বৈরুতে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। দেশের নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সমর মেলা বসানো হয়েছে। মেলায় সৈন্যদের কৃতিত্ব প্রদর্শন, তরবারী ইত্যাদি অস্ত্র চালনার প্রতিযোগিতা চলছে।
ইসহাক তুর্কি এরকম এক মেলায় হাজির হন। খৃস্টানদের একটি প্রাচীন খেলা চলছে। দুজন অশ্বারোহী লম্বা বর্শা হাতে বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা বর্শার সাহায্যে একে অপরকে ঘোড়া থেকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রথমবার কেউ কাউকে ফেলতে না পারলে পুনরায় সুযোগ দেয়া হচ্ছে। আরোহীরা বর্ম পরিহিত।
প্রতিযোগিতা চলছে। একের পর এক গ্রুপ আসছে। পরাজিত আরোহী ঘোড়া থেকে পড়ে যাচ্ছে। বিজয়ী হুংকার দিয়ে বলছে- আর কি কেউ আছে লড়াই করার কেউ আসলো না। ইসহাকের গায়ে মরু পোশাক। সে মাঠে নেমে যায়। মোকাবেলাকারী অশ্বারোহী সৈনিক ধর্ম পরিহিত। ইসহাককে সাধারণ পোশাকে ময়দানে নামতে দেখে দর্শকরা টিটকারি মারতে থাকে। মেলায় খৃস্টার্ন সেনাপতি ও অন্যান্য কমান্ডাররা উপস্থিত। তারাও ইসহাককে দেখে অবজ্ঞার হাসি হাসে। একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিতকারী অশ্বারোহী শেষবারের মতো হুংকার ছেড়ে মোড়াকে এদিক ওদিক হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে, যেনো শিকার খুঁজছে। ঘোড়সওয়ার খৃষ্টান বাহিনীর ইউনিট কমান্ডার। ঠাট্টার ছলে সে ঘোড়াটা ইসহাক তুর্কির দিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং নিকটে এসে বর্শাটা তার গায়ে নিক্ষেপ করে। ইসহাক বর্শার আঘাত প্রতিহত করে। দর্শনার্থীরা আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। রব উঠে- পাগল, পাগল। ওকে মেরে ফেলল।
অশ্বারোহী কমান্ডার ঘোড়াটা পেছন দিকে মোড় ঘুরায়।.তার সঙ্গী কমান্ডারদের একজন বললো- বর্শায় গেঁথে পাগলটাকে এদিকে নিয়ে এসো। অন্য একজন বললো- লোকটা বর্শা প্রতিরোধ করে তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছে।, অশ্বারোহী ঘোড়া হাঁকায়। ইসহাক নিরস্ত্র। ঘোড়াটা নিজের দিকে আসতে দেখে গায়ের চোগাটা খুলে বর্শার আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। অশ্বারোহী সামান্য নত হয়। বর্শাটা হাতে তুলে নেয়। নিকটে এসে ইসহাকের উপর আঘাত হানে। ইসহাক কিহুদূর পর্যন্ত ঘোড়ার সঙ্গে এমনভাবে দৌড়াতে থাকে, যেনো বর্শা তার দেহে গেঁথে গেছে। দর্শকরা উল্লাস করতে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই নীরবতা থেমে যায়। সকলে অবাক বিস্ময়ে দেখতে পায়, ইসহাক দৌড়ের মধ্যে অশ্বারোহী কমান্ডারের ঘোড়র পেছনে বসে পড়েছে। বর্শা তার গায়ে বিদ্ধ হয়নি। সে বরং বর্শাটা ধরে রেখেছে। আরোহীও ধরে রেখেছে বর্শার এক মাথা। সে ঘোড়ার মোড় ঘুরায়। ঘোড়া এক চক্কর ছুটতে শুরু করে। ইসহাক তার থেকে বর্শাটা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।
ইসহাক বর্শাটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে যায়। বর্শাটা চারদিক ঘুরিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে- আমাকে একটা ঘোড় দাও। সাহস থাকে তো আমার মোক্ষাবেলা করো।
অশ্বারোহী কমান্ডার ঘোড়া থেকে নেমে ইহাকের কাছে চুলে আসে। এখন তার হাতে কোন অস্ত্র নেই। উভয় বাহু সম্প্রসারিত করে রেখেছে। ইসহাক বর্শাটা মাটিতে গেড়ে দেয়। খৃস্টান অশ্বারোহী তাকে গলায় জড়িয়ে ধরে। ইসহাক বললো- আমি মোকাবেলা করবো, আমাকে ঘোড় দাও।
ইসহাককে একটি ঘোড়া আর একটি বর্শা দেয়া হলো। সে কমান্ডারের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়। দর্শনার্থীরা অপলক চোখে, অনিঃশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে। তারা নিশ্চিত ছিলো, হতভাগ্য লোকটি বর্শার আঘাতে শোচনীয়ভাবে মারা পড়বে।
উভয় ঘোড়া খানিক দূরত্বে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। ইঙ্গিত পেয়ে ঘোড় ছুটতে শুরু করে। কমান্ডার তার বর্শাটা ইসহাকের পেট বরাবর। তাক করে রেখেছিলো। চলন্ত ঘোড়া থেকে আঘাত হানে সে। ইসহাক সামান্য মোড় ঘুরিয়ে কমান্ডারের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়। সেই সঙ্গে তার বর্শাটা গিয়ে কমান্ডারের পেটে গেঁথে যায়। কমান্ডার ঘোড়ার অপরদিকে পড়ে যায়। কমান্ডার ওদিককার পা রেকাব থেকে সরাতে ভুলে গিয়েছিলো। তাই পড়তে গিয়ে পা রেকাবে আটকে যায়। ঘোড়া কমান্ডারকে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে শুরু করে।
প্রতিযোগিতায় কোন প্রতিযোগিকে দর্শনার্থীদের সাহায্য করার অনুমতি নেই। কোন প্রতিযোগিকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দিলেও নয়।
ঘোড়া কমান্ডারকে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইসহাক পেছন ফিরে দেখতে পেয়ে ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ঘোড়া হাঁকায়। কমান্ডারের ঘোড়ার পার্শ্বে গিয়ে এক লাফে তাতে চড়ে বসে। লাগাম টেনে ধরে ঘোড়ার গতি থামিয়ে দেয়। কমান্ডার বর্ম পরিহিত। দেহটা অক্ষত আছে। অন্যথায় এতোক্ষণ চামড়া ছিলে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যেতো।
কমান্ডার ইসহাককে বাহুতে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে- তুমি কে? তোমার পরিচয় কী?
ইসহাক উত্তর দেয়- আমি মুসলমানদের অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা খৃস্টান। এখন তো আর নিজেকে সাধারণ খৃস্টান দাবি করতে পারছি না।
ইসহাক কৃতিত্বটা দেখিয়েছে অসাধারণ। এমন অশ্বচালক, বর্শাবাজ হয়তো কোন সুদক্ষ সৈনিক কিংবা কোন উচ্চ বংশের যোগ্য সন্তান। ইসহাক কমান্ডারকে জানায়, মুসলমানরা তাকে জোরপূর্বক ফৌজে ভর্তি করাতে চেয়েছিলো। তাই সে পালিয়ে এসেছে।
