কতিপয় ঐতিহাসিক এই ক্ষমতার রদবদল সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। একেকজন একেক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সে সময়কার কাহিনীকারদের লেখনী থেকে কিছু গোপন বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ইযুদ্দীন যখন মসুলের সুর্গে গমন করেন, তখন রোজি খাতুন ও কন্যা শামসুন্নিসা তার সঙ্গে ছিলেন। তার ব্যক্তিগত রক্ষী বাহিনীও ছিলো, যার কমান্ডার ছিলো আমের ইবনে ওসমান। বিশাল এক বহর ছিলো। বহরে কয়েকটি উটের পাল্কি ছিলো, যেগুলো চারদিক থেকে পর্দাঘেরা ছিলো। রোজি খাতুন ও শামসুন্নিসার উট ছিলো সকলের সামনে। রোজি খাতুনের খাদেমাও সঙ্গে ছিলো। রাতে এক স্থানে অবস্থান করতে হয়েছিলো।
মসুল পৌঁছতে তাড়া ছিলো ইযযুদ্দীনের। সে কারণে কাফেলার জন্য একজন দলনেতা নিযুক্ত করে নিজে অবস্থান না করে কয়েকজন রক্ষী ও দুতিনজন উপদেষ্টাসহ সফর অব্যাহত রাখেন ইযুযুদ্দীন। আমের ইবনে ওসমানকে কাফেলার সঙ্গে রেখে দেয়া হয়। সূর্য অস্ত যাওয়ামাত্র তবু স্থাপন করা হলো। রোজি খাতুনের তাঁবু সেই তাঁবুগুলো থেকে অনেক দূরে স্থাপন করা হলো, যেগুলোতে রাতে হেরেমের মেয়েরা অবস্থান করবে। ইযযুদ্দীন রোজি খাতুন ও শামসুন্নিসাকে হেরেমের তাবু থেকে দূরে রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়ে যান। অবস্থানের জায়গাটা ছিলো সবুজ-শ্যামল বনানীতে সুশোভিত।
রাত। আমের ইবনে ওসমান ঘুরে ঘুরে ছাউনি এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। ভয়ের কোন কারণ ছিলো না। সে সময় কোথাও যুদ্ধ ছিলো না। সুলতান আইউবী মিসরে আছেন। খৃস্টানরা দূরে এক জায়গায় বসে সুলভাল আইউবীর পরবর্তী রণ-পরিকল্পনা মোকালোর প্রস্তুতি গ্রহণ কচ্ছে। তবু অবস্থানস্থল ও পশুপালের আশপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমেরের কর্তক। সে হেরেমের তাঁবুগুলো থেকে সামান্য দূরে ঘোরাফেরা করছে। সঙ্গে কেউ নেই। তার থেকে আরো কিছুটা দূরে চলে যাওয়ার পর সমুখে একটি ছায়া দেখতে পায়। ছায়াটার নিকট গিয়ে ঘোড়া থামায়।
অন্ধকারে এতোদূর থেকে আমি তোমাকে চিনে ফেললাম, আর তুমি কিনা নিকটে এসেও চিনতে পারলে না। কণ্ঠটা আনুশির।
আমের ইবনে ওসমান কণ্ঠ চিনে বললো- এখনো অনেক কাজ করতে হবে। এতে বিস্তৃত ভাবু অঞ্চল আর এতোগুলো পশুর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত। তুমি আমার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করো না আনুশি।
অনুশি আমেরের ঘোড়র সামনে এসে লাগাম ধরে রেখেছিলো। বললো- ঘোড়া থেকে নেমে এলো আমের। যে লোকটাকে তোমার ভয় ছিলো, সে মসুল চলে গেছে। এবার নেমে এলো।
আমের ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। মানুশি তার কাহু ধরে টেনে নিয়ে একটি গাছের আড়ালে গিয়ে বসে। আমের অনুগত পশুটির ন্যায় বসে পড়ে।
