কমান্ডার ইসহাককে সঙ্গে নিয়ে যায়। কমান্ডার বল্ডউইন বাহিনীর একজন নাইট। নাইট হওয়ার কারণেই তার আপাদমস্তক বর্ম দ্বারা আবৃত। সামরিক যোগ্যতা ও দুঃসাহিসকতার কারণে খৃস্টানদের নাইটরা আজো বিখ্যাত। তাদেরকে এতো মর্যাদা দেয়া হতো যে, সম্রাটগণ তাদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলতেন।
ইসহাক তুর্কি বর্ম ছাড়াই খালি গায়ে এই বর্ম পরিহিত নাইটকে ধরাশায়ী করে এবং তাকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। রতনে রতন চেনে। বল্ডউইনের এই নাইট ইসহাককে চিনে ফেলে। বুঝে ফেলে লোকটার দাম কতত। সঙ্গে করে নিজ গৃহে নিয়ে ইসহাককে মদ খেতে দেয়।
ইসলামে মদ হারাম। মুসলমান মদপান করে না। ইসহাক তুর্কি মুসলিম গোয়েন্দা। ছদ্মবেশে ভিন্ন পরিচয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে এরকম সমস্যায় পড়তে হয় আইউবীর গোয়েন্দাদের। খৃস্টান পরিচয়ে খৃস্টানদের মাঝে ঢুকে পড়ার পর তাদের সামনে মদ আসে। তাদের বিব্রত হতে হয়। বাধ্য হয়ে হারাম খেতে হয়। মদ না খেলে তাদেরকে সন্দেহে পড়তে হয়, খৃস্টান হলে মদ খাবে না কেন?
এই মুহূর্তে ইসহাক তুর্কি তেমনি এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন। সামনে মদের পেয়ালা। ইসহাক পরিপক্ব ঈমানদার মুসলমান। সে মদপান করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো- আপনি আমার শক্তি দেখেছেন। এই শক্তি অর্জন করতে গেলে মদপান থেকে বিরত থাকতে হয়। এটা মদপান না করার সুফল। আমার ওস্তাদ বলেছেন, তোমার পেটে যদি মদ ঢুকে, তাহলে তোমার ঘোড়াটা অনুভব করবে তার পিঠে একজন দুর্বল লোক সওয়ার হয়েছে। ফলে ঘোড়া তোমার নির্দেশ মান্য করবে না।
ইসহাক গলায় ঝুলানো তাগাটা টেনে বের করে। শার্টের ভেতর থেকে ছোট একটা ক্রুশ বেরিয়ে আসে। বললো- আমি নিজের শক্তিটা ক্রুশের সুরক্ষার জন্য ব্যয় করার লক্ষ্যে কুশ হাতে শপথ করেছিলাম, মদপান আর চরিত্রহীন কাজ থেকে বিরত থাকবো। আমি শপথটা ভঙ্গ করতে পারি না।
তুমি কোথায় থাকো- নাইট জিজ্ঞেস করে- পরিজন সঙ্গে আছে কি?
না- ইসহাক উত্তর দেয়- আমি আমার পরিবার-পরিজনকে বলে এসেছি, নিরাপদ কোন ঠিকানা পেলে তাদেরকে নিয়ে আসবো।
ঠিকানা পেয়ে গেছো- নাইট বললো- আমি তোমার মূল্য বুঝি। আজ থেকে তুমি আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষীর দায়িত্ব পালন করবে। আমার মতো প্রত্যেক কমান্ডারের সঙ্গে দুচারজন করে রক্ষী থাকে। তুমি হলে আমার একজনই যথেষ্ট। আমি তোমার থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
সময়টা যুদ্ধের। ইসহাকের ন্যায় শক্তিশালী সাহসী লোকদের খুব দাম। বল্ডউইনের নাইট সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ইসহাকের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। তার জন্য আরবীয় ঘোড়া ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা হয়। মাসিক ভাতাও নির্ধারিত হয়।
আল্লাহ ইসহাককে প্রখর মেধা দান করেছেন। সেই মেধাকে কাজে লাগাতে শুরু করে সে। দুদিনেই ইসহাক খৃস্টান নাইটের বিস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
আমার একটি মাত্র আকাঙ্খা- ইসহাক নাইটকে বললো মুসলমানদের প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসের ন্যায় খানায়ে কাবাও আমাদের দখল করে নেয়া দরকার। তাহলে ইসলাম অল্প দিনেই মৃত্যুবরণ করবে। সারা পৃথিবীতে না হলেও কমপক্ষে আরব বিশ্বের উপর ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার।
তুমি স্বপ্ন দেখছো বন্ধু–নাইট বললো- মুসলমানদের এতো তাড়াতাড়ি পরাস্ত করা সহজ নয়। আমরা যদি মুসলমানদের কাবা গৃহ অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করি, তাহলে সমগ্র পৃথিবীর মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। সকল মুসলমানের মোকাবেলা করে জয়লাভ করা তো দূরের কথা, এক সালাহুদ্দীন আইউবীকেও তো এখন পর্যন্ত পরাজিত করতে পারলাম না।
আপনি তাহলে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন- ইসহাক বললো মুসলমানদের ঐক্য ভেঙ্গে গেছে। সালাহুদ্দীন আইউবী সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছেন। মুসলমানরাই এখন তার শত্রু। হাব ও মসুলের নতুন শাসনকর্তা ইযযুদ্দীন-ইমামুদ্দীন কি আপনার সমর্থক সহযোগি নন? তারা কি আপনার সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। আপনাদের গোয়েন্দারা। মুসলমানদের ফোকলা করে দিয়েছে। আমি আপনাকে সেখানকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরছি।
ইসহাকের বক্তব্যে নাইটের চোখ ছানাবড়া। ইসহাক নাইটকে এমন সব পরার্শ দেয় যে, একজন সেনাপতির পক্ষেই এ ধরনের পরামর্শ দেয়া সম্ভব। নাইটের চোখ খুলে যায়। তুমি তো আমাকে অবাক করে দেয়ার মতো কথা বলছো- নাইট বললো- আমরা তো এমন পরিকল্পনাই প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কিনা তোমার আকাঙ্খা ও প্রত্যয়ের অনুকূল।
আপনাকে আমি আরেকটি পরামর্শ দিতে চাই- ইসহাক বললো আপনারা সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় কমান্ডো বাহিনী গঠন করুন। একটা বাহিনী আমার হাতে তুলে দিন। আমি মুসলিম ভূখণ্ড এবং তাদের স্পর্শকাতর শিরাগুলো সম্পর্কে অবগত আছি। আমি তাদের হাড়ির খবর পর্যন্ত জানি। রসদ প্রভৃতির ডিপো কোথায় থাকে, সব খবর আমার কাছে আছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তাদের কোন ভাণ্ডার থাকতে দেবো না।
তা-ই হবে- নাইট বললো- আমি তোমাকে সুযোগ করে দেবে।
***
আমি তোমাকে শামসুন্নিসার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। আনুশি আমের ইবনে ওসমানকে বললো।
তারা এখন মসুলে। ভালোবাসার ডালি নিয়ে এগিয়ে এসেছে আমের। আনুশি মধ্য রাতের পর তার কক্ষে চলে আসে। বললো শামসুন্নিসা কি আমার চেয়ে বেশি রূপসী?
