আনুশির চোখে অশ্রু এসে যায় যে আমি নিজেই চিত্তাকর্ষক প্রতারণা, সেই আমি ধোঁকায় পড়ে গেলাম। তুমি জিতে গেছো আমের, তুমি জিতে গেছো। ভালোবাসার কাছে আমি পরাজিত। বলল, সত্য বলো আমের!
হ্যাঁ, আনুশি- আমের বললো- তুমি তোমার কর্তব্য পালন করেছো, আর আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমাকে তুমি কয়েকখানায় বন্দী করে রাখো।
আনুশির গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে। হঠাৎ সে অট্টহাসি দিয়ে বললো- ব্যস, এতোটুকুই জানবার প্রয়োজন ছিলো, যা তুমি স্বীকার করেছে। আমি তোমাকে বন্দী করাতে পারবো না। এখন আমিও এই পিঞ্জিরা থেকে মুক্ত হতে চাই। তুমি মদপান করো না। আমাদের সম্রাটগণ যে শরবত পান করেন, আমি তোমাকে সেই শরবত পান করাবো।
আনুশি বসা থেকে ওঠে টেবিলটার নিকট গিয়ে দাঁড়ায়। টেবিলের উপর একটি সোরাহি রাখা আছে। তার পিঠটা আমেরের পিঠের দিকে। আনুশি দুটি পেয়ালা নিয়ে নখের সাহায্যে আংটিতে স্থাপন করা ডিবাটা খোল। ভিবার কিছু পাউডার এক পেয়ালায়, কিছু অপর পেয়ালায় ঢেলে দেয়। বিষয়টা আমের দেখতে পায়নি। আনুশি উভয় পেয়ালায় সোরাহি থেকে শরবত চেলে একটি আমেরের হাতে তুলে দেয়, অপরটি নিক্সের হাতে রাখে।
শুকে দেখো- আনুশি বললো- এগুলো শরব নয় শরবত। এ আমার প্রিয় পানীয়। নাও পান করো।
আনুশি নিজের পেয়ালাটা ঠোঁটে লাগায়। আমেরও পান করতে শুরু কয়ে। ঢক ঢক করে পান করে উভয়ে পেয়ালা শূন্য করে ফেলে। আনুশি আমেরের হাত থেকে পেয়ালাটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমেরের গলাটা নিজের বাহুতে জড়িয়ে ধরে বললো- এখন আমরা স্বাধীন।
আনুশি হঠাৎ লাফিয়ে আমের থেকে আলাদা হয়ে বলে ওঠে- তুমি তা অনুভব করছো?
হ্যাঁ- আমের উত্তর দেয়- তোমার ডাক পেয়ে আমি ঘুম থেকে উঠে এসেছি। নিদ্রা আমাকে অস্থির করে তুলছে।
এখন আমরা উভয়ে এমন গভীর ঘুম ঘুমাবো যে, কেউ আমাদের জাগাতে পারবে না- আনুশি আচ্ছন্ন কণ্ঠে বললো- আমি তোমার চেয়ে বেশি ক্লান্ত। পাপের বোঝা আমাকে ক্লান্ত করে তুলেছে।
মেয়েটির মাথাটা একদিকে কাত হয়ে পড়তে শুরু করে। সে আত্মসংবরণ করে বললো- বেশি কথা বলার সময় নেই আমের। তুমি আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। এখন আমরা পরকালে একসঙ্গে উত্থিত হবো। আমি আমার কর্তব্য আদায় করেছি। তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। এই শরাবে আমি সেই বিষ মিশিয়েছি, যে বিষ দিয়ে আমাদেরকে বিদেশ প্রেরণ করা হয়ে থাকে। বস্তুটা প্রয়োজনের সময়কার জন্য দেয়া হয়। এই বিষপানে কোন তিক্ততা অনুভব হয় না। অত্যন্ত মিষ্টি আবেশের মধ্যে মানুষ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে। আমি এই জন্য জীবিড় থাকতে চাই না, যদি জীবিত থাকি, তাহলে তোমাকে শান্তি দিতে হবে। তোমাকে এ কারণে জীবিত থাকতে দেইনি, যেনো অন্য কোন মেয়ে বলতে না পারে আমেরের সঙ্গে আমায় ভালোবাসা আছে।
