দুই খৃস্টান মেয়ের শত্রুতা যথারীর্তি চলছে। মেরিনা তার নেতার প্রিয়পাত্রী হয়ে আছে। আর বারবার এমনভাবে বিতাড়িত হয়ে আছে যে, দলনেতা যখনই তার সঙ্গে কথা বলছে, বলছে তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার সাথে। রাগে-ক্ষোভে ফুঁসে আছে বারবারা। ইসহাক যে তথ্য নিয়ে কায়রো যাচ্ছিলো, মেরিনা তার পক্ষ থেকে সেসব বের করে নেয়ার তালে ব্যস্ত। এই রূপসী মেয়েটি রাতের পর রাত ইসহাকের পাশে বসে তাকে উত্তেজিত করার সব রকম প্রচেষ্টা ও পরীক্ষা চালিয়েছে। কিন্তু ইসহাক যেনো পাথরের মূর্তি। বারৰারীর ঐকান্তিক কামনা ইসহাক বারবারাকে কোন তথ্য না দিক।
দলনেতার পরের অবস্থান মার্টিন নামক এক ব্যক্তির। এই লোকটি বারবারার প্রেমের প্রিয়াসী। কিন্তু বাররা তাকে কোন সুযোগ দিচ্ছিলো না। মার্টিন তাকে হুমকিও প্রদান জ্বরছিলো, এ শাস্তি তোমাকে ভোগ করতে হবে। এই হুমকি তাকে দলনেতাও দিয়েছিলো। মেয়েটি পূর্ব থেকেই নিরাশ। এবার সে ভয়ও পেতে শুরু করেছে।
মেরিনার অবজ্ঞামূলক কথাবার্তায় বারবারার রক্ত চড়ে যায়। একদিন মেরিনা তাকে বললো- কারবারা! তুমি এ কাজের মোগ্য নও। তোমার খুলিতে মগজই নেই। তোমাকে নাচ-গানের আর বেশ্যালয়েই বেশ মানায়। আমি মরু অঞ্চলে এসেও একটি মুসলমান গোয়েন্দাকে ধরে ফেলেছি। এটি আমার শিকার। তুমি তার কাছে ঘেঁষবে না। বৈরুতে গিয়ে আমি এই কৃতিত্বের পুরস্কার লাভ করবে।
বারবারা জ্বলে ওঠে। আজ ক্ষোভের জোয়ারে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। মার্টিন তো তার পেছনে ঘুর ঘুরই করছে। বারবারা রাতে তার নিকট গিয়ে বললো, আমি মেরিনা থেকে প্রতিশোধ নিতে চাই। সে আশঙ্কাও প্রকাশ করে, বৈরুত পৌঁছার পর মেরিনা যে কোন কৌশলে তাকে শাস্তি দেয়াবে। মার্টিনের সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা করে। মাটিনকে মেয়েটির এমন একটি দুর্বল পরিস্থিতিরই প্রয়োজন ছিলো। সুযোগটা হাতে এসে যায় তার। সে বারবারাকে সর্বাত্মক সাহায্য দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। বিনিময় দাবি করে শুধু এটুকু যে, তুমি আমার হয়ে যাবে। বারবারা ভদ্র মেয়ে নয়। মাটিন তার নিকট দাবি করেছে, তা দেয়া মেয়েটির পক্ষে কোন ব্যাপার নয়। সে সঙ্গত হয়ে যায়। বারবারা পাপের মাঝে প্রতিপালিত এবং পাপের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি নষ্টা মেয়ে। মানি তৎক্ষণাৎ একটা পরিকল্পনা ঠিক করে নেয়ু এবং বারবারাকে অবহিত করে। পরিকল্পনাটা আগামী রাতে বাস্তবায়ন করা হৰে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে।
পরবর্তী রাত। আজ যে স্থানটায় অবস্থান গ্রহণ করা হলো, এটি মরুভূমির এক ভয়ঙ্কর এলাকা। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্ময়কর ও অভিনব আকৃতির অসংখ্য টিলা দাঁড়িয়ে আছে। কোনটি দেখতে স্তম্ভ ও মিনারের ন্যায়। কোনটি আঁকাবাকা দেয়ালের মতো। ফোনটি যেনো আস্ত একটা প্রাণী। টিলাগুলো ইতস্তুত ছড়িয়ে রয়েছে। পানি ও গাছ-গাছালির চিহ্নও নেই। রাতের বেলা ষ্টিলগুলোকে মনে হচ্ছে ফেলো কতগুলো মানর দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসার পর ফেলা এই ভূখণ্ডে এসে যাত্রাবিরতি নেয়। মাটিন অন্ধকারে নিজের ঘোড়াটা নিজ তাঁবুর সঙ্গে বেঁধে যিনটা খুলে কাছেই এক স্থানে রেখে দেয়।
