হতে পারে তোমাদেরকে এক মাস পর্যন্ত এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে- নাইট তার অধীন কমান্ডারদের বললো- কিন্তু বিরক্ত হতে পারবে না। গতকাল কায়রো থেকে আসা এক গোয়েন্দা সংবাদ জানিয়েছে, সালাহুদ্দীন আইউবী বৈরুত অবরোধ করে নগরীটা দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। আমাদের আশা ছিলো, তিনি এখনো দামেশকের দিক থেকেই আসবেন এবং সর্বপ্রথম তার মুসলিম আমীরদেরকে যাদের মধ্যে হাব, মসুল এবং হাররানের আমীরগণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সঙ্গে নেবেন। তারপর আমাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন। কিন্তু এখন নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলাম, তিনি সর্বাগ্রে আমাদের হৃদপিণ্ডের উপর আঘাত হানবেন এবং তারপর তার যেসব আমীরকে আমরা আমাদের বন্ধু বানিয়ে রেখেছি, তাদের সঙ্গে বোঝাঁপড়া করবেন। আমরা যদি এ সংবাদ না পেতাম, তাহলে আমরা বৈরুতের অভ্যন্তরে তার দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়তাম। তোমরা অনেকে হয়তো জানো না, সালাহুদ্দীন আইউবী অররোধে অভিজ্ঞ। কোন ভূখণ্ড তার দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। ক্রুশের আশির্বাদে আমরা সময় থাকতে ইঙ্গিত পেয়ে যাই।
ইসহাক শুনছে। শরীরটা ঘেমে ওঠছে তার। মনে রাগ আসে, সালাহুদ্দীন আইউবীর আভ্যন্তরীণ জগতেও খৃস্টানদের চর আছে। এতো ভেতরের খবর শক্রর হাতে চলে আসলে চলবে কী করে? তার মনে পড়ে যায়, তার মুসলমান ভাইদের ঈমান বিক্রি করতে সময় লাগে না। সুলতান আইউবীর ব্যক্তিগত বলয়ে কোন খৃস্টান ঢুকতে পারে না। এটা কোন ঈমান নিলামকারী মুসলমানেরই কাজ। ইসহাক তুর্কি তীব্রভাবে অনুভব করে, তাকে এই মুহূর্তে কায়রো পৌঁছে আশী বিন সুফিয়ানকে বলতে হবে, সুলতান সত্যিই যদি বৈরুতের উপর সেনা অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে যেনো তিনি সরাসরি বৈরুত না যান।
সময় মতো সংবাদটা পাওয়ায় আমাদের লাভ হয়েছে। যেভাবে আমাদের এই বাহিনীকে ওঁৎ পেতে থাকার জন্য এখানে পাঠানো হয়েছে, তেমনি আরো কয়েকটি ইউনিটকে- যাদের মধ্যে অশ্বারোহী সৈনিকের সংখ্যাই বেশি- বৈরুতের আশপাশে এবং দূর-দূরান্তে প্রেরণ করা হয়েছে। যে বাহিনীটি বৈরুতে প্রস্তুত আছে, তারা সালাহলীল আইউবীকে স্বাগত জানাবে। আইউবী অতর্কিত আক্রমণ করে বৈরুত দখল করে নিতে চাইবেন। তিনি যখন অবরোধ সংকীর্ণ করবেন, তখন আমরা পেছন থেকে তার উপর আক্রমণ চালাবে। তারপর তিনি বৈরুতের অভ্যন্তরে আমাদের বাহিনীর এবং বাইরের বাহিনীগুলোর গ্যাড়াকলে আটকে যাবেন।
জনাবা- এক প্রবীণ কমান্ডার বললো-জানতে পেরেছেন কি তিনি কোন্ দিক থেকে আসবেন?
