মনে হচ্ছে, মেয়েটা আজ তোমাকে বেশি পেরেশান করেছে। শামসুন্নিসা বললো।
খুব বেশী- আমের জবাব দেয় মেয়েটা আজ নিজে থেকে বলেছে, সে পাপিষ্ঠা এবং চরিত্রহীনা। বেহায়াপনা ছড়ানো এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাধানোর জন্যই সে এসেছে। আমার থেকে সে পবিত্র ভালোবাসার বিনীত আবেদন জানিয়ে বলেছে, তার বিনিময়ে আমি যা চাই তাই সে দেবে। আমি বড় কষ্টে তার বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে এসেছি। শামসী। মেয়েটা যদি তার সমুদয় সম্পদও আমার সামনে হাজির করে, তবুও আমি তোমাকে ধোকা দিতে পারবো না।
তারপরও তাকে ধোকা দাও- শামসুন্নিসা বললো- তাকে সেই ভালোবাসা দাও, যা সে কামনা করছে। বিনিময়ে সেই তথ্য নাও, যা আমাদের প্রয়োজন। এখানে তাকে কী উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে, তা তোমাকে বলে দিয়েছে। তুমি অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তোমার মহলের গোপন তথ্য প্রয়োজন একথা বলে কাজ আদায় করবে, নাকি কিছু না জানিয়ে কৌশলে তথ্য বের করবে, তা তুমিই ভালো বুঝে।
আমি বিষয়টা ভেবেছি- আমের বললো- কিন্তু ভয় পাচ্ছি এ জন্য যে, একদিন হয়তো তুমি আমাকে ভুল বুঝবে।
তোমার-আমার ভালোবাসা আমি আল্লাহর উপর সোপর্দ করেছি শামসুন্নিসা বললো- আম্মার নির্দেশমূলক কথাগুলো আমার আত্মায় গেঁথে আছে। আমার ভালোবাসার মৃত্যু হতে পারে না। হৃদয়ের ভালোবাসাকে আমি সেই মহান লক্ষ্য অর্জনে কুরবান করতে চাই, যে দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করা হয়েছে। আল্লাহর নামে শপথ নেয়ার যদি আমি স্মরণ রাখি, তাহলে কোন ভুল বুঝাবুঝির জন্ম নিতে পারবে না। শামসুন্নিসা প্রশ্ন করে মেয়েটি কি জানতে পেরেছে তোমার আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়?
তাতো সে বলেনি- আমের উত্তর দেয়- বোধ হয় নিশ্চিত জানে না।
একটা কাজের কথা বলি- শামসুন্নিসা বললো- আমরা হাব থেকে রওনা হওয়ার কিছু আগে কায়রো থেকে একজন লোক এসেছিলো। সে জানতে চাচ্ছিলো, ইযযুদ্দীনের উদ্দেশ্য এবং খৃষ্টানদের পরিকল্পনা কী। আমরা তাকে সঠিক কোন উত্তর দিতে পারিনি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাড়াতাড়ি কায়রো থেকে ফৌজ নিয়ে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। লোকটি বলেছে, আইউবীর এই তাড়াহুড়ার কারণ হলো, খৃষ্টান বাহিনী মসুল, হালক্ ও দামেশকের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর কায়রো থেকে ফৌজ নিয়ে এখানে সময় মতো পৌঁছানো সম্ভব হবে না। সমস্যা হলো, সুলতান যদি বাহিনী নিয়ে এসে পড়েন আর খৃস্টানদের কৌশল অন্যকিছু হয়, তাহলে সুলতানকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের অতি দ্রুত মুসলমান আমীর ও খৃস্টানদের সম্বন্ধে জানতে হবে।
আমি শুনেছি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দারা কিনা আকাশ থেকে তারকাও ছিঁড়ে আনতে পারে- আমের ইবনে ওসমান বললো- খৃস্টান অঞ্চলগুলোতে কি তার কোন লোক নেই?
আম্মা আমাকে বলেছেন, ইসহাক তুর্কি নামে অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন গোয়েন্দা আছে- শামসুন্নিসা উত্তর দেয়- তিনি বৈরুত গেছেন। সঠিক সংবাদ তো তিনি নিয়েই আসবেন। কিন্তু কায়রো থেকে তার কোন সংবাদ আসেনি। দেখো আমের! সোনাবাহিনী তৎপরতা চালালে কিছু একটা আন্দাজ করা যায়। এখানে তো তেমন কোন তৎপরতা দেখছি না। যা কিছু গোপন তথ্য আছে, সব ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীনের পেটে। আর এসব তথ্য মহলের ভেতর থেকে উদ্ধার করা যেতে পারে। আর সেই সংবাদ তুমি একমাত্র আনুশির কাছ থেকেই সংগ্রহ করতে পারো।
কিন্তু সে যে বিনিময় দাবি করছে, তা তো আমি দিতে পারবো না। আমের বললো।
এই মূল্য তোমাকে দিতেই হবে- শামসুন্নিসা বললো- আমি আমার ভাইয়ের পাপের কাফফারা আদায় করতে চাই। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের কাছে ভালোবাসা ও কামনা-বাসনার কোন মূল্য নেই। আমাদেরকে সেই শহীদদের ঋণ শোধ করতে হবে, যারা ইসলামের জন্য স্ত্রীদের বিধবা করে গেছেন।
***
ইসহাক তুর্কি এখন বৈরুতে। এখানে খৃষ্টান ম্রাট বল্ডউইনের ফিরিঙ্গি বাহিনীর বিশাল সেনাক্যাম্প। বল্ডউইন এক পরাজয়বরণ করেছিলেন সুলতান আইউবীর ভাই আল-আদিলের হাতে। তার পরপরই সুলতান আইউবীর বাহিনীকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে নিজেই সুলতান আইউবীর ফাঁদে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন এবং বন্দি হতে হতে অল্পের জন্য রক্ষা পান। উভয় বারই তার বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পেছনে সরে যায়।
এখন দিন-রাত সমানে কাজ করছেন বল্ডউইন। রাতে ঘুমান না। পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনায় মহাব্যস্ত। তিনি আল-মালিকুস সালিহকে অনুগত বানিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তার কোন উপকার না করেই আস-সালিহ মৃত্যুবরণ করেছেন। এখন ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীনকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের ফন্দি আঁটছেন বল্ডউইন। কায়রোতে তার গোয়েন্দারা সুলতান আইউবীর পরিকল্পনার তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত।
বৈরুতে গিয়ে ইসহাক তুর্কি প্রথমে বল্ডউইনের হাইকমান্ড পর্যন্ত পৌঁছোনোর বুদ্ধি ঠিক করে নেয়। নিজেকে মুসলিম অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা খৃস্টান বলে পরিচয় দেয়। এভাবে সে তাদের সহানুভূতি অর্জনে সক্ষম হয়। ইসহাক তুরস্কের নাগরিক। গায়ের রং ফর্সা। সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান যুবক। অশ্বচালনা, বর্শা নিক্ষেপ, তীরন্দাজি ও তরবারী চালনায় বিশেষ পারদর্শী। দীর্ঘ বাহুতে রেজায় শক্তি। মস্তিষ্কটা প্রখর ও সূক্ষ্মদর্শী। অপরের মন জয় করে প্রভাব বিস্তার ও অনুরক্ত বানানোর কলাকৌশল তার জানা। প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ রূপ ধারণ করায় ওস্তাদ। সঙ্গীদের বলতো, তার আসল শক্তি হলো তার ঈমান ও চরিত্র।
