযুদ্দীন আমাকে বললেন, আপনি গিয়ে খলীফার নিকট থেকে সাহায্য নিন। আমি দজলার কোল ঘেঁষে ঘেঁষে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাত্র দুদিন দুঘণ্টায় বাগদাদ পৌঁছে যাই। খলীফা আমাকে বললেন, তিনি শাইখুল উলামাকে বলে মসুল ও সুলতান আইউবীর মাঝে সমঝোতা করিয়ে দেবেন। মসুলের গবর্নর আজারবাইজানের শাসনকর্তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু তিনি যে শর্ত আরোপ করেন, তার চেয়ে ভালো ছিলো ইযযুদ্দীন সুলতান আইউবীর হাতে অস্ত্র সমর্পণ করবেন।
সন্ধি-সমঝোতার আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে যায়। ১৯৮২ সালের ১৫ ডিসেম্বর মোতাবেক ১৬ শাবান ৫৭৮ হিজরী সুলতান আইউবী মসুলের অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন এবং নাসীবা নামক স্থানে ফৌজকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ছাউনি স্থাপনের নির্দেশ দেন।
৭.৫ সারা
সারা
বৈরুতের অবরোধ খৃস্টানরা নয়, আমার ঈমান নিলামকারী ভাইয়েরা ব্যর্থ করেছে- সুলতান আইউবী তার সালারদের বললেন- আমি পারস্পরিক খুনাখুনি, রক্তারক্তি থেকে বিরত থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সম্ভব মনে হচ্ছে না।
বৈরুত অবরোধের ব্যর্থতা ছিলো সুলতান আইউবীর দ্বিতীয় পরাজয়। এই ব্যর্থতায় তিনি কিছুই হারাননি বটে, তবে অর্জনও হয়নি কিছুই। এ কারণে এই ব্যর্থতাকে তিনি পরাজয় বলেই ধরে নেন। তিনি না হোন, তার ইন্টেলিজেন্স এখানে অবশ্যই পরাজিত হয়েছে। বৈরুতের খৃস্টান বাহিনী সময়ের আগেই তথ্য পেয়ে গিয়েছিলো, সুলতান আইউবী বৈরুত অবরোধ করতে আসছেন। খৃস্টানরা এ সংবাদ পেয়েছে কায়রো থেকে। অথচ সুলতান তাঁর হাইকমান্ডের সালারগণ ব্যতীত কাউকে তার পরিকল্পনা জানতে দেননি।
