হঠাৎ একদিন ইম্যুদীন তার কক্ষে এসে প্রবেশ করেন এবং ব্যস্ততার কারণে এতোদিন আসতে পারেননি বলে ওজরখাহী করেন।
আপনি আসেননি বলে আমার কোন অভিযোগ নেই- রোজি খাতুন বললেন- আমি এখানে মূলত বধূ হয়ে আসিনি। আপনি প্রতি মুহূর্তে আমার সঙ্গে থাকুন কিংবা প্রতিরাত আমার সাথে সময় অতিবাহিত করুন, এরূপ আকাঙ্খা আমার নেই। আমার দাম্পত্য জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় নিঃসঙ্গ কেটেছে। মরহুম নূরুদ্দীন জঙ্গী রণাঙ্গনে থাকতেন আর আমি তার নয়- তার লাশের অপেক্ষায় থাকতাম। যে সময়টা তিনি যুদ্ধের ময়দানে থাকতেন না, সে সময়টা রাজ্যের বিভিন্ন কাজ এবং ফৌজের প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকতেন। আমাকে দেয়ার মতো সময় তিনি তেমন একটা পেতেন না। কিন্তু সেখানে আমিও ব্যস্ত থাকতাম। সালতানাতের কিছু কিছু কাজের তত্ত্বাবধান ও শহীদ পরিবারের দেখাশোনা আমার উপর ন্যস্ত ছিলো। আমি মেয়েদেরকে আহত যোদ্ধাদের ব্যান্ডেজ, তরবারী চালনা, তীরন্দাজি ও অশ্বচালনার প্রশিক্ষণ দিতাম। ওখানে আমি এক কক্ষে বন্দী ছিলাম না, যেমনটা এখানে আছি। এই বন্দিদশা আমি পছন্দ করি না।
রোজি খাতুন খাদেমার নিকট থেকেই ইযযুদ্দীনের মতলব জানতে পেরেছেন। তাই এই দ্বিতীয় স্বামীর মনভোলানো প্রেমনিবেদনে প্রবঞ্চিত হতে প্রস্তুত নন তিনি। একবার মাত্র এবং আজই তিনি নিজের উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করে ফেলবেন মনস্থ করেন রোজি খাতুন। রোজি খাতুন ছোট্ট খুকি নয়- একজন পরিপক্ক অভিজ্ঞ নারী।
কিন্তু আমাকে এই কক্ষে যেভাবে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এটা আমার পছন্দ নয়- রোজি খাতুন বললেন- আমি আপনার হেরেমের দাসী-গোলাম নই। আপনি আমাকে এভাবে রাখতে পারেন না।
রোজি খাতুন!- ইযযুদ্দীন কক্ষে পায়চারি করতে করতে বললেন নূরুদ্দীন জঙ্গীর সংসারে তুমি যে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছে, সেই ধারা এখানে তোমাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। তিনি তোমাকে যে স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিলেন, তা আমার পছন্দ নয়। আর কোন স্বামীই এই জীবনধারা মেনে নিতে পারে না। তুমি যদি বাইরে বেড়াতে যেতে চাও তো তোমার জন্য ঘোড়াগাড়ি প্রস্তুত আছে। যখন খুশি তুমি বেড়িয়ে আসতে পারো।
যার মহলের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি নেই, সে আবার বাইরে বেড়ানোর অনুমতি কী করে পেতে পারে?- রোজি খাতুন প্রশ্ন করেন- আপনি কি সত্যিই নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি মহলের ভেতর ঘোরাফেরা করতে পারবো না?
এই আদেশ আমি তোমার নিরাপত্তার জন্য দিয়েছি- ইযযুদ্দীন উত্তর দেন- তুমি তো জানো, হাল্ব ও দামেশকে কিরূপ গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সুলতান আইউবী তোমার পুত্রকে পরাজিত করে তাকে আনুগত্যের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু এখানকার লোকজন অন্তর থেকে আইউবীর শত্রুতা ভুলতে পারেনি। মহলে এমন লোকও থাকতে পারে, যে তোমাকে এবং সুলতান আইউবীকে শত্রু মনে করে। সুলতান আইউবীর ফৌজের হাতে তাদের বাস্তুভিটা ধ্বংস হয়েছে এবং তাদের যুবক ছেলেরা নিহত হয়েছে। তারা জানে, তুমি আইউবীর সমর্থক এবং তার দামেক দখলে সহায়তা করেছে। তাদের কেউ তোমাকে খুন কিংবা অপহরণ করতে পারে।
তারা আপনাকেও হত্যা করতে পারে। কারণ, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর বন্ধু ও জোটভুক্ত শাসক- রোজি খাতুন বললেন- তো যে লোকগুলো ইসলামী ঐক্যের বিরোধী তাদেরকে গ্রেফতার করা আবশ্যক নয় কি? আপনার নিকট কি এমন কোন গুপ্তচর নেই, যারা খুঁজে বের করে এদেরকে ধরিয়ে দিতে পারে?
আমি সকল ব্যবস্থাই করছি- ইযুদ্দীন এমনভাবে কথাটা বললেন যেনো তার কাছে এ প্রশ্নের উপযুক্ত কোন জবাব নেই- আমি তোমার জীবনটা ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করতে চাই না।
এই ঝুঁকি কি শুধু মহলের ভেতরে?- রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন আপনি আমাকে ঘোড়াগাড়িতে চড়ে যেখানে খুশি ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি প্রদান করেছেন। বাইরেও তো কেউ আমাকে খুম কিংৰা গুম করতে পারবে।
ইফুদ্দীন উত্তর দিতে চাইলে রোজি খাতুন তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- আমি আপনাকে শুধু এই উদ্দেশ্যে বিয়ে করেছি যে, নূরুদ্দীন জঙ্গী যে কাজ অসমাপ্ত রেখে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন; আমি, সালাহুদ্দীন আইউবী আর আপনি মিলে কাজটা সমাপ্ত করবো। তার জন্য এখনো যদি আপনার পোষ্যদের মধ্যে আমাদের মিশন বিরোধী কেউ থেকে থাকে, তাদের নির্মূল করা এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এই ভূখণ্ড থেকে খৃস্টানদের উৎখাত করা জরুরি।
তোমার কি সন্দেহ আছে, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর দলভুক্ত নই? ইযুদ্দীন বললেন।
আপনি কি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, আমার পুত্র এই মহলের উপর খৃস্টানদের যে প্রভাব জন্ম দিয়ে গেছে, সব নির্মূল হয়ে গেছে- রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন- আপনার সকল আমীর ও সালার কি বাগদাদের খেলাফতের অনুগত?
এখানে তুমি আমার স্ত্রী হয়ে এসেছো- দূত হয়ে নয়। ইযযুদ্দীন খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন।
আমি এখানে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি, তা আপনাকে ব্যক্ত করেছি- রোজি খাতুন বললেন- আমি আমার পেটে আপনার সন্তান ধারণ করতে আর শুধু স্ত্রী হয়ে এই কক্ষে আবদ্ধ থাকতে আসিনি। আমি মহলের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে এবং হাব খৃস্টানদের অপচ্ছায়া থেকে নিরাপদ আছি কিনা জানতে চাই। যদি না থাকে, তাহলে নগরকে নিরাপদ বানাতে হবে। কেউ আমাকে ঠেকাতে পারবে না।
