না- শামসুন্নিসা বললো- মা রাজ পরিবারের মেয়ে বটে কিন্তু তিনি সেই তাঁবুকে বেশি পছন্দ করেন, যেটি রণাঙ্গনের একেবারে সন্নিকটে স্থাপিত হয়। আমাকে তিনি সৈনিক বানাতে চান।
আমি কি আশা করতে পারি, তুমি তার সঙ্গে আমার ব্যাপারে কথা বলবে এবং তিনি বিষয়টা মেনে নেবেন? আমের জিজ্ঞেস করে।
আমার উপর তিনি যে দায়িত্ব অর্পন করেছেন, আমি যদি তা পালন করতে সক্ষম হই, তাহলে তিনি অবশ্যই আমার সকল মনোবাঞ্ছা পূরণ করবেন– শামসুন্নিসা উত্তর দেয়- তার এই বাসনা পূরণে তোমাকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
কেন, তিনি আমার নাম নিয়ে কিছু বলেছেন কি? আমের জিজ্ঞাসা করে।
না- শামসুন্নিসা উত্তর দেয় আমাকে তিনি তার উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন, যার বাস্তবায়নে তার আমাকে প্রয়োজন। আর আমার প্রয়োজন তোমাকে। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাকে সাহায্য করো আর না করো, আমাদের তৎপরতার কথা গোপন রাখবে।
যদি শপথ না নেই, তাহলে? আমের মুচকি হেসে শামসুন্নিসাকে টেনে কাছে এনে বসায়।
শামসুন্নিসা দূরে সরে যায়। প্রেম-পিপাসায় মাতাল আমের ইবনে ওসমান.। শামসুন্নিসা বললো- আমি আগেও ওয়াদা করেছি এবং আজো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি, আমার যদি বিয়ে হয় তোমার সঙ্গেই হবে। কিন্তু তার আগে আম্মা আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সেটি সম্পাদন করতে হবে।
আমের ইবনে ওসমান এই ভেবে বিস্মিত হয় যে, শামসুন্নিসাকে ইতিপূর্বে কখনো এতো কর্তব্যপরায়ণ ও আবেগপ্রবণ দেখা যায়নি। সে মুখে বিস্ময়ভার টেনে বললো- তোমার হৃদয়ে আমাকে ভালোবাসার এই কি নমুনা যে, তুমি আমার থেকে শপথ নেয়া প্রয়োজন মনে করছো?
কাজটা এমনই যে, শপথ নেয়া জরুরি- শামসুন্নিসা উত্তর দেয় আমি তো আম্মার আদেশ পালনার্থে জীবন কুরবান করতেও প্রস্তুতি আছি। তখন বোধ হয় আমার সঙ্গ দেয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
তোমার ভালোবাসার খাতিরে আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত।
না- শামসুন্নিসা বললো- ভালোবাসার খাতিরে নয়, জীবন দিতে হবে ইসলামের মর্যাদার খাতিরে। তবে সেই ইসলাম নয়, যে ইসলাম আমরা এই মহলে দেখতে পাচ্ছি। আমি সেই ইসলামের কথা বলছি, যার খাতিরে আমার পিতা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং সুলতান আইউবীও তারই জন্য লড়াই করছেন।
আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি, এ কাজে আমাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, জীবন বাজি রেখেও তা পালন করবো- আমের ইবনে ওসমান শামসুন্নিসার ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো- আমি যদি এই শপথ ভঙ্গ করি, তাহলে আমাকে জীবনে মেরে ফেলো এবং আমার লাশটা কুকুর-শিয়ালকে খেতে দিও। এবার বলো, আমাকে কী করতে হবেঃ
গোয়েন্দাগিরি- শামসুন্নিসা বললো- সুলতান আইউবী মিসরে আছেন। তিনি এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত যে, তিনি আমার ভাই আল মালিকুস সালিহর সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধ না করার যে চুক্তি করেছিলেন, তার মৃত্যুর পরও তা বহাল আছে। কিন্তু তুমি হয়তো অবগত আছে, এই চুক্তি থাকা সত্ত্বেও হাবের শাসন ক্ষমতা ক্রুসেডারদের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সুলতান আইউবী ইযযুদ্দীনকে বন্ধু মনে করলেও আমার মা অন্য আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।
মনিবের সাথে তোমার মায়ের বিয়ের পর এখন তো কোন শঙ্কা থাকার কথা নয়। আমের বললো।
আসল বিপদ তো সেখান থেকেই শুরু- শামসুন্নিসা বললো- এই বিবাহ মূলত বন্দী জীবন, আমার মাকে যার শিকলে বাঁধা হয়েছে। ইযুদ্দীন বিবাহটা এই উদ্দেশ্যে করেছেন, যাতে দামেশকবাসীকে সঠিক পথ দেখানোর মতো কেউ না থাকে। আমাদেরকে এই মহলের সকল গোপন তথ্য সংগ্রহ করে কায়রো পৌঁছাতে হবে। এও জানতে হবে, খৃস্টানদের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা কী? তারা কি পুনরায় আমাদের বাহিনীকে গৃহযুদ্ধের আগুনে পোড়াতে চায়, নাকি অন্য কোন সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায়। তুমি এমন এক অবস্থানে আছে, যেখান থেকে অনেক কিছুই দেখতে পাও। কারণ, তুমি ইযযুদ্দীনের খাস রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার।
আমি তোমার কথা বুঝতে পেরেছি- আমের বললো- তুমি ঠিকই বলেছে, আমি এমন এক অবস্থানে আছি, যেখান থেকে অনেক কিছু দেখি। শোন শামসী! আমি এযাবত যা কিছু দেখে আসছি, বিষয়গুলো কখনোই গভীরভাবে চিন্তা করিনি, যার ফলে মুজাহিদ থেকে চাকরে পরিণত হয়েছি। সৈনিক যখন মুজাহিদ থেকে বেতনভোগী কর্মচারিতে পরিণত হয়, তখন এমনই ঘটে। আমাদের মহলে এখন তাই ঘটছে। সৈনিক যখন চাকরি নেয়, তখন সে শত্রুর রক্ত ঝরানোর পরিবর্তে চাটুকারিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, যাতে মনিব তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন। খুন আর তোষামোদে সেই পার্থক্য, যে পার্থক্য জয় আর পরাজয়ের মাঝে। আমাকে কখনো কেউ বলেনি, একজন সৈনিকের কর্তব্য শুধু বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করাই নয়, ভেতরের সমস্যার মোকাবেলা করাও তার দায়িত্ব। কেউ আমাকে বলেনি, সৈনিকের এটাও কর্তব্য যে, দেশ ও জাতির জন্য যদি শাসকের পক্ষ থেকে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে তার বুকটা তীরের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দুর্গের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে হবে। তুমি আমাকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বলো, কাউকে খুন কতে হবে নাকি ভেতরের গোপন খবরাখবর সগ্রহ করলেই চলবে?
দুটোই করতে হবে- শামসুন্নিসা বললো- তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি কোন গাদ্দারকে খতম করতে হয় পরোয়া করবে না।
