ওর নামও উচ্চারণ করো না- আমের বিরক্তির সুরে বললো- ও রাজকন্যা। তাকে আমি তোমার চেয়েও বেশী ভয় করতাম। তোমাকেও আমি রাজকন্যা মনে করতাম। কিন্তু তুমি আমার ভয় দূর করে দিয়েছে। তারপরও মাঝে-মধ্যে ভয় এসে যায় তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করে কিনা। তাছাড়া তোমার-আমার সম্পর্কটা জানাজানি হলে কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে, সে জন্যও ভয় হচ্ছে।
কেউ যদি তোমার এক বিন্দু ক্ষতি করে, তাহলে আমার ইঙ্গিতে প্রাসাদের প্রতিটি ইট খসে পড়বে বলেই আনুশি আমেরকে কাছে টেনে নিয়ে বললো- কেউ তোমাকে ধোকা দিচ্ছে এ আশঙ্কা যথার্থ। আমার অস্তিত্ব একটা চিত্তাকর্ষক প্রতারণা। কিন্তু তুমি আমাকে মানুষরূপে দেখো। আমাকে আমার ইবাদত করতে দাও।
আবেগ চেপে বসে আনুশির উপর। তার মাথার চুলে বিলি কাটছে আমের ইবনে ওসমানের আঙ্গুলগুলো। রাত কেটে যাচ্ছে। আনুশির কণ্ঠ ও বাচনভঙ্গিতে মাদকতা। আমেরের জন্য এটা একটা কঠিন পরীক্ষা। সে একজন অবিবাহিত যুবক। একাধিকবার আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। প্রতিবারই আল্লাহকে স্মরণ রেখে প্রার্থনা করেছে- হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ধৈর্যধারণের শক্তি দাও, আমার চরিত্রকে পবিত্র রাখো।
রাত আর বেশি বাকি নেই। আনুশি আমেরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। এভাবে আরো তিন-চার রাতে দুজনের গোপনে কথাবার্তা চলে। আনুশি আমেরের অস্তিত্বে একাকার হয়ে যায়। সে দেখেছে, আমেরের মধ্যে একটা ভালো মানুষী আছে। কিন্তু তার সত্ত্বায় স্পেন সৃষ্টি হতে চলেছে, আনুশি তা টের পায়নি।
মুসলিম শাসকদের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে গেছে- এক রাতে আমের আনুশিকে বললো- আমি খৃষ্টান সম্রাটদের দেখিনি। আমাদের রাজাদের চেয়ে ভালো তো হবে নিশ্চয়ই। আমের গোপন কথা বের করতে বললো- আচ্ছা, এটা কি সম্ভব যে, খৃস্টানরা এসে এই অঞ্চলটা দখল করে ফেলবে?
আনুশি অত্যন্ত চালাক মেয়ে। শৈশব থেকেই ওস্তাদি শিখে আসছে। তার রূপ-যৌবন দুর্ভেদ্য দুর্গের শক্ত প্রাচীর ভাঙ্গার ক্ষমতা রাখে। প্রতাপান্বিত রাজা-বাদশাহদের গোলাম বানিয়ে রাখার মতো যোগ্যতা তার আছে। কিন্তু সে মানবিক দুর্বলতা এবং স্বভাবজাত চাহিদা ও দারি থেকে মুক্ত নয়। একজন মানুষ স্বভাব-চরিত্রে হিংস্র পশুতে পরিণত হোক না কেন, সৃষ্টিগত স্বভাবের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারে না। আনুশি আমের ইবনে ওসমানকে তার পিপাসার কথা ব্যক্ত করেছিলো। সত্য প্রেমের পিপাসা আর আমেরের অস্তিত্ব তাকে অক্টোপাসের ন্যায় জড়িয়ে রেখেছে। মদের নেশা তার জানা ছিলো। কিন্তু প্রেমের নেশা সম্পর্কে ছিলো অনবহিত। এই নেশা যখন তাকে পেয়ে বসলো এবং দুর্বল মুহূর্তটায় আমের খৃষ্টান শাসকদের পক্ষে কথা বললো, তখন মেয়েটির প্রশিক্ষণ দীক্ষা বেকার হয়ে পড়লো। সে আমেরের সঙ্গে এমন সব কথাবার্তা বলতে শুরু করে, যা কোন গুপ্তচর সাধারণত প্রকাশ করে না।