এখনো তা জানতে পারিনি- নাইট উত্তর দেয়- মনে হচ্ছে তিনি আমাদের অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে আসার ঝুঁকি বরণ করবেন। সম্রাট বল্ডউইন নির্দেশ জারি করেছেন, পথে যেনো তাকে না ঘটানো হয়। আমরা তাকে আমাদের ভেতরে এবং বৈরুত পর্যন্ত পৌঁছতে দেবো। এখানে আমরা তার বাহিনীকে রসদ থেকে বঞ্চিত করে মারবো।
আপনি তো জানেন, বৈরুত সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত- প্রবীণ কমান্ডার বললো- তিনি তো তার নৌশক্তিও ব্যবহার করতে পারেন।
তিনি নৌশক্তি ব্যবহার করবেন- নাইট বললো- তার বিপুলসংখ্য সৈন্য সমুদ্র জাহাজে করে আসছে। আমরা তারও ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমরা সমুদ্রে তার মোকাবেলা করবো না। তার বাহিনীকে কুলে অবতরণ করার সুযোগ দেবে। এভাবে আমরা তার জাহাজগুলোকে ধ্বংস কিংবা তাদেরকে পালানোর সুযোগ না দিয়ে জাহাজগুলোকে দখল করবো। আমার বন্ধুগণ! তোমরা তো জানো, সেনাবাহিনীর এসব গোপন তথ্য বলা যায় না। কেননা, মুসলমানদের অঞ্চলে যেমন আমাদের গুপ্তচর আছে, তেমনি আমাদের অঞ্চলেও মুসলমান চর তৎপর রয়েছে। আমাদের সৈনিকদের মুখনিঃসৃত যে কোন কথা সালাহুদ্দীন আইউবীর কানে পৌঁছে যাওয়া বিচিত্র নয়। তবে কোন কোন সময় অন্তত কমান্ডারদের জানা থাকা দরকার, অনাগত পরিস্থিতি কিরূপ হবে এবং তার পটভূমি কী হবে। সাবধান থাকবে, সৈনিকরা যেনো জানতে না পারে, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর কোন সংবাদ পেয়েছি। অন্যথায় আইউবী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলবেন।
মুসলমান আমীরদের মনোভাব কি আপনার জানা আছে- অপর এক কমান্ডার জিজ্ঞেস করে- এমনও তো হতে পারে, তারাও আমাদের উপর আক্রমণ করবে।
তাদের পক্ষ থেকে আমাদের কোন আশঙ্কা নেই- নাইট বললো হাবের গভর্নর ইয়ুদ্দীন মসুলে এসে পড়েছেন আর আমীর চলে গেছেন হালবে। ক্ষমতার এই হাতবদল আমাদের কারসাজিতে হয়েছে। ওখানকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে আমাদের নিয়ন্ত্রণে। এতোটুকু আশা করা যায় যে, তাদের কেউ না কেউ সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করবে কিংবা তাকে রসদ সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানাবে। মোটকথা, এটা নিশ্চিত, আইউবী তার মুসলমান আমীরদের থেকে কোন সাহায্য পাবেন না।
***
রাতে ইসহাক তুর্কি নাইটের সঙ্গে সুলতান আইউবীর সম্ভাব্য আক্রমণ এবং বৈরুত অবরোধ সম্পর্কে মতবিনিময় করে এবং সন্তোষ প্রকাশ করে বলে- এবার আমি আমার বাসনা পূর্ণ করার সুযোগ পাবো। সে আরো কিছু জরুরি তথ্য জেনে নেয়। তার সামনে এখন কাজ, তাকে ওখান থেকে পালিয়ে কায়রো পৌঁছতে হবে। সে ভাবে, হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে নাইট সন্দেহ করে বসবে, আমি গোয়েন্দা ছিলাম এবং তাদের সবকিছু দেখে-শুনে চলে গেছি। ফলে সে পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই ইসহাক নাইটকে বলে, ছুটি নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। অজুহাত তার আছে। ঠিক করে, বলবে, পরিবার-পরিজনকে মুসলমানদের অঞ্চলে রেখে এসেছি, আপনি তা জানেন। এখন যেহেতু আমি মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে গেছি, তাই এদেরকে উদ্ধার করে আনতে চাই। অন্যথায় মুসলমানরা তাদেরকে উত্যক্ত করতে থাকবে।
