ইসহাক তুর্কিকে প্রাপ্ত সকল তথ্য অবহিত করা হলো। সে উঠে ঝোঁপ-জঙ্গলের মধ্যদিয়ে অতি সন্তর্পণে বেরিয়ে পড়ে। এ সময় তার অনুভব হতে লাগলো, কার যেন পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ইসহাক এদিক-ওদিক তাকায়। আর সন্দেহ জাগে, খানিক দুরে ছায়ার মতো একটা কি যেনো চলে গেছে এবং ঝোঁপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিষয়টার প্রতি মনোযোগ দেয় না ইসহাক। মাথায় তার ভাবনা, যুঙ্গে তাড়ি সঞ্জয় তাকে কায়রো পৌঁছতে হবে। এমন যেনো না হয়, তার পেছার আগেই সুলতান আইউবী রওনা হয়ে গেছেন। এখান থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে অত্যন্ত আনন্দিত সে। ইসহাক তার সখীদের নিকট যায়। খুব তাড়াতাড়ি করে চারটা খেয়ে রওনা হয়ে যায়। সামনে তার আরো কাজ আছে। হালব গিয়ে কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
ইসহাক হা্লব পৌঁছে যায়। কমান্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। কমান্ডার ইসহাককে অতিশয় উন্নত জাতের একটি ভাগড়া ঘোড়া প্রদান করে। পানির জােট একটি মশক ও খাদ্যভর্তি থলে ঘোড়ার সাথে বেঁধে দেয়। ইসহাক কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
***
যে রাতে ইসহাক ভ্রমণস্থলে রোজি খাতুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলো, সে রাতে মন ভালো না থাকার অজুহাতে আনুশি ইম্যুদ্দীন ও সাঙ্গপাঙ্গদের আসরে যায়নি। মেয়েটি অসুস্থ ভেবে ইমুদ্দীন ডাক্তার অলর করেন। ডাক্তার দেখে ওষুধ দেন। কিন্তু আনুশি ওষুধ খেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো- বিরক্ত করো না, আমাকে একটু শান্তিতে এক খাকতে দাও।
রাত জাগরণ ও অধিক মদ্যপানের কারণে তার এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ইযযুদ্দীন ও ডাক্তার চলে যায়। আলুশি কক্ষের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে কক্ষে ভেতরে পায়চারি করতে থাকে। মনটা তার বেজায় অস্থির। বার কয়েক জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকায় আবার পায়চারি করতে শুরু করে।
আনুশি তার অলঙ্কারের বাক্সটা খোলে। একটি আংটি বের করে। আংটির নগিনার জায়গাটা ডিবার মতো। অত্যন্ত সুন্দর ও ভারী একটি আংটি। আনুশি আংটির ডিবাটা খুলে। তার মধ্যে সাদা পাউডার ভর্তি। সে পাউডারগুলোর প্রতি খানিক তাকিয়ে ডিবাটা বন্ধ করে আংটিটা আঙ্গুলে পরিধান করে। এবার তাকে কিছুটা শান্ত মনে হলো, যেনো অস্থিরতা দূর করার চেষ্টা করছে।
রাত অর্ধেক কেটে গেছে। আনুশির সেবিকা তার কক্ষের কাছাকাছি অপর এক কক্ষে ঘুমিয়েছিলো। তাকে বলে দিয়েছিলো, আজ রাতে আর তাকে প্রয়োজন নেই। কিন্তু মধ্যরাতের পর আনুশি সেবিকার কক্ষে গিয়ে তাকে জাগিয়ে বললো, আমের ইবনে ওসমানকে ডেকে আন।
সেবিকা আনুশি-আমরের প্রেমের ঘটনা জানতো। সে উঠে গিয়ে আমেরকে ডেকে আনে। আনুশি সেবিকাকে বললো- তুমি কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো।
আমের!- আনুশি এমন এক ভঙ্গিতে বললো, যেনো তার সঙ্গে আমেরের পরিচয় নেই- আজ ভ্রমণস্থলে তোমাদের সঙ্গে যে লোকটা বসা ছিলো, সে কে?
