গন্তব্যে পৌঁছে গাড়িটা দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। রোজি খাতুন ওঁ শামসুন্নিসা কূপের দিকে চলে যায়। আমের ইবনে ওসমানও সঙ্গে আছে। আসলে এটা তাদের শুধু ভ্ৰমণ নয়, ভ্রমণের বাহানায় রোজি খাতুনের আমের থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করার ব্যবস্থা কাটে।
ইসহাক তুর্কি মসুলে তার এক সহকর্মীর নিকট পৌঁছে গেছে। সঙ্গী তাকে জানায়, রোজি খাতুনও তাদের দলে যোগ দিয়েছেন। বরং বলা যায়, তিনি তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন। উভয়ের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন ও তথ্য আদান-প্রদান হয়। ইত্যবসরে তাদের আরেক সঙ্গী এসে পড়ে। সে ইসহাককে জানায়, রোজি খাতুনের খাদেমাকে এ মুহূর্তে অমুক কূপের নিকট পাওয়া যাবে। ভালো হবে, তুমি গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করো। ইসহাক সঙ্গীদের তার ব্যস্ততার কথা জানায়। সম্ভব হলে রাতেই আবার সে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওয়া হয়ে যাবে।
কূপের কিনারায় বসে আমের ইবনে ওসমান রোজি খাতুন ও শামসুন্নিসাকে বলছে, আনুশির কথা অনুযায়ী সে নিশ্চিত হয়েছে, খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে হাদীন সুলতান আইউবীকে বন্ধুত্বের ধোকায় ফেলে প্রতারণা করবেন। সুলতান আইউবী যদি রসদ দিতে বলেন, তিনি সময়মতো রসদ সরবরাহ করবেন না। সুলতান যদি সৈন্য তলব করেন, তাহলে এই অজুহাতে ব্যর্থতা প্রকাশ করবেন যে, ইমামুদ্দীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নেই। সে যে কোন মুহূর্তে আক্রমণ চালাতে পারে। তাই আমাকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় আপনাকে আমি সৈন্য দিতে অপারগ। ইমাদুদ্দীনের দৃষ্টিভঙ্গিও একই রকম। ব্যাপারগুলো সুলতান আইউবী অবহিত হওয়া দরকার। কারণ, তিনি তো দুশাসককেই তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ মনে করছেন।
খাদেমা এদিক-ওদিক টহল দিচ্ছে। ভ্রমণস্থলের নিকট থেকে কারো গানের শব্দ তার কানে আসে। কে যেনো গাইছে- পথভোলা পথিক হে! তারকাটা দেখে নে। খামা কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে যায়। এই গান তো তাদের গোয়েন্দাদের গোপন সংকেত। তারা একজন অপরজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে এই গান গাইতে থাকে। খাদেমা ঝোঁপের আড়ালে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সে ইসহাক তুর্কিকে চিনে ফেলে। তাকে দাঁড় করায়। ইসহাক বললো- আমার সময় নেই, তুমি পায়চারি করতে থাকো। বলেই বোজি খাতুনের নিকট চলে যায়।
***
সূর্য ডুবে গেছে। ভ্রমণ স্থলের উপর আঁধার নেমে আসছে। ইসহাক তুর্কি এমন এক জায়গায় রোজি খাতুন, শামুসন্নিসা ও আমেরের সঙ্গে বসে আছে, যেখানে তাদের দেখার সাধ্য কারো নেই।