ইসহাকের তাবুটা মার্টিনের তাঁবুর কাছে স্থাপন করা হয়েছে। দলমে এখন ইসহাক সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত। ব্রাতে উট-ঘোড়ার আশপাশে রক্ষীরা ঘুমায়। ইসহাক ঘোড় নিয়ে পালিয়ে যাবে এমন আশঙ্কা নেই। ঘোড়ার পিঠে যি কয়ে পালাতে গেলে কেউ না কেউ টের পাবেই। কাফেলার সদস্যরা সকলেই ক্লান্ত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে ইসহাকও। মধ্যরাতে গায়ে কারো আলতো পরশ অনুভব করে জেগে ওঠে ইসহাক। ফিসফিস কণ্ঠ শুনতে পায় ওঠো, পাশের তাঁবুর সঙ্গে যোড় দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই যিন পড়ে আছে। দেরি করো না, পালাও।
কে তুমি?
বারবারা- মেয়েটি উত্তর দেয়- তোমার প্রতি আমার এই সহানুভূতি কেন সে প্রশ্ন করো না। আমিই তোমাকে বলে দিয়েছিলাম, আমরা খৃষ্টান গোয়েন্দা। তুমি সময় নষ্ট করো না। সকলে ঘুমিয়ে আছে। তাড়াতাড়ি ওঠো। যে তাঁবুর সঙ্গে ঘোড়া বাঁধা আছে, তার ডানদিকে যাবে। সামনে পথ পরিষ্কার। আমি আমার তাঁবুতে চলে যাচ্ছি।
বারবারা নিজ তাঁবুতে চলে যায়। ধনুক ও নীটা হাতে নিয়ে। আবার বেরিয়ে যায়। বারবারা সেই পথের এক ধারে বসে যায়, সে পথে ইসহাককে পালাতে বুলেছিল।
ইসহাক দ্রুততার সাথে যিন বেধে ঘোড়াটা খুলে পা টিপে টিপে এগুতে শুরু করে। বালুর কারণে ঘোড়র পায়ের কোন শব্দ হচ্ছে না। কাফেলার সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছ। ইসহাক আঁৰু এলাকা থেকে বেশ দূরে গিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয় এবং কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে এবার জোরে ঘোড়া হাঁকায়। হঠাৎ মরুর শীতল রাতের নীরবঅ ভেদ করে একটা শা শব্দ কানে ঢুকে ইসহাকের। সেই সঙ্গে একটা তীর এসে গেথে যাত্ম তার পিঠে। পরক্ষণে এসে বিদ্ধ হয় আরেকটা তীব্র। সঙ্গে নারী কণ্ঠের চীৎকার পালিয়ে গেছে, পালিয়ে গেছে, ওঠো, জাগো, বন্দি পালিয়ে গেছে।
সবাই ধড়মড় করে জেগে ওঠে। বারবারা চীৎকার করে বেড়াচ্ছে বন্দি পালিয়ে গেছে। তার হাতে ধনুরু। তাড়াতাড়ি করে ঘোড়া দুটানো হয়। বেশি দূর যেতে হলো না। ইসহাক দুটি তীর পিঠে নিয়ে পড়ে আছে। ঘোড়াটা খানিক দূরে সঁড়িয়ে আছে। তীর নিকট থেকে ছেঁড়া হয়েছে। দেহের গভীরে গেঁথে আছে তীর দুটি। তবে এখনো হুঁশ আছে ইসহাকের। তাকে তুলে নেয়া হলো। দলনেতা তাকে জিজ্ঞেস করে পলায়নে কি তোমাকে কেউ সহায়তা করেছিলো? ইসহাক বললো–না, আমি মোড়া আর যিন দেখতে পেলাম। সকলে ঘুমিয়ে ছিলো। আমি পালিয়ে এলাম। এটুকু বলার পরই ইসহাক চৈতন্য হারিয়ে ফেলে। আর তার জ্ঞান ফিরে আসেনি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা ইসহাক তুর্কী শহীদ হয়ে যায়।
