আমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে পারবো? রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন।
অবশ্যই। সেবিকা জবাব দেয়।
৭.৪ শরাব নয় শরবত
শরাব নয় শরবত
ইযযুদ্দীনের মহলের আভ্যন্তরীণ জগতের গোপন তথ্যাদি অবহিত করে রোজি খাতুনের পায়ের তলার মাটি সরিয়ে দিয়েছে খাদেমা। রোজি খাতুন যেসব স্বপ্ন দেখে হাবের গভর্নর ইযযুদ্দীনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেসব স্বপ্ন থেকে তিনি জাগ্রত হয়ে গেছেন।
রোজি খাতুন এক মহান নারী। ইসলামে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক বীর মুজাহিদা। মৃত স্বামী নূরুদ্দীন জঙ্গী এবং পাসেবানে ইসলাম সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় রোজি খাতুনও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং সালতানাতে ইসলামিয়ার ঐক্য সম্প্রসারণের জন্য জন্মেছিলেন। খাদেমা তাকে যেসব তথ্য অবহিত করেছে, সেসব যদি সত্য ও বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে তার অর্থ হচ্ছে- এই বীর নারীর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং তার তরবারীটাকে ভোলা বানিয়ে তাকে কয়েদীতে পরিণত করা হয়েছে। তার যুবতী কন্যা শামসুন্নিসা এ মহলেই অবস্থান করছে। অথচ, এখনো মেয়ের সঙ্গে তার দেখা মেলেনি।
পিতা নূরুদ্দিন জঙ্গীর মৃত্যুর সময় শামসুন্নিসার বয়স ছিলো আট-নয় বছর। তার বড় এবং একমাত্র ভাই আল-মালিকুল সালিহর এগারো। জঙ্গীর মৃত্যুর পর ক্ষমতালোভী চাটুকাররা তাঁর এই এগারো বছরের বালক পুত্রটাকে খলীফা নিযুক্ত করে পুতুল রাজায় পরিণত করে। সুলতান সালাহুদ্দীন এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দেশ রক্ষার জন্য মিসর থেকে দামেশক এসেছিলেন। তার আগমনের ধরনটা ছিলো একরকম সেনা অভিযানের মতো। জঙ্গীর বিধবা রোজি খাতুনের প্রচেষ্টা ও সর্বাত্মক সহযোগিতায় দামেশকের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল-মালিকুস সালিহ বিপুলসংখ্যক সৈন্যসহ পালিয়ে হাল্ব চলে যান। বোন শামসুন্নিসাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। মা রোজি খাতুন দামেশকে থেকে যান এবং খৃস্টানদের বিরুদ্ধে জিহাদে রত থাকেন। শামসুন্নিসা পনের বছরে উপনীত হলে ভাই আল-মালিকুস সালিহ রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় শায়িত হন। তিনি মাকে এক মজর দেখার আকাঙ্খা ব্যক্ত করলে শামসুন্নিসা দামেকে মায়ের নিকট গিয়ে আর্জি পেশ করে, আপনার একমাত্র পুত্র মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তিনি আপনার সাক্ষাৎ কামনা করছেন।
রোজি খাতুন স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন- তোমার ভাই যেদিন সুলতানের আসনে আসীন হয়েছিলো এবং সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে। তরবারী উত্তােলন করেছিলো, সেদিনই তার মৃত্যু হয়ে গেছে। শামসুন্নিসা ফিরে যায়। ততোক্ষণে ভাই আল-মালিকুস সালিহ দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।
আজ রোজি খাতুন পুত্র যে মহলে মৃত্যুবরণ করেছিলো, তার স্থলাভিষিক্ত ইযযুলীনের স্ত্রী হয়ে সেই মহলে আগমন করেছেন। কন্যা শামসুন্নিসা- যে কিনা এই মহলেই অবস্থান করছে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেনি। রোজি খাতুন খাদেমাকে জিজ্ঞেস করেন- শামসুন্নিসা কোথায়? আমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে পারবো?
সে এখানেই আছে- খাদেমা জবাব দেয়- মনিবকে জিজ্ঞেস করুন, তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কিনা। যদি কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি গোপনে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করবো।
তুমি তোমার দলের যে কমান্ডারের কথা বলছে, তার সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করতে পারবো কি? রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন।
কটা দিন যাক- খাদেমা উত্তর দেয়- দেখি আপনার উপর কী কী বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। পরিস্থিতি অনুপাতে সব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। আপনার বিয়েটা হঠাৎ হয়েছে এবং এতো দ্রুত যে, আমরা আগে জানতেই পারিনি। অন্যথায় এ বিয়ে হতে দিতাম না।
আচ্ছা, আমি কীভাবে বিশ্বাস করবো, তুমি আমার সমর্থক এবং আমার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করছে না? রোজি খাতুন সরল মনে জিজ্ঞেস করেন।
খাদেমার ঠোঁটে হাসি দেখা দেয়। রোজি খাতুনকে গভীর দৃষ্টিতে দেখে বললো- আমি যদি কোন ধনাঢ্য নারী হতাম, কোন প্রাসাদের রাজকন্যা হতাম কিংবা আমার মর্যাদা যদি আপনার ন্যায় হতো, তাহলে আপনি আমাকে এরূপ প্রশ্ন করতেন না। আপনি প্রতিটি মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিয়ে প্রতারণার শিকার হতেন। আমার অবস্থান তো এমন যে, আমার সত্যটাও মিথ্যা বলে মনে হবে। এখনো কি আপনার এই অভিজ্ঞতা হয়নি, সততা, বিশ্বস্ততা ও চেতনা শুধু গরীবদেরই হৃদয়ে বিদ্যমান থাকে। অনাগত ভবিষ্যই বলে দেবে আপনাকে কার উপর আস্থা রাখা উচিত- একজন গরীব সেবিকার উপর, নাকি হালবের রাজার উপর, যিনি আপনার স্বামীও বটে। আপনি আমাকে বিশ্বাস করার ঝুঁকি বরণ করে নিন আর দুআ করুন, আল্লাহ যেনো আপনার ও আমাদের সাহায্য করেন।
খাদেমা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। রোজি খাতুন চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেতে শুরু করেন। রাজকীয় এই কক্ষটা তার কাছে মনে হচ্ছে আস্ত একটা জাহান্নাম।
দু-তিন দিন হয়ে গেলো রোজি খাতুন ইযযুদ্দীনের দেখা পাচ্ছেন না। কক্ষে খাবার-পানীয় ইত্যাদি সব এসে যাচ্ছে যথারীতি। তার কখন কী প্রয়োজন হয়, সমাধার জন্য সেবিকাগণ মহাব্যস্ত। যেন তিনি এই মহলের রাণী। কিন্তু এই রাজকীয় আয়োজন তাকে মানসিকভাবে নিদারুণ পীড়া দিয়ে যাচ্ছে। তিনি একজন সুলতানের বিধবা। স্বামীর জীবদ্দশায় কখনো তিনি নিজেকে রাণী কিংবা রাজকন্যা ভাবেননি। তার প্রত্যয় ছিলো, তিনি পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হবেন, মাঠে-ময়দানে শক্রর মুখোমুখি যুদ্ধ করবেন এবং একদিন শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন।
