অজুহাত উপস্থাপন করে ইসহাক নাইটকে বলে- এক-আধ মাস পর তো আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়বোই। তারপর কে জানে কতদিন আমাদের যুদ্ধের মাঠে থাকতে হয়। পরিবারের লোকদেরকে এখনই নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে, আমি যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করলাম আর ওদিকে তাদের কোন সহায় রইলো না।
অজুহাতটা যৌক্তিক। নাইট তাকে যে ঘোড়াটি দিয়েছিলো, সেটি দেখিয়েই বললো- তুমি এখনই রওনা হয়ে যাও। যতো তাড়াতাড়ি সব ফিরে এসো।
ইসহাক তুর্কির তাড়া খৃস্টান নাইটের চেয়ে বেশি। কারণ, তাকে দ্রুত কায়রো পৌঁছুতে হবে। তবে তার আগে তাকে হালব ও মসুল যাওয়া আবশ্যক। কেননা, ওখানকার শাসকদের সম্পর্কে তার কানে কিছু কথা এসেছে। সে জানে না, সুলতান আইউবী যখন অভিযান পরিচালনা করবেন, তখন মসুলের শাসনকর্তা ও সেনা অধিনায়কদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে। হাবে তার সহকর্মী কারা আছে এবং কোথায় আছে, তার জানা আছে। কিন্তু সে নাইটের মুখ থেকে শুনেছে, ইযযুদ্দীন মসুল এবং ইমাদুদ্দীন হালবে চলে গেছেন। তার অর্থ হচ্ছে, রোজি খাতুনও এখন মসুলে অবস্থান করে থাকবেন। তা-ই যদি হয়, তাহলে তার খাদেমাও তার সঙ্গে থাকবে। মহলের ভেতরের যোগাযোগ এই খাদেমার মাধ্যমেই হতে পারে।
ইসহাক তুর্কি সে রাতেই রওনা হয়ে যায়। ঘোড়াটা উন্নত জাতের। ইসহাক দক্ষ অশ্বারোহী। মাসের দূরত্ব কয়েক দিনে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা তার আছে। ইসহাক পথ চলতে থাকে আর আল্লাহর নিকট দুআ করতে থাকে, যেনো তার কায়রো পৌঁছার আগে সুলতান আইউবী রওনা না হন। ছুটতে ছুটতে ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়লেও ইসহাক থামছে না। ধীরে ধীরে ঘোড়ার গতি কমতে শুরু করে। ইসহাক নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে সামনের দিকে কে পেটটা যিনের সঙ্গে লাগিয়ে চলন্ত ঘোড়ার পিঠে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে।
শেষ রাতে ইসহাকের চোখ খোলে। হন্তদন্ত হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তার পথ প্রদর্শনকারী তারকাটা জ্বল জ্বল করছে। ঘোড়া সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে। ভোরের আলোতে ইসহাক এক স্থানে ঘোড়াটাকে পানি পান করায় এবং ঘাস খাওয়ায়। নিজেও খানিকটা বিশ্রাম নেয়। তারপর আবার চলতে শুরু করে।
এ দিনটিও কেটে গেলো। রাতও অতিক্রান্ত হলো। খৃস্টান নাইটের প্রদত্ত ঘোড়াটা ইসহাককে খুব কাজ দিচ্ছে। সূর্য অস্ত যেতে এখনো বেশ দেরি। মসুলের মিনারের চূড়াটা দেখতে পাচ্ছে ইসহাক। ইসহাক এই নগরী সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছে। দুসঙ্গী গোয়েন্দার ঠিকানাও তার কাছে আছে। তবে তারা কোন তথ্য দিতে পারবে কিনা তার জানা নেই। এমনও হতে পারে, তারা তাকে হালবের পথ দেখিয়ে দেবে।