রোজি খাতুন ইসহাক তুর্কির কাছে হাব ও মসুলের যাবতীয় গোপন রহস্য ও প্রতারণার চিত্র তুলে ধরে। তিনি ইসহাককে বললেন- তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলবে, আমি নূরুদ্দীন জঙ্গীর আসনটা ইযষুদ্দীনকে দিয়েছিলাম হৃদয়ে পাথর বেঁধে আমি ইযুদ্দীনকে এজন্য গ্রহণ করেছিলাম যে, তাকে জঙ্গীর যথাযথ উত্তরাধিকার বানাবো, এবং তিনি জঙ্গীর ন্যায় তোমার ডান হাত হয়ে কাজ করবেন। কিন্তু বিয়ের পর তার আসল রূপ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। এই বিয়ে করে আমি জীবনে একটি মারাত্মক ভুল করেছি। বিয়ের বাহানায় আমাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এখন দামেশকের মর্যাদা তোমার হাতে। বৈরুতে তোমাকে কীভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলছে, তা তুমি ইসহাকের নিকট থেকে জেনে নেবে। তোমার বৈরুত অবরোধের পরিকল্পনার সংবাদ বৈরুত পৌঁছে গেছে। এমতাবস্থায় ল করতে হবে তুমিই অলো বুঝে। ভেবে দেখো, সরাসরি বৈরুতই যাবে, নাকি পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলবে। তথ্যটা বৈরুতে কে পৌঁছালো, এ প্রশ্নের উত্তর আলী বিন সুফিয়ান দিতে পারবে। আমাদের জাতির মধ্যে ঈমান বিক্রি একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরবের আমীরদের বিলাসিতার এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তারা খানায়ে কাবাকেও বিক্রির চেষ্টা করবে। বিলাসিতা আর ক্ষমতার মোহ এই দুই মিলে আমাদের রাজ্যগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে এবং জাতিগুলোর নাম-চিহ্ন মুছে ফেলছে। তুমি ইবুদীন ও ইমামুদ্দীনের উপর আস্থা রাখবে না। এরা তোমাকে সাহায্য নয় বরং ধোকা দেবো। আমার পরামর্শ হলো, বৈরুতের পরিবর্তে হালব ও মসুল অবরোধ করে আগে ঈমান নিলামকারী শাসকদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এটা ইসলামের অনেক বড় খেদমত হবে। ইতিহাসের উপর একবার চোখ বুলাও সালাহুদ্দীন। আমাদের রাজা-বাদশাগণ আজীবন দেশ-জাতি-রাষ্ট্রকে বিক্রিই কব্লেছে। দেশ-জাতির লাজ রক্ষা করেছে ইসলামের সৈনিকরা। সৈনিক ছাড়া কেউ শত্রু দেখে না। আর শক্রর হাতে জীবন দেয় শুধু সৈনিক। সে কারণে দেশ ও জাতির মূল্য-মর্যাদা শুধু সৈনিকরাই বুঝে। যে সময় এই বিলাসী শাসকরা শঙ্কর প্রেরিত মন্দ, সুন্দরী নারী আর বিত্তের নেশায় মাতাল পড়ে থাকে, তখন আল্লাহর সৈনিকগশ্ব মরু বিয়ান, পাহাড়-জঙ্গল আর নদী-সমুদ্রে জীবন অতিবাহিত করে। তাই সালাহুদ্দীন। গোমার জীবনটাও তেমনি মরু বিয়াবানে, পাহাড়-জঙ্গলে লড়াইরত অবস্থায় অতিবাহিত হচ্ছে। আমার প্রথম স্বামী নূরুদ্দীন জঙ্গীও সারা জীবন ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কাটিয়েছেন। কিন্তু তুমি যখন ঈমান বিক্রিকারী শাসকদের বিরুদ্ধে বুকটান করে দাঁড়াও, তখন তারা তোমাকে জাতির ঘাতক ও পাদ্দার আখ্যা দেয়। আমাদেরকে এসব ফতোয়ার পরোয়া করা চলবে না। এ সব ইহুদী-খৃষ্টানদের ফতোয়া, যা আমাদের ভাইয়েরা তোমার বিরুদ্ধে আরোপিত করছে। তুমি আসো- ঝড়ের ন্যায় আসো। আল্লাহ তোমার সঙ্গে আছেন। আমি তোমার জন্য ভূমি সমত করছি। এখানকার প্রতিটি শিশু, বৃদ্ধ ও নারী তোমার সঙ্গে থাকবে। বাকি সংবাদ ইসহাকের নিকট থেকে জেনে নিও।
