এসব আমি এই মহলে নিজ চোখে দেখেছি- শামসুন্নিসা বললো আমি তখন ছোট ছিলাম। কিছুই বুঝতাম না। ভাইয়া যখন আমাকে এজাজ দুর্গ ভিক্ষা চাওয়ার জন্য সুলতান আইউবীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন, তখন আমি হেসে-খেলে এখানকার সালারদের সঙ্গে সুলতানের নিকট গিয়েছিলাম। কেউ আমাকে বলেনি, এসব কী ঘটছে। আমার জানা ছিলো না, এটা গৃহযুদ্ধ, যা মূলত খৃষ্টানদের কারসাজি। আমি কিছুই বুঝতাম না। আমার কিছু জানা ছিলো না মা! বলুন মা বলুন।
মনোযোগ দিয়ে শোনো- রোজি খাতুনের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে- এই মহলে এখনো শয়তানের রাজত্ব চলছে। আমি এখন বুঝতে পারছি, ইযযুদ্দীন বিয়ে করে আত্মাকে স্ত্রী নয়- কয়েদী বানিয়েছে। অথচ আমি: এই বিয়েতে শুধু এ জন্যই রাজি হয়েছিলাম যে, আমরা সুলতান আইউবীর বিরোধী যুদ্ধের সকল সম্ভাবনাকে দূর করে জাতির মান ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করবো এবং খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বো। কিন্তু জীবনে এই প্রথম আমি ধোঁকায় পড়েছি, যেটি কোন সাধারণ ধোকা ময়। তথাপি আমি আমার প্রত্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করবোই। আর এ কাজে তোমার সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
বলুন আম্মা, আমাকে কী করতে হবে- শামসুন্নিসা বললো- আপনি এই প্রথমবার ধোকা খেয়েছেন আর আমি এই প্রথমবারের মতো বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হলাম। আমি ধোকা আর প্রতারণার মধ্যেই এতোদিন বড় হয়েছি। বলুন, আমার এখন করণীয় কী?
গুপ্তচরবৃত্তি। রোজি খাতুন মেয়েকে বিস্তারিত দিক-নির্দেশনা দিতে শুরু করেন।
শামসুন্নিসা যখন মায়ের কক্ষে প্রবেশ করে, তখন ছিলো বেপরোয়া ও উদাসীন মেয়ে। আর যখন বের হলো, তখন সে আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী এক মুজাহিদ নারী। তার ব্যক্তিসত্তা ও ভাবনার জগতে এসেছে বিরাট বিপ্লব।
***
আপনাকে কে বললো, আমার মা ঝগড়াটে ও সন্দেহপ্রবণ শামসুন্নিসা ইব্যুদ্দীনকে বললো- আপনি তো জানেন তার জীবনটা কীভাবে অতিবাহিত হয়েছে। তিনি তো আপনাকেও আমার পিতা নূরুদ্দীন জঙ্গীর ন্যায় বিখ্যাত যোদ্ধা ও মুজাহিদে ইসলাম বানাতে চাচ্ছেন।
তোমার মা আমার কাজে হস্তক্ষেপ করতে চায়- ইযুদ্দীন বললেন- তার সন্দেহ, আমরা খৃস্টানদের বন্ধু।
আপনার কাজে হস্তক্ষেপ করতে আমি তাকে বারণ করেছি শামসুন্নিসা বললো- আপনি খৃস্টানদের সুহৃদ এই সন্দেহও তার থেকে দূর করে দিয়েছি। আপনি তাকে ভুল বুঝবেন না। আর তার উপর অপ্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন না।
আমি কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিনি- ইযযুদ্দীন বললেন- ঘোড়াগাড়ি সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকে, তোমরা যখন খুশি ভ্রমণ করতে পারো।
ইনুদ্দীন শামসুন্নিন্সার রিপোর্ট সত্য বলে মেনে নেয়। কথোপকথন হচ্ছে ইষযুদ্দীনের দফতরে। আলাপ শেষে শামসুন্নিসা বেরিয়ে এসে দেখে, আমের ইবনে ওসমান দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার বয়স এখনো ত্রিশের নীচে। সুঠাম আকর্ষণীয় এক যুবক। তীরন্দাজ ও তরবারী চালনায় ভার জুড়ি নেই। মেধাও খুব প্রখর। আল-মালিকুল সালিহর বিশেষ রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার ছিলো। বাসগৃহ মহলেরই ভেতরে। অল্প কদিন হলো শামসুন্নিসাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে তার। সহজ সরল রূপসী মেয়ে শামসুন্নিসা। পিতার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে কেউ কোনদিন তাকে ধারণা দিতে হয়নি। মহলের একজন বিশ্বস্ত মেয়ে হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলো। ভাইয়ের মৃত্যুর পর সরল মেয়ে মনে করে ইযুদ্দীন তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই সুযোগে আমের ইবনে ওসমানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হতো।
এখন শামসুন্নিসা ষোল বছরের যুবতী। সে যুগের মেয়েরা উচ্চতা ও আকার-গঠনে বয়সের চেয়ে বড় মনে হতো এবং অনেকে এই বয়সেই দুএকটি সন্তানের মা হয়ে যেতো। শামসুন্নিসা শাসক পরিবারের কন্যা। অর্থাৎ রাজকন্যা। আল্লাহ তাকে যে রূপ দান করেছিলেন, তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় মনে হতো তাকে। তার এই রূপসাগরে সাঁতার কাটতে শুরু করেছে আমের ইবনে ওসমান। তাদের মাঝে গোপনে দেখা সাক্ষাৎ হতো। তবে এই প্রেম ছিলো পবিত্র। যার তীব্রতা দুজনকে গভীরভাবে একে অপরের অনুরক্ত বানিয়ে রেখেছিলো। পরস্পর বিয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রেখেছে তারা। তবে সমস্যা হচ্ছে, আমের ইবনে ওসমান শামসুন্নিসার বংশের একজন নিম্ন পর্যায়ের চাকর। তাকে স্ত্রীরূপে লাভ করার স্বপ্ন তার পক্ষে ছিলো কল্পনা মাত্র। তথাপি শামসুন্নিসাকে পাওয়ার আশায় বাবা-মার পছন্দ করা মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করেছে সে।
শামসুন্নিসা যখন ইযুদ্দীনের দফতর থেকে বের হয়, তখন আমের ইবনে ওসমান বাইরে দণ্ডায়মান। শামসুন্নিসা তাকে দেখে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে ইশারা করে চলে যায়। আমের তার ইঙ্গিতের মর্ম ভালোভাবে বুঝে। সে মাখ দুলিয়ে জবাব দেয়- যাও, আসছি।
***
জায়গাটা গাছপালা, লতাপাতায় সুশোভিত। উপরটা রাতের আঁধারের চাদরে ঢাকা। মহলের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ ছেড়ে আমের ইবনে ওসমান ও শামসুন্নিসা এখানে উপবিষ্ট। যৌবনদীপ্ত উন্মাতাল ভালেবাসার মাদকতায় আচ্ছন্ন দুজন।
আমি আজ মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি- শামসুন্নিসা বললো এখন থেকে তার সঙ্গে থাকবে।
তোমার মা-ও তো রাজ পরিবারের মেয়ে- আমের বললো- তিনি তোমাকে রাজপুত্র ছাড়া কারো সঙ্গে বিয়ে দেবেন না নিশ্চয়ই।