আমের ইবনে ওসমান শুয়ে পড়েছে। যেনো সে আনুশির বক্তব্য শুনতেই পাচ্ছে না। তার চোখ দুটো বুজে আসছে। আনুশির মাথাটা দুলছে। সে নড়বড়ে পায়ে দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেবিকা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। তাকে ভেতরে ডেকে এনে বললো- আমরা দুজনে বিষপান করেছি। তুমি সকলকে বলে দেবে, আমরা স্বেচ্ছায় বিষপান করেছি। অন্য কেউ পান করায়নি। কোন খৃষ্টানের দেখা পেলে বলবে, তাদের সুদানী পরী আয় কর্তব্য পালন করে চিরবিদায় নিয়েছে।
আনুশির কষ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসছে। পড়তে পড়তে আমেরের নিকট চলে যায়। সেবিকা দৌড়ে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দুজন লোক কক্ষে প্রবেশ করে। তারা দেখতে পায়, আমের ইবনে ওসমান পালকের উপর পড়ে আছে আর আনুশি তার গা ঘেঁষে এমনভাবে শুয়ে আছে যে, তার মাথা আমেরের বুকের উপর আর একহাত মাথার উপর। এক হাতের আঙ্গুলগুলো আমেরের চুলের ভেতর ঢুকে আছে, যেনো মেয়েটি আমেরের মাথায় বিলি কাটছে। দুজনই মৃত।
***
ইসহাক তুর্কি এখন মসুল থেকে বেরিয়ে গেছে। অপৱিচিত লোকটা সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর হতে পারে সন্দেহ করেও অনুশি তাকে, ধাওয়া করেনি, গ্রেফতার করার চেষ্টা করেনি। ভালোবাসার প্রতারণার মধ্যে যে সামান্য সময়টা আমেরের সঙ্গে অতিবাহিত করেছে, এ সময়টুকুতে সে আত্মিক প্রশাড়ি পেয়েছিলো। সেই ভালোবাসার বিনিময় হিসেবে মেয়েটি ইসহাককে নিরাপদে চলে যেতে দিয়েছে।
কায়রো পৌঁছতে আরো দিন কয়েকের পথ বাকি থাকতেই সাপটা ইসহাকের ঘোড়াটাকে দংশন করে। অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে কায়রো যাচ্ছিলো ইসহাক, যার সঙ্গে ইসলামের মর্যাদা ও সুলতান ও আইউবীর অস্তিত্বের সম্পর্ক। ইসহাক এক মর্দে মুজাহিদ। জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এই বিস্তৃত নির্দয় মরুদ্যান অতিক্রম করে সেই তথ্য নিয়ে কায়রো পৌঁছুতে চাচ্ছিলো। কিন্তু সাপ ঘোড়াটাকে দংশন করায় ইসহাক মরুর নির্মম আচরণে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। যখন জ্ঞান ফিরে, সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ইসহাক তখন খৃস্টানদের তাঁবুতে পড়ে আছে। ইসহাক চোখ খুলে দেখতে পায়, দুটি মেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বিস্তারিত কাহিনী আপনারা পেছনে পড়ে এসেছেন।
ইসহাক তুর্কি অচৈতন্য অবস্থায় বিড় বিড় করতে থাকে। অজ্ঞাতসারে তার উচ্চারিত শব্দগুলো থেকে খৃস্টান দলটি বুঝে ফেলে লোকটি মুসলমান গোয়েন্দা এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে কায়রো যাচ্ছে। দুই মেয়ে মেরিনা ও বারবারার মধ্যে মন কষাকষি ছিলো। তারা উভয়ই কমান্ডারকে পেতে চাচ্ছিলো। কিন্তু কমান্ডার বারবারাকে প্রেমের ধোকা দিয়ে মেরিনার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। বারবারা প্রতিশোধ
