তুমি কি ভয় পাচ্ছো: আমের! নাকি তোমর অন্তরটা মরে গেছে আনুশি আমেরের গালে হাতের পরশ বুলিয়ে বললো- আমার হৃদয়টা যদি মরে গিয়ে না থাকে, তাহলে আমি মানতেই পারছি না তোমার অন্তর মরে গেছে।
আনুশি তার মাথাটা আমেরের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে ধরে। তার রেশম কোমল বিক্ষিপ্ত চুলগুলো আমেরের অরুণ গণ্ডদেশ ছুঁয়ে যেতে শুরু করে। চরিত্র যেমনই হোক, যুবক তো! আমেরের দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে কেমন যেনো একটা তোলপাড়া শুরু হয়ে গেছে তার হৃদয় জগতে। আমের আনুশি, চাপা হাসির শব্দ শুনতে পায়। মেয়েটি হাসতে হাসতে বললো- হৃদয়টা জীবিত আছে। ধুক ধুক করছে। আমি তোমার থেকে কিছুই চাই না। তুমি আমার কাছে চাও। হীরা, জহরত, মণিমুক্তা, স্বর্ণমুদ্রা- যা খুশি চাও দেবো।
আমার কিছুই প্রয়োজন নেই সুদানী পরী। আমের বললো।
আমাকে আনুশি বলো- মেয়েটি বললো- আমাকে যারা সুদানী পরী ডাকে, তাদের অন্তরে ভালোবাসা নেই, তারা পাপিষ্ঠ। তুমি তাদের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে, পবিত্র। আমার থেকে ধন-ভাণ্ডার নিয়ে নাও। বিনিময়ে তুমি আমাকে ভালোবাসা দাও।
আনুশি নিজের চিবুকটা আমেরের চিবুকের সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। আমের চমকে ওঠে পেছনে সরে যায়। এখন তার অবস্থাটা পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখিটির মতো। ছটফট করতে শুরু করে দেয় আমের।
আমার মনে হয়, তোমার অন্তরে অন্য কারো ভালোবাসা আছে- আনুশি বললো- আমার যাদুতে কখনো কেউ এভাবে ছটফট করে না। তুমি বলে, কোন শক্তি তোমাকে আমার প্রতি ভালোবাসার বাধার সৃষ্টি করছে।
আনুশি দাঁত কড়মড় করে বললো- তুমি এটুকুও বুঝছে না যে, একটা গুনাহগার মেয়ে তোমার থেকে পবিত্র ভালোবাসা প্রার্থনা করছে। হতে পারে সে পাপ থেকে তাওবা করে তোমার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। আশ্চর্য পুরুষ বটে তুমি। শুনে রাখো হতভাগা, তুমি এমন একটি মেয়েকে তাড়িয়ে দিচ্ছে, দুচারটি দেশের সিংহাসন উল্টে দেয়ার ক্ষমতা যার আছে। তুমি এমন একটি মেয়েকে রুষ্ট করছো, যে ইচ্ছা করলে ভাইকে ভাইয়ের হাতে খুন করাতে পারে। আমার সম্মুখে তোমার একটা পোকার চেয়ে বেশী মর্যাদা নেই।
তাহলে আমাকে পিষে ফেলো- বললো আমের আমি তোমার যোগ্য নই।
আমের উঠে দাঁড়ায়।
আমি তোমার কাছে কিছুই চাই না আমের- আনুশি আমেরের উভয় হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো- তুমি শুধু আমার পাশে বসে থাকে।
আমের কথা না বাড়িয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে।
***
আমের ইবনে ওসমানের ঘোড়া ধীরে ধীরে হাঁটছে। আমেরের মাথাটা অবনত। নাকে আনুশির চুলের ঘ্রাণ আর গালে মেয়েটির হাতের কোমল ছোঁয়া এখনো অনুভব করছে। ভাবে, মেয়েটি যদি অন্ধকারে নির্জনে তাকে ধরে বসে, তাহলে শামসুন্নিসার সাথে কৃত শপথ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। তার কাছে আর ঠাই মিলবে না। আমের ভাবনার মোড় শামসুন্নিসার দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তার মনে পড়ে যায়, সন্ধ্যায় ভাবু স্থাপনের সময় স্বল্প সময়ের জন্য সে শামসুন্নিসার কাছে পঁড়িয়েছিলো। দুজনে সাক্ষাতের সময় ও স্থান ঠিক করে এসেছিলো। সে ওদিকেই যাচ্ছিলো; কিন্তু পথে আনুশি পথরোধ করে দাঁড়ায়।
