আমি তোমাকে আরেকবার বলছি- ইযযুদ্দীন বললেন- আমার কাজে তুমি কোন বাধার সৃষ্টি করো না। তুমি আমার স্ত্রী। স্ত্রীর মর্যাদা নিয়েই থাকো। যদি মুক্ত হতে চেষ্টা করো, তাহলে বাইরে গিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে অনুমতি আমি তোমাকে দিয়েছি, সেটাও প্রত্যাহার করে নেবে।
আমি যদি আপনার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করি, তাহলে
তাহলে তুমি এই কক্ষে বন্দী হয়ে থাকবে- ইযযুদ্দীন বললেন তালাক পাবে না। আমি তোমাকে তালাক দেবো না।বলেই ইযযুদ্দীন বেরিয়ে যান।
***
আপনি ভুল করেছেন- খাদেমা রোজি খাতুনকে বললো। এতোক্ষণ পেছন দরজার সঙ্গে কান লাগিয়ে ইযুদ্দীন ও রোজি খাতুনের কথোপকথন শুনছিলো খাদেমা। ইযযুদ্দীন বেরিয়ে যাওয়ার পর খাদেমা পেছন দরজায় ভেতরে ঢুকে পড়ে।
খাদেমা বললো- আপনি যদি হটকারিতা দেখান, তাহলে লোকটা সত্যি সত্যিই আপনাকে এমন এক কারাগারে নিক্ষেপ করবে, যা হবে স্বাধীনতা; কিন্তু কয়েদ থেকে নিকৃষ্ট। আপনি মনিবের মনোভাব নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন। এখন আর তার সঙ্গে এ ধারায় কথা বলবেন না। তার সামনে হাসি-খুশি থাকবেন এবং বাহ্যত অনুভূতিহীন হয়ে যাবেন। আপনি যে ইচ্ছা ও স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন, আমরা তা পূরণ করবো। মনিব আপনাকে বাইরে বের হয়ে ঘোড়াগাড়িতে চলে বেড়ানোর অনুমতি দিয়েছেন শুনে আমার আনন্দ লাগছে। আমি আপনাকে আমাদের কমান্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবো। আর ইসহাক তুর্কি যদি এসে পড়ে, তার সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ করে দেবো।
কে যেনো আস্তে করে দরজাটা ঠেলা দেয়। উভয়ে চাতক নয়নে দরজার দিকে তাকায়। আগন্তুক রোজি খাতুনের কন্যা শামসুন্নিসা। মেয়েটা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। ঠোঁটে মুচকি হাসি। কিন্তু চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। ঠোঁটের হাসি ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। রোজি খাতুন উঠে এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। মা-মেয়ে দুজনই কাঁদছেন। হেঁচকি শোনা যাচ্ছে উভয়ের। খাদেমা বাইরে বেরিয়ে যায়। বেশ সময় ধরে দুজনে আল-মালিকুস সারিহর কথা স্মরণ করে কাঁদতে থাকেন।
তুমি এতোদিন কোথায় ছিলে? রোজি খাতুন বললেন।
চাচাজান (ইযযুদ্দীন) আমাকে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেননি।
কী কারণে সাক্ষাৎ করতে দেননি, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলে?
করেছিলাম- শামসুন্নিসা উত্তর দেয়- তিনি স্পষ্ট কোন উত্তর দেননি। এইমাত্র বললেন, যাও মায়ের সঙ্গে দেখা করো। বলেছেন, তিনি অনেক ব্যস্ত থাকেন, তাই আমাকে বেশি বেশি সময় দিতে বলেছেন।
একথা কি বলেননি যে, মায়ের উপর দৃষ্টি রাখো আর আমাকে রিপোর্ট করো, তার কাছে কারা আসে এবং কী কী কথা হয়? রোজি খাতুন বললেন।
বলেছেন- শামসুন্নিসা সরল মনে উত্তর দেয়- তিনি এমন কিছু কথাও বলেছেন, যা আমি বুঝতে পারিনি। আমি তাকে বলেছি, ঠিক আছে বলবো। তিনি বলেছেন, তোমার মা খুব জেদি, সন্দেহপ্রবণ এবং ঝগড়াটে মনে হচ্ছে। তাকে বলবে, আমি খুব ব্যস্ত ও পেরেশান থাকি।
শোনো মেয়ে- রোজি খাতুন বললেন- তুমি বড় হয়েছে। সরল সিধা মন ত্যাগ করতে হবে। আমি বলছি না এখনই তোমার বিয়ে হওয়া দরকার। মুজাহিদদের মেয়ে হাতে রক্তের মেহেদী ব্যবহার করে। জীবন্ত জাতির মেয়েদের পালকি কমই বহন করা হয়। যুদ্ধের ময়দান থেকে তাদের লাশ বহন করা হয়ে থাকে। তোমার দুর্ভাগ্য হলো, তুমি তোমার ভাই এবং তার উপদেষ্টাদের ছায়ায় লালিত হয়ে বড় হয়েছে। এরা সবাই গাদ্দার। তোমার ভাইও গাদ্দার ছিলো। তুমি তোমার ভাইয়ের বাহিনীকে তোমার পিতার বাহিনী এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেখেছো! তোমার ভাই- আমি যাকে পুত্র বলতে লজ্জাবোধ করতাম- ক্রুসেডারদের বন্ধু ছিলো। তাদের বন্ধু, যারা তোমার ধর্মের শত্রু। তোমার পিতা সারাটা জীবন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন।
ভাইয়া বলতেন, খৃস্টানরা খুব ভালো মানুষ- শামসুন্নিসা বলল তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে কথা বলতেন।
রোজি খাতুন কন্যা শামসুন্নিসাকে খৃস্টানদের চক্রান্ত-পরিকল্পনার কথা অবহিত করে বললেন- ইসলাম ও মুসলমানের শত্রুতায় তারা এতো কট্টর যে, তাদের বন্ধুত্বের মধ্যেও শত্রুতা থাকে। রোজি খাতুন বলে যাচ্ছেন আর শামসুন্নিসার চোখ খুলে যাচ্ছে। মায়ের মুখনিসৃত প্রতিটি শব্দ ও বাক্য তার মনের পর্দা খুলে দিয়ে। মায়ের মমতামিশ্রিত কথাগুলো মেয়ের মনে গেথে যাচ্ছে।
মুসলমানের কোন বন্ধু নেই- রোজি খাতুন বললেন- জগতের প্রতিটি বেঈমান জাতি মুসলমানের শত্রু। আর তাদের শত্রুতার সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর পন্থা বন্ধুত্ব। খৃস্টানরা হব, মসুল, হাররানের আমীরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে আমাদের জাতিকে দুভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। তোমার ভাই তাদের হাতের পুতুল ছিলো। উম্মতের ঐক্য বিনষ্ট করে জাতিকে বিভক্ত করা ছিলো তার মহা-অপরাধ। কেননা, এই বিভক্তি জাতির এক সদস্য দিয়ে অপর সদস্যকে খুন করায়। কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে কাফেরদের মোকাবেলায় সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দণ্ডায়মান থাকো। আমরা ছিলামও তাই। কিন্তু কাফেররা বিলাসিতার উপকরণ আর নারীদের ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের সেই দেয়ালে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। শয়তানের কাজে যাদুর ক্রিয়া থাকে। নারী, মদ, স্বর্ণমুদ্রা ও ক্ষমতার লোেভ মানুষকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের বিপক্ষে শয়তানের এ কাজটা খৃস্টানরী করছে।