আমের!- আপুত কণ্ঠে বললো আনুশি- আমাকে চরিত্রহীনা ও খারাপ মেয়ে মনে করে তুমি আমার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি জানি, আমার আসল পরিচয় সম্পর্কে তুমি অবহিত। তুমি নিজেকে সাধু ও পবিত্র মনে করছে। যৌবন আর আকর্ষণীয় দেহটার জন্য তোমার বেজায় গর্ব। কিন্তু ভেবে দেখেনি কখনো, এই দেহখানা যে কোন মুহূর্তে লাশে পরিণত হতে পারে। এটা যুদ্ধ-বিগ্রহের যুগ। একদল লোক যুদ্ধের মাঠে প্রাণ নিচ্ছে ও প্রাণ দিচ্ছে। আরেক শ্রেণীর জন্য অনুপ ঘটনা ঘটছে দুর্গ ও রাজপ্রাসাদে গোপনে। তোমার পরিণতিও এমনটি হতে পারে। নিজের পুরোষিত রূপ আর দেহের আকর্ষণটাকে স্থায়ী ভেবো না।
তুমি কি আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে? আমের বললো।
না- আনুশি জবাব দেয়- আমি তোমাকে বুঝাতে চেষ্টা করছি, তুমি যদি মনে করে থাকো আমি তোমার রূপ-যৌবনের জন্য পাগল, তাহলে এ ধারণা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। আমার নিজের শরীরটাও ভোগের একটা উৎকৃষ্ট উপকরণ। কিন্তু আমি দেহ আস্বাদনের প্রতি সম্পূর্ণ অনীহ। মানুষ যতো শক্ত পাথরে পরিণত হোক, হৃদয়টাকে ফতো শক্ত পাথর মনে করুক না কেন, হৃদয় কখনো পাথর হয় না। মানুষের আত্মা মুর্খা যেতে পারে- মরে না। ভালোবাসা দিয়ে ও আত্মাকে জীবিত রাখে- যার সম্পর্ক দেহের সঙ্গে নয়। তুমি আমাকে আরো গভীর চোখে নিরীক্ষা করো। আমার ও তার যাদুময়তা দেখো। আমি নিজে পাপ করি এবং অপরকে পাপের প্রতি উৎসাহিত করি। মানুষ আমাকে রাজকন্যা নয়- পরী বলে ডাকে। তোমাদের রাজা ও আমীরগণ আমার পায়ের নীচে তাদের ঈমান ও মাথা রাখতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু আমি এমন একটি পিপাসায় কাতর ছিলাম, যা কখনো অনুভব করতে পারিনি। তোমাকে দেখলাম, ভালো লাগলো। প্রথমবার যখন আমি তোমার কাছে এলাম,তখন আমার উদ্দেশ্য পবিত্র ছিলো না। তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে এবং পরে এমনভাবে তাড়িয়ে দিলে যে, আমি বুঝে ফেললাম সেই পিপাসাটা আসলে কী, যেটি আমাকে অস্থির করে রেখেছে। আমি তৈমাকে হৃদয়ের গভীর থেকে কামনা করতে শুরু করলাম। এটা তোমার ব্যক্তিত্বের নয়- চরিত্রের ক্রিয়া ছিলো। আর ক্রিয়াটা এমন যে, আমার হৃদয়ে সেই লোকদের বিরুদ্ধে ঘৃণার সৃষ্টি করে, যারা আমাকে বিলাসিতার খেলনা মনে করতো এবং নিজেদের ঈমান ও জাতীয় মর্যাদাকে আমার হাত থেকে নেয়া মদের পেয়ালায় ডুবিয়ে দিতো।
আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে বলে যাচ্ছে আনুশি। চুপচাপ শুনতে থাকে আমের ইবনে ওসমান। কিন্তু মনে তার ভয়, দৃশ্যটা কেউ দেখে ফেললে রেহাই পাওয়া কঠিন হবে। আরো ভয়, শামসুন্নিসা যদি তার সন্ধানে এদিকে এসে পড়ে, তবে তো ভালোবাসাটা খুন হয়ে যাবে। আনমনে শুধু শুনেই যাচ্ছে আনুশির কথা। রূপসী কন্যা আনুশির এমন আবেগময় কথাগুলো তার হৃদয়ে কোনই রেখাপাত করছে না।
