সুলতান আইউবী চওড়া একখণ্ড কাপড়ের উপর কায়রো থেকে বৈরুত পর্যন্ত ভূখণ্ডের মানচিত্র আঁকিয়ে রেখেছিলেন। এখন সেটিকে দেয়ালের সঙ্গে ঝুলিয়ে অগ্রযাত্রার পথের উপর আঙ্গুল রেখে বললেন– এটি হবে আমাদের অগ্রযাত্রার রাস্তা।
বৈঠকের নীরবতা আরো অধিক গম্ভীর হয়ে যায়। সুলতান আইউবী সকলের চেহারার প্রতি তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন- আপনারা নীরব কেন? বলছেন না কেন, আমরা তাহলে শর অখালের উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করছি?… আমার বন্ধুগণ! আমরা সাবধানতার নীতির ভিত্তিতে যুদ্ধ করছি। যাত্রা শুরু করার আগে আমরা পার্শ্বের নিরাপত্তা ও পিছু হটার পথ দেখে আসছি। তার ফল হচ্ছে, খৃষ্টানরা আমাদের ফিলিস্তীন দখল করে আছে এবং দামেশক-বাগদাদ দখল করে মক্কা-মদীনা অভিমুখে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা এটে রেখেছে। যিয়াদের পুত্র তারেক যদি মিসরের উপকূলে বসে থাকতেন, তাহলে ইউরোপ পর্যন্ত ইসলামের পতাকা কোনদিন পৌঁছতো না। কাসেমের পুত্র মুহাম্মদ এতো বিপজ্জনক ও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ভারত পৌঁছেছিলেন। খৃষ্টানরা বহু দূর থেকে আমাদের ভূখণ্ডে এসেছিলো। ইসলামের সমুন্নতি যদি কাম্য হয়, তাহলে আমাদেরকে আগুনের মধ্যদিয়েও অতিক্রম করতে হবে। আর যদি রাজ্য শাসন উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আসুন মিসর সিরিয়াকে ভাগ করে নিয়ে আমরা প্রত্যেকে রাজা হয়ে যাই। তারপর আপন আপন রাজত্বকে অটুট রাখার জন্য নিজেদের দ্বীন ও ঈমান বন্ধক রেখে ইহুদী-খৃস্টানদের থেকে সাহায্য গ্রহণ করি।
মহামান্য সুলতান!- এক সালার দাঁড়িয়ে বললো- আমরা আপনার আদেশ-নির্দেশনার অপেক্ষায় অপেক্ষমান। দুশমনের অঞ্চলের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে বলে আমরা একজনও ভীত নই। আপনি বলুন এই পথ অতিক্রমে আমাদের বিন্যাস কী হবে? বাহিনী কি যার যার হেফাজত নিজে করবে?
না- সুলতান আইউবী বললেন- আমি সেই দিক-নির্দেশনার দিকেই আসছিলাম। প্রতিটি ইউনিট অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে। ডানে বাঁয়ে, আগে-পিছে কী ঘটছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করবে না। রসদ একসঙ্গে যাচ্ছে না। রসুদগুলো কয়েকভাবে বন্টন করে দেয়া হয়েছে, যাতে শক্ররা এগুলো ধ্বংস করতে না পারে। গেরিলা বাহিনী পুরো বাহিনীর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালন করবে। গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার সায়েম মিসরী এখানে উপস্থিত আছে। তাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তিনি তার গেরিলাদের প্রশিক্ষণ ও মহড়া সম্পন্ন করে ফেলেছেন। অন্য সকলে বৈরুতের উপর দৃষ্টি রাখবে।
সব রকম দিক-নির্দেশনা প্রদান করে সুলতান আইউবী বললেন রওনা আজ রাতের প্রথম প্রহরে হবে। সবচেয়ে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে- এখন এই কক্ষে আমরা যে কজন আছি, তার অতিরিক্ত একজনও যেনো না জানে আমাদের গন্তব্য কী। সৈনিক কমান্ডাররাও যেনো জানতে না পারে আমরা কোথায় যাচ্ছি।