আমেরের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে। গা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে প্রশ্ন করতে রু করেছে সে। এ মুহূর্তে যদি আনুশির খৃস্টান গুরু, ইযযুদ্দীন কিংবা অন্য কোন কর্মকর্তা তাকে এই অবস্থায় দেখতে পায়, তাহলে তারা বিশ্বাসই করবে না, এই সেই মেয়ে, যাকে তারা সুদানী পরী বলে ডাকেন। নিষ্পাপ মেয়ের মতো লাজুক হয়ে বসে আছে আনুশি। তার একবিন্দু অনুভূতি ইে নেয, এই মুহূর্তে এখানে বসে সে সালতানাতে ইসলামিয়ার মূলোৎপাটনের পরিবর্তে ক্রুশকেই বরং ফোকলা করে ফেলছে। আমের আনুশিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করছে।
আজ যখন আনুশি আমেরের কক্ষ থেকে বের হয়, তখন রাতের শেষ প্রহর। আমেরকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে গেছে আনুশি।
***
অনেক দিন কেটে গেছে। ইসহাক তুর্কি এখন বৈরুতে খৃষ্টান নাইটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীই নয়- অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। খৃস্টান নাইটের এমন কোন গোপন তথ্য নেই, যা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা ইসহাক তুর্কি জানে না। ইসহাক একটা বিষয় অনুভব করে, তার এই কমান্ডার ক্রুশের জন্য এতোটা আন্তরিক নয় যতোটা আন্তরিক পরবর্তী যুদ্ধে জয়লাভ করে সম্রাট বল্ডউইন থেকে আরবের কোন একটা ভূখণ্ড পুরস্কার হিসেবে অর্জন করার। একটি ভূখণ্ডের স্বাধীন শাসক হওয়ার স্বপ্ন চেপে বসেছে তার মাথায়। ওস্তাদ আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষণ মোতাবেক ইসহাক তুর্কি তার মনস্তত্ব নিয়ে খেলতে শুরু করে। যেভাবে আনুশির ন্যায় একটি ভয়ঙ্কর মেয়ে মানবীয় দুর্বলতা ও চাহিদার সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলো, তেমনি খৃস্টানদের এই নাইটও আপন দৃঙ্গিভঙ্গী থেকে সরে গিয়ে এবং কামনা বাসনার কাছে পরাজিত হয়ে ভাবনার প্রযোজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছে যে, অচেনা লোকটিকে সে নিজের অন্তরঙ্গ বানিয়ে নিলো। সে শুধু তারই নয়- তার সম্রাট ও তার ক্রুশের পরাজয়ের বার্তাবাহক।
একদিন নাইট ইসহাক তুর্কিকে বৈরুত থেকে দূরে একস্থানে নিয়ে যায়। ইসহাক জানে, নাইটের সেনা ইউনিট রাতে বেশ তড়িঘড়ি রওনা হয়ে গেছে। সে তার বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানের জন্য বন্টন করার লক্ষ্যে নিয়ে যাচ্ছে। দেহরক্ষী হিসেবে ইসহাক তার সঙ্গে আছে। বাহিনীর অবস্থান স্থলে পৌঁছে ইসহাক দেখতে পেলো, তাঁৰু স্থাপন করা হয়নি। বাহিনীতে অশ্বারোহীও আছে, পদাতিকও আছে। নাইট তার অধীন কমান্ডারদের ডেকে কয়েকটি জায়গার নাম উল্লেখ করে উক্ত স্থানগুলোতে তাঁবু স্থাপন করতে এবং প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেয়। ইসহাক পাশে দাঁড়িয়ে সব পর্যবেক্ষণ করে।
