যার লক্ষ্যে ইসহাককে বলে দেয়, তুমি খৃস্টান গোয়েন্দাদের জালে এসে পড়েছে। ইসহাক তাদের এই জালে এমনভাবে ফেঁসে যায় যে, সে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়, আমি সুলতান সালাহুদ্দীনের গোয়েন্দা এবং হাল্ব থেকে এসেছি। খৃস্টানদের দলনেতা তাকে জিজ্ঞেস করে, কী সংবাদ নিয়ে যাচ্ছিলে? ইসহাক বললো, নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রোজি খাতুন ইযযুদ্দীনকে বিয়ে করেছেন। দলনেতা বললো, এ খবর বাসি হয়ে গেছে। তোমাদের সুলতান এখন সিরিয়া অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
খৃস্টান দলনেতা জানতে চায়, বলো, তুমি কী কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছিলে। বৈরুতে তোমাদের মুসলমান গোয়েন্দারা কারা এবং তাদের আস্তানা কোথায়। যদি না বলো, তাহলে খৃস্টান অঞ্চলে নিয়ে তোমাকে কয়েদখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখা হবে। ইসহাক এই ভেবে নমনীয়তা প্রদর্শন করেছিলো যে, পালানোর একটা সুযোগ বের করে নিতে হবে। খৃস্টান দলনেতা তাকে খৃস্টানদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার প্রস্তাব করলে ইসহাক তাতেও সম্মত হয়ে যায়। কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছিলে এই প্রশ্নের উত্তরে ইসহাক আসল তথ্য ফাঁস না করে তাদের বুঝ দেয়ার চেষ্টা করে। সিরিয়ার মুসলিম আমীদের সম্পর্কে কিছু কথা বললেও বৈরুতের বিষয়টা সম্পূর্ণ চেপে যায় ইসহাক।
খৃস্টান দলটির সদস্য সংখ্যা আট। তারা কায়রোতে দায়িত্ব পালন করে বৈরুত ফিরে যাচ্ছে। দলনেতা ইসহাককে বললো, আমরা রাতে রওনা হবো। তারা বৈরুত যাচ্ছে এবং তাকেও ধৃত হয়ে বৈরুত যেতে হবে শুনে ইসহাকের পিলে চমকে ওঠে। ওখানে গেলে নাইটের সঙ্গেও তার দেখা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইসহাকের জন্য এটা আসল সমস্যা নয়– আসল সমস্যা হচ্ছে সুলতান আইউবীকে বল্ডউইনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করার প্রয়োজন ছিলো এবং তাকে সতর্ক করার আবশ্যক ছিলো, যেনো তিনি বৈরুত অভিযান মুলতবী রাখেন। এ দায়িত্ব পালন করতে পারলে ইসহাকের জীবন দিতেও পরোয়া ছিলো না। কিন্তু এখন তো সে শত্রুর হাতে বন্দি এবং নিরস্ত্র হয়ে পড়েছে।
কাফেলা রাতে রওনা হয়। হাত দুটো পিঠমোড়া করে বেঁধে ইসহাককে একটা উটের পিঠে বসিয়ে দেয়া হয়। এই উটের উপর মালামালও বোঝাই করা। সুলতান আইউবীর এই গোয়েন্দা বৈরুত থেকে কায়রো রওনা হয়েছিলো। কিন্তু কায়রো না পৌঁছেই মাঝপথ থেকে এখন পুনরায় বৈরুত যেতে হচ্ছে। দূরত্ব অনেক দীর্ঘ। কাফেলা এগিয়ে চলছে। ইসহাক তুর্কি পালানোর পথ খুঁজে ফিরছে।
