শোনো শামসী- আমের ইবনে ওসমান বললো- এখন আমি সরকারি কর্মচারি হিসেবে নয় একজন মুজাহিদ হিসেবে কথা বলবো। হবের শাসকমণ্ডলী এবং কতিপয় সালারের উপর আস্থা রাখা যায় না। ইযযুদ্দীন যদি নিষ্ঠাবান এবং সত্যমনে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বন্ধু হতেন, তবুও তিনি হাবের বাহিনীকে মিসরের সহযোগি বানাতে পারবেন না। তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, উপদেষ্টা ও উজির-মন্ত্রীবর্গের ঈমান খৃস্টানরা ক্রয় করে নিয়েছে। তোমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তারা ইযুদ্দীনকে এমনভাবে পেরেশান করতে শুরু করেছে যে, কারণে অকারণে তারা কোষাগারের অর্থে হাত দিতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার দ্রুত শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা, এটি একটি ষড়যন্ত্র। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোষাগার শূন্য করে ইযুদ্দীনকে বাধ্য করা যেনো তিনি খৃস্টানদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আর ইযযুদ্দীনও যে যা চাইছেন, দিয়ে দিচ্ছেন।
তার অর্থ হচ্ছে, ইষযুদ্দীন দুর্বল শাসক। শামসুন্নিসা বললো।
তার দুর্বলতা হলো, তিনি ক্ষমতার মসনদ ছাড়তে চাচ্ছেন না। আমের ইবনে ওসমান বললো। আমি তার যেসব বক্তব্য শুনেছি তাতে প্রমাণিত হয়, ক্ষমতা অটুট রাখতে তিনি খৃষ্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছেন। আমি তার এবং তার উপদেষ্টাদের কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে শুনবো আর তোমাকে জানাতে থাকবো।
এণ্ড মাথায় রাখতে হবে যে, এখানে খৃস্টানদের গুপ্তচর তৎপর রয়েছে- শামসুন্নিসা বললো- আর আমাদের গোয়েন্দারাও কাজ করছে। তোমার সাথে হয়তো তাদের সাক্ষাৎও ঘটবে। শামসুন্নিসা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে- তোমার সুদানী পরীটা কি হালে আছে, খবর-টবর কি রাখে?
রাখে- আমের জবাব দেয়- পরশু তার সাথে দেখা হলে সে কেঁদে ফেললো। বললো একটিবারের জন্য হলেও তার কক্ষে যেনো যাই। শোনো শামসী! মেয়েটাকে আমার ভয় করছে। তার জালে আটকা পড়লে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হবে না। আমি তাকে এ জন্য ভয় করছি না যে, মেয়েটা রূপসী। ভয় হলো, মেয়েটা হাবের গভর্নর ইযযুদ্দীনের হেরেমের অধিপতি। তার নাম আনুশি। মহলের লোকেরা তাকে সুদানী পরী বলে ডাকে। ইযুদ্দীন কিংবা তার কোন আমীর-উজির যদি জেনে ফেলে আমাকে সে ভালোবাসে, তাহলে মাশুল দিতে হবে আমাকে। আমার ভয়, আমি তার কথায় রাজি না হলে সে হয়তো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাকে জেল খাটাবে।
সে বোধ হয় তোমার-আমার ভালোবাসার কথা জানে না, না? শামসুন্নিসা জিজ্ঞেস করে।
যেদিন জানতে পারবে, সেই দিনটা তোমার-আমার জীবনের শেষ দিন হবে- আমের জবাব দেয়- তোমাকে ক্ষমা করা হলেও, আমি ক্ষমা পাবো না।
আনুশি মূলত খৃস্টানদের প্রেরিত উপহার। মেয়েটি হাবে এসে পৌঁছার পরপরই আল-মালিকুস সালিহ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অবশেষে মারা যান। ইযুদ্দীন এসে হাবের শাসন ক্ষমতা হাতে নিতেই খৃস্টানরা আনুশিকে তার খেদমতে পেশ করে। সেই সঙ্গে ইযযুদ্দীন রোজি খাতুনকেও বিয়ে করে ঘরে তোলেন। সে যুগের নিয়ম ছিলো, বিবাহিত স্ত্রী ও হেরেমের মেয়েরা আলাদা থাকতো। ইহুদী-খৃস্টানরা তাদের এই রীতিকে পাকাঁপোক্ত করার জন্য মেয়ে উপহার দিতো। তারা এভাবে উপহারের নামে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী চর প্রেরণ করতে থাকে।
আনুশি তেমনি এক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়ে। সে ইযযুদ্দীনের ভোজসভায় মদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করছে। নিজেও মদপান করে। সে হাবের এমন দুজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে নিজের প্রতারণার ফাঁদে আটক করেছিলো, যাদের হাতে ছিলো হাবের অস্তিত্ব। মেয়েটি ইযুদ্দীনকে কজা করে নিয়েছিলো। আমের ইবনে ওসমান ইযযুদ্দীনের কাছে থাকতো। কেননা, সে ছিলো, তার ব্যক্তিগত রক্ষী। তার দৃষ্টি ছিলো ঈগলের ন্যায় প্রখর ও দূরদর্শী। আনুশি দেখলো, লোকটি যেমন সুদর্শন, তেমনি স্মার্ট।
সে আমেরকে ভালোবেসে ফেলে। আমেরের সঙ্গে প্রেম নিবেদন করতে শুরু করে। কিন্তু আমের তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ, তার জানা ছিলো, হেরেমের হীরাটার সঙ্গে যদি কেউ কথা বলতেও দেখে, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। কিন্তু আনুশি তার পিছু ছাড়লো না।
আমি এই মহলের একজন কর্মচারি মাত্র- আমের একদিন মেয়েটিকে বললো- তোমার অন্তরে যদি আমার সত্যিকার ভালোবাসা থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দয়া করো, আমার থেকে দূরে থাকো।
তোমার প্রতি চোখ তুলে তাকাবার সাহস কেউ পাবে না- আনুশি বললো- একটিবারের জন্য আমার কক্ষে আসো।
ঐ সময় আমের ও শামসুন্নিসার গোপন অভিসার চলছিলো।
***
সে সময়কার ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন –
ইযযুদ্দীন অনুভব করেন, মসুল ও সিরিয়ার শাসকদের নিজের অধীনে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন না। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে প্রচণ্ড ভয় করতেন। তার অধীন আমীর-উজীরগণ তার নিকট যখন-তখন কারণে-অকারণে এত বেশি অর্থ দাবি করতে শুরু করে, যা দিতে তিনি ব্যর্থ হন। কেননা, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ততো সম্পদ ছিলো না। আয়ের উৎসও ছিলো সীমিত।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ আরো লিখেছেন
ইযযুদ্দীনের ভয় ছিলো, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অবশ্যই হাব দখল করে নেবেন। তিনি আইউবীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতেন। তিনি তার এক সুযোগ্য ও দুঃসাহসী সালার মুজাফফর উদ্দীন কাকবুরীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। এই পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত ছিলো সাত স্তর মাটির নীচে লুকানো এক গোপন রহস্য। মসুলের গভর্নর ছিলেন ইমুদ্দীনের ভাই ইমাদুদ্দীন, যিনি ছিলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঘোর বিরোধী। ইযযুদ্দীন মসুলের শাসনক্ষমতা হাতে নেন আর ইমাদুদ্দীন হাব এসে হাবের গভর্নর হয়ে যান। ক্ষমতার এই হাতবদল ছিলো উভয় নগরীর বাসিন্দাদের জন্য একটি রহস্যজনক ঘটনা।