কেউ নয়- আমের অজ্ঞতা প্রকাশ করে উত্তর দেয়- আমার নিকট কেউ আসেনি তো। আমি তো বেগমের সঙ্গে রক্ষী হিসেবে যাই এবং তার থেকে দূরে থাকি।
আমের!- আনুশি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত কণ্ঠে বললো- আমার সাত স্তর মাটির নীচের গোপন খবরও জানা আছে। তোমাকে আমি হৃদয়ের গভীর থেকে কামনা করি। কিন্তু তুমি আমাকে বোকা ভেবো না। তুমি, রোজি খাতুন, শামসুন্নিসা ও তার খাদেমা একসঙ্গে বসেছিলে আর একজন অপরিচিত লোক তোমাদের মাঝে বসা ছিলো। অতি গোপনীয় কথপোকথন হচ্ছিলো। প্রমাণ চাইলে তাও দিতে পারি। তোমরা কানে কানে কথা বলছিলে। শেষে অপরিচিত লোকটা সেখান থেকে চলে যায়। আমি তখন ফিরে আসি।
ইসহাক তুর্কি সেখান থেকে ওঠে চলে যাওয়ার সময় কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিলো। খানিক দূরে একটি ছায়াও দেখেছিলো। আসলে সে ছিলো আনুশি। মেয়েটি চুপি চুপি রোজি খাতুন, শামসুন্নিসা ও আমের ইবনে ওসমানের পিছু নিয়েছিলো।
আমের ইবনে ওসমান উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করে, যার কোন অর্থ দাঁড়ায় না। আনুশি দক্ষ গোয়েন্দা। তার সন্দেহটা ভিত্তিহীন নয়। বললো- শামসুন্নিসা যদি একা হতো তাহলে মনে করতাম, রাজকন্যা তোমাকে দখল করে রেখেছে। কিন্তু বিষয়টা ছিলো ভিন্ন। আচ্ছা বলো তো, তুমি আমাকে গোপন বিষয়াদি কেন জিজ্ঞেস করো?
এমনিই- আমের মুচকি হেসে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে- এমনিতেই জিজ্ঞেস করি। ওসব রাজকীয় ব্যাপারের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক থাকতে পারে। মনে কৌতূহল জাগে, আমরা রাজা-বাদশাহদের কী ভাবি, আর আসলে তারা কী।
আমের!- আনুশি অত্যধিক ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো- তুমি জানো না আমি কে। আমার এক ইশারায় এই নগরীর প্রতিটি ইট খসে পড়তে বাধ্য। আমার পিপাসু আবেগ আমাকে ধোঁকা দিলো। আমি তোমার প্রেমের নেশায় নিজের কর্তব্য ভুলে গেলাম আর তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তারপরও আমার হৃদয়ে তোমার প্রতি দুর্বলতা কাজ করছে। তার প্রমাণ, তুমি এখানে নিরাপদে অবস্থান করছে। আমি চাইলে তোমাকে সেই কয়েদখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা রাখতে পারতাম, যেখানে নির্যাতনের পর গাদ্দার ও গোয়েন্দাদের ফেলে রাখা হয়। তোমাকে আমি সেই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছি। শুধু এটুকু স্বীকার করো, আমার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ঐ অচেনা লোকটাকে দিয়েছে এবং সংবাদ নিয়ে লোকটা কায়রো চলে গেছে। তুমি আমার নিষ্ঠা আর ভালোবাসার প্রমাণ দেখো, আমি তোমাদের দেখে ফেলার পরও লোকটাকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছি। আমি ইচ্ছা করলে তাকে গ্রেফতার করাতে পারতাম। কিন্তু তোমার ভালোবাসা আমাকে এ কাজে বাধার সৃষ্টি করেছে।
