বৈরুতে বল্ডউইন তার বিভিন্ন সামরিক শাখা থেকে রিপোর্ট গ্রহণ করছেন। তার নিকট সংবাদ এখনো সেটিই যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বৈরুত অবরোধ করবেন। তিনি সুলতানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছেন বটে; কিন্তু পরবর্তী আর কোন সংবাদ পাননি, সুলতান আইউবী কায়রো থেকে রওনা হয়েছেন কিনা।
এতোক্ষণে খৃস্টান গোয়েন্দা কাফেলাটিও বৈরুত পৌঁছে গেছে। কিন্তু তারাও সম্রাট বল্ডউইনকে কোন সংবাদ জানাতে পারেনি। বল্ডউইন তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশ-পঁচিশজনের একটি অশ্বারোহী দলকে সম্মুখে প্রেরণ করেছিলেন। অরাও ফেরত আসেনি। তারা ফেরতে আসতে পারবেও না।
বল্ডউইনের অশ্বারোহী বাহিনীটি অনেক দূর চলে গিয়েছিলো। তারা দূর থেকে এক স্থানে এমন ধারায় ধূলি উড়তে দেখে, যা কোন কাফেলার হতে পারে না। মাটি থেকে উত্থিত এই ধূলিমেঘ কোন সৈন্য বাহিনীর ছাড়া অন্য কারো হতে পারে না। তারা টিলার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। কমান্ডার একটি টিলার উপর উঠে দেখতে শুরু করে। হঠাৎ একদিক থেকে একটি তীর এসে তার ঘাড়ে বিদ্ধ হয়। অন্যান্য আরোহীরা নীচে ছিলো। হঠাৎ তাদের উপরও তীরবর্ষণ শুরু হয়ে যায়। তাদের কয়েকজন পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সারেম মিসরীর গেরিলারা তাদেরকে জীবিত পালাতে দিলো না। সব কজনকে খুন করে তাদের অস্ত্র ও ঘোড়াগুলো দখল করে নেয়।
কোন সংবাদ না পাওয়া সত্ত্বেও বল্ডউইন ও তার প্রধান সেনাপতি নিশ্চিন্ত। তারা বৈরুতকে অবরোধ থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তাদের চিন্তামুক্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, সুলতান আইউবী এখনো কায়রো থেকে রওনা হননি এবং যুদ্ধ এখনো বহুদূর। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সুলতান আইউবী যতোই সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছেন, গেরিলাদের আক্রমণ ও তৎপরতার সংবাদ ততোই বেশি আসছে। এখন তো এমন সংবাদও আসতে শুরু করেছে যে, এতো মাইল দূরে দুশমনের একটি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে এতোজন গেরিলা শহীদ ও এতোজন আহত হয়েছে। এ ধরনের প্রতিটি সংবাদে সুলতান আইউবী একই উত্তর দিচ্ছেন- শহীদদেরকে কোথাও দাফন করে রাখো আর আহতদের পেছনে পাঠিয়ে দাও।
সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে এমন অঞ্চল দিয়ে নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে স্থানে স্থানে শত্রুর উপস্থিতি বিদ্যমান। এটা তার পরম সামরিক যোগ্যতার প্রমাণ। তার স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের গেরিলা ইউনিট আক্রমণ চালাতে চালাতে এবং শত্রুর শক্তি খর্ব ও ব্যর্থ করতে করতে এগিয়ে চলছে। কোথাও গেরিলা আক্রমণ শেষ পর্যন্ত তুমুল যুদ্ধের রূপ ধারণ করছে। কিন্তু গেরিলারা একস্থানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছে না। এই রক্তপাত সুলতান আইউবীর বাহিনী থেকে দূরে দূরে ঘটে চলছে।
