আমি লোকটাকে ঘোড়ায় আরোহণ করতে ও পালাতে দেখি-বারবারা বললো- ঘটনাক্রমে আমার তাঁবুতে ধনুক ও ভূনীর ছিলো। আমি তুনীর ধনুক তুলে নিয়ে তার পিছনে ছুটে গেলাম। পরপর দুটি তীর ছুঁড়লাম। তীরটি ছুটেই গেঁথে যায়। অন্যথায় লোকটা পালিয়ে গিয়েছিলো।
আজই এমন কী ঘটলো যে, তোমার তাঁবুতে তীর-ধনুক ছিলো? মেরিনা বারবারাকে জিজ্ঞেস করে।
আর মার্টিন! এই ঘোড়াটা তোমার ছিলো- দলনেতা বললো- এটা কোথায় ছিলো? এর যিন কোথায় ছিলো?
ঘোড়াটা বন্দির তাঁবুর নিকট বাঁধা ছিলো। এক রক্ষী উত্তর দেয়।
তোমরা আমার এ কৃতিত্বটা মাটি করে দেয়ার চেষ্টা করছে। বারবারা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- লোকটা কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে কায়রো যাচ্ছিলো। আমি তাকে প্রতিহত করেছি। তাকে নয়- আমি বরং আমাদের স্বার্থ পরিপন্থী একটি গোপন তথ্য কায়রো পৌঁছানো ঠেকিয়েছি।
ঘটনাটা মূলত একটা নাটক। মেরিনার শত্রুতা উদ্ধারের লক্ষ্যে বারবারার পক্ষে প্রস্তুত করে দেয়া মার্টিনের ষড়যন্ত্র। মার্টিন এভাবেই উপকার করে বারবারাকে পেতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাদের দলনেতা একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা। সে বারবারা ও মার্টিনের প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- মার্টিন! এ পেশায় আমি তোমার অনেক আগে এসেছি। বৈরুতে পৌঁছানোর আগে আগে যথার্থ একটা উত্তর ঠিক করে ফেলল।
ঘটনাটা লোকগুলোর ব্যক্তিগত শত্রুতার ও বন্ধুত্বের রাজনীতি। যার শিকার হতে হলো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একজন মূল্যবান গুপ্তচরকে।
***
দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে সুলতান আইউবীর বাহিনী। অর্ধেক পথ অতিক্রম করে তারা এখন যে অঞ্চলে এসে উপনীত হয়েছে, সেটি খৃস্টান কবলিত এলাকা। বাহিনীর সকল সৈন্যের আকৃতি-গঠন এখন একই রকম। ধূলি-বালির স্তর জমে জমে এখন আর কাউকে চেনা যাচ্ছে না।
এখন মে মাস। মরুভূমি পোড়ানো লোহার ন্যায় উত্তপ্ত। সকলের মুখ-মাথা কাপড়ে আবৃত। অনুমতি ছাড়া পানি পান করতে পারছে না কেউ। বাহিনীর কোন বিন্যাস নেই। উট-ঘোড়ার আরোহীরা পদাতিকদের পালাক্রমে সওয়ার করিয়ে পথ চলছে। আকাশটা জ্বলছে। আর দূর-দূরান্ত পর্যন্ত লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুখরিত ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কয়েকজন সৈনিক মিলে সম্মিলিত কণ্ঠে আবেগময় গান গাইছে আর তার তালে তালে সুর লহরীতে মুগ্ধ হয়ে ফৌজ এগিয়ে চলছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ফৌজের মধ্যস্থলে অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি নিজের জন্য পানি পান নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। হঠাৎ তিনি ঘোড়ার গতি পরিবর্তন করে অন্য একদিকে ছুটে যান। তাঁর হাইকমান্ডের সালার ও অপরাপর আমলাগণ যাদের মধ্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন দূতও