***
ইযযুদ্দীন নিশ্চিন্ত হয়েছেন, রোজি খাতুন তার প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি রোজি খাতুনের কোন কর্মকাণ্ডে আর হস্তক্ষেপ করেন না। রোজি খাতুন এ কথাও জিজ্ঞেস করলেন না যে, সে ইমামুদ্দীনের সঙ্গে ক্ষমতা রদবদল কেন করলেন। যে উদ্দেশ্যে তিনি ইযুদ্দীনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তা পূরণ হয়নি। তথাপি তিনি এই ভেবে সান্ত্বনা পান যে, তিনি এই রহস্যময় জগতটার অভ্যন্তরে ঢুকতে পেরেছেন এবং সুলতান আইউবী এখানে যে গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে রেখেছেন, তাকে আরো কার্যকর করতে পারছেন। তিনি শামসুন্নিসাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং মেয়েটি বিভ্রান্ত জীবনের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে মুজাহিদ নারীতে পরিণত হয়েছে। সে ইযযুদ্দীনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী আমের ইবনে ওসমানকে সংবাদদাতা ও গুপ্তচর বানায়। আর নিজের প্রেমাস্পদ হওয়া সত্ত্বেও গুপ্তচরবৃত্তির স্বার্থে তাকে এমন একটি চতুর ও রূপসী মেয়ের পেছনে নিয়োজিত করে, যে তাকে আজীবনের জন্য ছিনিয়ে নিতে সক্ষম।
আমের ইবনে ওসমান আনুশি থেকে যেসব তথ্য উদঘাটন করছে, তা সব শামসুন্নিসার মাধ্যমে রোজি খাতুনের নিকট পৌঁছিয়ে দিচ্ছে। এ এক অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা কায়রোতে পৌঁছিয়ে দেয়া একান্ত জরুরি। হাব থেকে সুলতান আইউবীর যে গোয়েন্দা এসেছিলো, তাদের কমান্ডারকে কায়রো যাওয়ার জন্য একজন লোক ঠিক করে রাখতে বলা হলো। সে বলেছিলো, ইসহাক তুর্কি বৈরুত থেকে এসে পড়বে। ওখানকার সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত রিপোর্ট অসম্পূর্ণ থাকবে। সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে বারবার বলছেন খৃষ্টানদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার তথ্য সংগ্রহ করো।
আনুশি আমের ইবনে ওসমানকে যেসব তথ্য দিয়েছে, সবই ছিলো সত্য। মেয়েটি ইমুদ্দীন ও তায় ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিলো যে, তারা তার উপস্থিতিতে যারপরনাই স্পর্শকাতর কথাবার্তা বলতে কুণ্ঠাবোধ করতো না। লোকগুলোর প্রতি আনুশির কোনো হৃদ্যতা ছিলো না। সে তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতো। শুধুমাত্র নিজের কর্তব্য পালন করে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার জানা ছিলো, যে যুবকটিকে সে মনে-প্রাণে ভালোবাসে, সেই আমের ইবনে ওসমনিও নিজ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আনুশির প্রেমের ফাঁক গলিয়ে অনেক অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয় আমের।
ইযযুদ্দীন রোজি খাতুনের ভ্রমণ বিহারের জন্য ঘোটঘন দিয়ে রেখেছেন। এক সন্ধ্যায় রোজি খাতুন শামসুন্নিসাকে সঙ্গে করে বাইরে বেড়াতে যান। নগরীর সন্নিকটে একটি সবুজ বাগিচা। ভেতরে মনোরম একটি কূপ। জায়গাটা এতো সুন্দরও মন ভোলানো যে, রাজ পরিবারের সদস্যরা ব্যতীত অন্য কেউ এখানে আসতে পারে না। রোজি খাতুনের সঙ্গে খাদেমাও আছে। রক্ষী হিসেবে সঙ্গে এসেছে আমের ইবনে ওসমান। আমের ইযুদ্দীনের বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তার প্রতি নির্দেশ রয়েছে, রোজি খাতুন যখন বাইরে বেড়াতে যাবেন, সে তার সঙ্গে থাকবে।