***
হুসামুদ্দীন লুলুর নৌ-বহর ইসকান্দারিয়ায় প্রস্তুত অপেক্ষমান। প্রস্তুত নৌ-সেনারাও। হুসামুদ্দীন সুলতান আইউবীর দূরত্ব ও গতি অনুমান করে রেখেছেন। একদিন তিনি বাহিনীকে জাহাজে আরোহণ করার আদেশ প্রদান করেন এবং রাতের বেলা জাহাজের নোঙ্গর তুলে পাল উড়িয়ে দেন। নদীর বুক চিরে জাহাজ এগুতে শুরু করে। মুক্ত সমুদ্রে গিয়ে হুসামুদ্দীন জাহাজগুলোকে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দেন। তিনি একজন সুদক্ষ নৌ-প্রধান। তার জাহাজে করে ফৌজ যাচ্ছে, তার সালার ও নায়েব সালারগণ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা অন্ধকারে যাচ্ছে না। খোঁজ খবর নেয়ার জন্য তারা মৎস্য শিকারীর বেশে ছোট ছোট নৌকায় করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু সৈনিককে আগেই পাঠিছে রেখেছে।
কয়েকদিন ও কয়েক রাতের পথ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। দিগন্তে বৈরুত চোখে পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এখনো কোন নৌকা ফিরে আসেনি। হুসামুদ্দীন জাহাজের গতি থামিয়ে দেন এবং খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য অপর একটি নৌকা নামিয়ে দেন। রাতে তার দণ্ডায়মান জাহাজের সন্নিকটে সমুদ্র থেকে এক ব্যক্তি চীৎকার করে বললো- রশি ফেলল, রশি ফেলো। রশি ছুঁড়ে ফেলা হলো। রশি বেয়ে এক নৌ সেনা উপরে উঠে আসে। লোকটা অর্ধমৃত। সে বললো, খৃষ্টানদের একটি নৌকা তাদের নৌকার গতিরোধ করেছিলো। তাতে সৈন্য ছিলো। উভয়পক্ষে তীর বিনিময় হয়। আমি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমার সঙ্গীরা ধরা কিংবা মারা পড়েছে। আমি সংবাদ জানাতে এসেছি যে, দুশমন সজাগ রয়েছে।
এই ঘটনায় বুঝা গেলো, খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য প্রথমে যে লোকদের প্রেরণ করা হয়েছিলো, তারা ধরা পড়েছে এবং সম্ভবত তাদের মাধ্যমে দুশমন নৌ-বহর আগমনের তথ্যও পেয়ে গেছে।
হুসামুদ্দীন লুলুর নৌ-বহর আর বৈরুতের মাঝে এখন দূরত্ব এতোটুকু যে, সূর্যাস্তের পর পর পাল তুললে জাহাজ মধ্যরাত নাগাদ কূলে ভিড়তে পারবে। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে, খৃস্টানরা অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করার জন্য কূলে মিনজানিক স্থাপন করে রাখতে পারে। তা-ই যদি হয়, তাহলে জাহাজগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই ভয়ে পিছিয়ে থাকাও উচিত হবে না। সুলতান আইউবীর সমুদ্রের দিক থেকে সাহায্যের খুবই প্রয়োজন। এমন সময়ে তারা একটা নৌকা দেখতে পায়। নৌকাটা তাদের বহরের। তার সৈনিকরা সমুদ্র থেকে দুজন খৃস্টান সৈন্যকে ধরে নিয়ে এসেছে। খৃস্টানদের যে নৌকাটি হুসামুদ্দীনের বহরের নৌকার উপর আক্রমণ করেছিলো, এরা তার মধ্যে ছিলো। তারা আত্মরক্ষার জন্য সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর মুসলিম সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে যায়। প্রথমে কোন তথ্য দিতে সম্মত না হলেও হাত-পা বেঁধে সমুদ্রে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়া হলে তারা তথ্য দেয়, কূলে বল্ডউইনের সৈন্যরা ওঁৎ পেতে আছে এবং বহরে আগুন ধরানোর জন্য মিনজানিক প্রস্তুত রয়েছে। এই ধৃত সৈন্যদের থেকে আরো তথ্য পাওয়া গেলো, বৈরুতের ফৌজ ভেতরে কম এবং বাইরে শহর থেকে দূরে দূরে বেশি।