ছিলো- তার পেছনে চলে যান। সমুখেই সেই জায়গা, যেখানে ইসহাক তুর্কি শহীদ হয়েছিলো। ভয়ানক আকৃতির কতগুলো টিলা। সুলতান আইউবী টিলাগুলোর মধ্যে প্রবেশ করে দাঁড়িয়ে যান এবং গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার সারেমকে উদ্দেশ্য করে বললেন- দোস্ত! এখান থেকেই তোমার কাজ শুরু হচ্ছে। ইউনিটগুলোকে ছড়িয়ে দাও। প্রতিটি বাহিনী অন্য অপর বাহিনী থেকে দূরে থাকবে। প্রথম বাহিনীটিকে এক্ষুনি পাঠিয়ে দাও।
আর বাকি ফৌজ এভাবেই চলতে থাকবে- সারেম মিসরীর চলে যাওয়ার পর সুলতান আইউবী অন্যদের বললেন- যে কোন পরিস্থিতিতে ফৌজ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে। আমরা শত্রুর অঞ্চলে এসে পড়েছি।
জরুরী দিক-নির্দেশনা প্রদান করে সুলতান আইউবী ধীরে ধীরে ঘোড়া চালাতে শুরু করেন। হঠাৎ এক ধারে তিনি এমন কিছু চিহ্ন দেখতে পান, যাতে প্রমাণিত হয় এখানে কোন পথিক অবস্থান নিয়েছিলো। সেখানেই একটি লাশ পড়ে আছে দেখা গেলো, যার অধিকাংশ বালিতে ঢেকে আছে। সুলতান আইউবী দাঁড়িয়ে যান। লাশটা অক্ষত নেই। হাড়গুলো দেখা যাচ্ছে শুধু। একজন কঙ্কলটা সোজা করে দেখায়। পিঠে দুটি তীর গেঁথে আছে। চেহারার গোশত শুকিয়ে গেছে।
বাদ দাও এসব- সুলতান আইউবী বললেন- কোন কাফেলার কেউ নিহত হয়েছে মনে হয়। মরুভূমিতে এসে মানুষ পাগল হয়ে যায়।
সুলতান আইউবী জানেন না, এই কঙ্কাল তারই একজন মূল্যবান গোয়েন্দা ইসহাক তুর্কির, যে বলতে যাচ্ছিলো, আপনি বৈরুত যাবেন না। ওখানে খৃস্টানরা যেভাবে তাদের সৈন্যদের ছড়িয়ে রেখেছে, তার নকশা বক্ষে এঁকে মিসর যাচ্ছিলো ইসহাক। এখন সুলতান আইউবীর সঙ্গে ইসহাকের সাক্ষাৎ হয়েছে বটে; কিন্তু তার কংকাল সুলতানকে কিছুই জানাতে পারলো না।
সুলতান আইউবীর গেরিলা বাহিনীটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তারা অগ্রসরমান মূল বাহিনীর উভয় পার্শ্বে দুতিন মাইল দূর পর্যন্ত চলে গেছে। কয়েকটি ইউনিট চলে গেছে পেছনে। বৈরুত থেকে অনেক দূরেই তাদের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তারা ভয়ানক অঞ্চলটা অতিক্রম করে চলে গেছে।
ফৌজ এগিয়ে চলছে।
মধ্যরাতে ছাউনি ফেলার আদেশ জারি হয়। বাহিনী দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু গেরিলা ইউনিটগুলো সক্রিয় ও তৎপর থাকে। তাদের জন্য নির্দেশ হলো, সন্দেহভাজন কাউকে দেখা গেলে এবং সে পালাবার চেষ্টা করলে মেরে ফেলবে। কোন কাফেলার দেখা পেলে তাদেরও গতিরোধ করে তল্লাশি নেবে।
বাহিনী এগিয়ে চলছে ও যাত্রাবিরতি দিচ্ছে। সূর্য উদিত হচ্ছে এবং মুজাহিদ বহরটিকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে। সুলতান আইউবীর নিকট প্রথম সংবাদ আসে, তার একটি গেরিলা ইউনিট খৃস্টানদের একটি সীমান্ত চৌকির উপর হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। মরু অঞ্চল শেষ হতে চলেছে। গাছ-গাছালি চোখে পড়তে শুরু করেছে। কোথাও সবুজের সমারোেহ দেখা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম-জনবসতিও চোখে পড়ছে।