***
আমি আর একটা দিনও অপেক্ষা করতে পারি না- সুলতান আইউবী তাঁর সালারদের বললেন- ফৌজ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। ফৌজকে এভাবে বেশি দিন রাখা উচিত নয়। অন্যথায় সৈনিকদের স্নায়ু ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়বে। আর এই অবস্থাটা যুদ্ধের জন্য ক্ষতিকর হয়। তাছাড়া আমি খৃস্টানদেরকে প্রস্তুত অবস্থায় ঝাঁপটে ধরতে চাই। অতীতে আমরা যখনই যুদ্ধ করেছি, নিজেদের অঞ্চলে করেছি। আর এই ভেবে আনন্দিত হয়েছি যে, আমরা দুশমনকে পিছু হটিয়ে দিয়েছি। দুশমন আমাদেরই ভূখণ্ডে আক্রমণ করলে আবার পিছপা হয়ে আমাদেরই মাটিতে অবস্থান নিয়ে থাকলো। এখন আমার প্রতিটি পদক্ষেপ আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হবে। ফিরিঙ্গি বাহিনী বৈরুতে অবস্থান করছে। তাদের ব্যাপারে আমি কোন সংবাদ পাইনি। বল্ডইউন যদি তৎপরতা চালাতো, তাহলে আমি সংবাদ পেতাম। আমার অনুমান হচ্ছে, সে আর অন্যান্য খৃস্টানরা মুসলমান আমীরদেরকে তাদের সমর্থক ও আমাদের শত্রু বানানোর কাজে ব্যস্ত। তারা আমাদেরকে আরেকবার গৃহযুদ্ধে জড়াতে চায়। তারা গোপন তৎপরতায় ব্যস্ত রযেছে। আমরা বৈরুত অবরোধ করবো। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডটি আমাদের দখলে এসে যাবে।
সালরদের এই বৈঠকে সুলতান আইউবীর নৌ-বাহিনী প্রধানও উপস্থিত আছেন। এক মিসরী কাহিনীকার মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীস তার নাম হুসামুদ্দীন লুলু লিখেছেন। তিনি নৌ-যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ এবং অতিশয় যোগ্য নৌ-বাহিনী প্রধান হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। বৈরুত যেহেতু নোম উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিলো, তাই সুলতান আইউবী ঘেরাও পরিপূর্ণ করার লক্ষ্যে সমুদ্রের দিক থেকেও বাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
যে ইউনিটগুলোর নৌযানে যাওয়ার এবং তীরে অবতরণ করার কথা, তারা ইসকান্দারিয়া পৌঁছে গেছে। হুসামুদ্দীনকে যাবতীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে- সুলতান আইউবী বললেন- নৌপথে গমনকারী বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। সে জন্য এই বাহিনী কিছুদিন পর রওনা হবে। নৌ-বাহিনী তীরে অবতরণ করবে। দ্রুতগামী দূত এসে আমাদেরকে তাদের অবতরণের সংবাদ জানাবে। নগরীর উপর তাদের আক্রমণ হবে ঝড়গতিতে। ফিরিঙ্গিরা যদি অল্প সমর্পণ না করে, তাহলে আপনাদের সকলের জন্য অনুমতি আছে নগরীটা ধ্বংস করে দিন। নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও রুগ্নদের গায়ে হাত তুলবেন না। তাদেরকে আশ্রয়ে নিয়ে নেবেন। সৈনিকদেরকে হত্যা নয়- বন্দী করবেন। কোন অবস্থাতেই লুটতরাজ করা যাবে না। আপনাদের জন্য অনুমতি থাকবে, যে কেউ আমার নীতি-নির্দেশনা অমান্য করবে, পদমর্যাদায় সে যতই উচ্চ হোক না কেন, তাকে হত্যা করে ফেলবেন। স্থলপথে গমনকারী বাহিনীর অগ্রযাত্রা শান্তির ধারায় নয়- যুদ্ধের গতিতে হবে। বিরতি হবে তাঁৰু ছাড়া। বিরতির সময় মালামাল খোলা ও নামানো যাবে না। সকলে পানি পাবে সীমিত পরিমাণে। খাদ্য রান্না হবে না। খেজুর ইত্যাদি কোনো খাবার সঙ্গে যাচ্ছে। পশুগুলোকে পর্যাপ্ত খাবার দেয়া হবে।