ঘোড়ার পিঠ বসে পেছনের দিকে তাকায় আমের। অন্ধকারে আনুশিকে আর দেখা যাচ্ছে না। পথের মোড় ঘুরে আমের সেই জায়গায় এসে পৌঁছে, যেখানে শামসুন্নিসার আসার কথা ছিলো। আমের যেভাবে আনুশির ছায়া দেখেছিলো, তেমনি শামসুন্নিসার ছায়াও দেখতে পায়। ছায়াটা ঘোড়ার দিকে এগিয়ে আসে। আমের ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে।
এতক্ষণ কোথায় ছিলে?- শামসুন্নিসা প্রশ্ন করে অনেকক্ষণ যাবত অপেক্ষা করছি।
কী করেছি, কোথায় থাকতে পারি, তুমি তো সব জানো- আমের মিথ্যা বলে- এদিকেই তো আসছিলাম। পথে এক স্থানে থামতে হলো। তাতেই দেরি হয়ে গেলো।
নিজেদের লোকদের প্রতিও লক্ষ্য রাখবে- শামসুন্নিসা বললো তারা প্রত্যেকে সতর্ক। তাদের প্রতি কারো সন্দেহ জাগবে না।
শামসুন্নিসা সেই লোকদের কথা বলছে, যারা হাবে সুলতান আইউবী ও রোজি খাতুনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছে। যারা মহলে কর্মচারি ছিলো, এই বহরে তারা একই পদে দায়িত্ব পালন করছে। রোজি খাতুনের খাদেমা শামসুন্নিসা ও আমের ইবনে ওসমানকে তাদের চিনিয়ে দিয়েছে।
এসো, এখানে কিছুক্ষণ বসি। শামসুন্নিসা আমেরের কোমর জড়িয়ে ধরে বললো।
দুজনে দুজনার হয়ে একান্ত ঘনিষ্ঠে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে আমের ইবনে ওসমান ও শামসুন্নিসা। শামসুন্নিসা এক পা অগ্রসর হয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। নিজের নাকটা আমেরের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে শুঁকতে শুঁকতে তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে বলে ওঠে- তুমি কোথায় ছিলে? কার কাছে ছিলে?
আমি পশগুলো দেখাশোনা করে আসছিলাম। আমের উত্তর দেয়।
পশুরা সুগন্ধি ব্যবহার করছে কবে থেকে- শামসুন্নিসা চাপা অথচ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- তোমাকে তো কোনদিন সুগন্ধি ব্যবহার করতে দেখিনি।
আমের চুপসে যায়। তার মুখে কোন উত্তর নেই। শামসুন্নিসা কেইসটা ঠিকই ধরেছে। বলতে থাকে- রূপসী ডাইনীটা তোমাকে পেয়ে বসেছে। তুমি ফঁদে আটকে গেছে।
এখনো আটকাতে পারেনি- আমের বললো- পথে হঠাৎ দেখা হয় আনুশির সাথে। বিষয়টা তোমাকে জানাতে চাচ্ছিলাম না। সন্দেহের কোন কারণ নেই। আমি এতোটা আনাড়ি নই। আমার বক্ষে যে ঘ্রাণ পেয়েছে, সে অনুশির তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বুকের ভেতরটা শুঁকে দেখার চেষ্টা করো। আমেরের কঠে ভীতির হাল্কা একটা কম্পন অনুভব করে শামসুন্নিসা। আমের বলতে থাকে। আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন শামসী। আমি কোন আমীর-শাসক কিংবা সালার নই। আমি একজন সাধারণ কর্মচারি মাত্র। আনুশি আমাকে অতি সহজে প্রতিশোধের নিশানা বানাতে পারে।