সুলতান আইউবীর কল্পনায়ও নেই যে, বৈরুতে তাকে স্বাগত জানানোর আয়োজন সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে এবং ফিরিঙ্গিদেরকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ঝাঁপটে ধরা তার সম্ভব হবে না।
রাতের প্রথম প্রহর। বাহিনী রওনা হচ্ছে। সুলতান আইউবী তার হাই-কমান্ডের সালারদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি ইউনিটের সালাম গ্রহণ করছেন এবং দুআ দিচ্ছেন। তাঁর পার্শ্বে তার এক পুত্রের ওস্তাদ আতালীক দণ্ডায়মান। সুলতান আইউবী ওস্তাদ ও আলেমদের বেশ মর্যাদা দিতেন। মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদ লিখেছেন, বাহিনীর শেষ ইউনিটটি অতিক্রম করে যাওয়ার পর সুলতান আইউবী রওনা হতে উদ্যত হন। এমন সময় পুত্রের ওস্তাদ আতালীক একটি আরবী পংক্তি আবৃত্তি করেন, যার অর্থ হচ্ছে- আজ নজদের আরার ফুলের সুগন্ধি উপভোগ করে নাও। সন্ধ্যার পর এই ফুল পাওয়া যায় না।
মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদ লিখেছেন, সে সময় পর্যন্ত সুলতান আইউবীর মেজাজ উৎফুল্ল ছিলো। কিন্তু পংক্তিটা কানে আসার পর তিনি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। তার চেহারার দ্যোতি উবে যায়। বিদায়কাল এই পংক্তিটা তার কাছে অশুভ বলে মনে হলো। তিনি বাহিনীর পেছনে পেছনে রওনা হয়ে যান। পথে সালারদের বললেন আমার আশা ছিলো বিদায়কালে লোকটা আমাকে দুআ দেবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে এমন একটা পংক্তি শোনালেন, যেটি আমার হৃদয়ের উপর ভার সৃষ্টি করে দিয়েছে।
ঘটেছেও তাই। এই ওনার পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আর মিসর ফিরে আসতে পারেননি। পরবর্তী বাকি জীবন তার আরব ভূখণ্ডের যুদ্ধের মাঝে অতিবাহিত হয়েছে। মিসরবাসী আরার ফুল আর কখনো দেখতে পায়নি।
সুলতান আইউবী ১৯৮২ সালের মে মাসে মিসর থেকে রওনা হয়েছিলেন। খৃস্টান গোয়েন্দা ও নাশকতা কর্মীদের কাফেলা ইসহাককে নিয়ে এগিয়ে চলছে। ইসহাক তাদের কয়েদী। এখন তার হাত-পা বন্ধনমুক্ত। ইতিপূর্বে দুদিন দুরাত খাওয়ার সময় ছাড়া সারাক্ষণ তার হাত-পা বাঁধা থাকতো। ইসহাক দলনেতাকে বললো, আমি পালাবো না। বস্তুত তার পালাবার সুযোগও নেই আর পালিয়ে যাবেওবা কোথায়। বড়জোর দুক্রোশ পথ অতিক্রম করতে পারবে। তারপর নির্দয় মরুভূমি তাকে এমন অবেচতন করে নিঃশেষ করে ফেলবে, যেমনটি অজ্ঞান অবস্থায় সে ধরা পড়েছিলো। দলনেতা সঙ্গীদের সাথে পরামর্শ করে ইসহাকের বাঁধন খুলে দিয়ে সকলকে বলে রাখে, এর প্রতি নজর রাখবে। ইসহাক কথাবার্তা ও হাবভাবে তাদের আস্থা অর্জন করে নয়। সে সুলতান আইউবী এবং অন্যান্য মুসলিম শাসকদের গালমন্দ করতে শুরু করে। ইসহাক খৃস্টান দলনেতাকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, আমি আপনাদের গোয়েন্দা হয়ে যাবো। কিন্তু দলনেতা যখনই তাকে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছিলে, তখন সে সঠিক উত্তরদানে বিরত থাকছে।
