আমাকে ভাবতে দাও-ইসহাক কললো- এখান থেকে কবে রওনা হবে।
আজই- খৃষ্টান দলনেতা বললো- মধ্যরাতের পর। তুমি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নাও। মনে রাখবে, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।
আমি জানি। ইসহাক বললো।
আর তোমাকে বলতে হবে, তুমি আইউবীর নিকট কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছিলে। খৃষ্টান দলনেতা বললো।
বলবে- ইসহাক জবাব দেয়। পরে বলবো। মথাটা আউলা-ঝাউলা হয়ে আছে। একটু স্থির হয়ে নিই।
যাও, এখন বিশ্রাম নাও। খৃষ্টান দলনেতা বললো।
ইসহাক তুর্কি তাঁবুর দিকে চলে যায়।
***
নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী রোজি খাতুন এখন ইযুযুদ্দীনের স্ত্রী। মহিলার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। নেই কোন জৈবিক চাহিদাও। তবু এই বিয়েতে তিনি আনন্দিত। আনন্দিত এ জন্য যে, স্ত্রী হওয়ার সুবাদে ইযুদ্দীনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন এবং হাবের বাহিনীকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সহযোগি হয়ে কাজ করাবেন। তার আশা ছিলো ইযুদ্দীন তাকে নিজের উপদেষ্টা নিযুক্ত করবেন।
কিন্তু বিবাহের প্রথম দিনই যখন রোজি খাতুন এ জাতীয় আলাপের অবতারণা করেন, দেখা গেলে তাতে ইযুদীনের কোন আগ্রহ নেই। কেমন যেনো বিরক্তি ভাব তার মধ্যে। তিনি রাতে রোজি খাতুনের সঙ্গে এক শয্যায় ঘুমালেনও না। থাকলেন মহলের অন্য এক কক্ষে।
রোজি খাতুন প্রাথমিকভাবে ধরে নিলেন, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিধায় ঝামেলার কারণে মন-মানসিকতা ভালো নেই। দুচারদিন গেলে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় ঝক্কি-ঝামেলার প্রতি তার কোন অনুযোগ নেই। তিনি নিজেও তো রাষ্ট্রের ভাবনাই ভাবেন। নূরুদ্দীন জঙ্গীর জীবদ্দশায় তিনি বহু কাজ করেছেন। করেছেন জঙ্গীর মৃত্যুর পরও। দামেশকের যুবতী মেয়েদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে রীতিমতো একটি মহিলা বাহিনী গঠন করে ফেলেছিলেন।
রাত পোহারার পর রোজি খাতুন কক্ষ থেকে বের হন। হাঁটতে হাঁটতে মহলের ভেতরেই এক স্থানে চলে যান। বিশাল প্রাসাদ। তিনি দূরে একটি বাগিচা দেখতে পান। তাতে পাঁচ-ছয়টি যুবতী হাসি-তামাশা করছে।
রোজি খাতুন এখনো তাদের থেকে বেশ দূরে। এক মধ্যবয়সী মহিলা ধেয়ে এসে তাকে বললো- আপনি আপনার কামরায় চলে যান।
কেন?
মুহতারাম আমীরের এটাই নির্দেশ মহিলা বললো- চলুন, আপনার জায়গায় আপনাকে পৌঁছিয়ে দেই। ওখানেও আপনি ঘোরাফেরা করতে পারবেন। মাননীয় আমীরের কড়া নির্দেশ, আপনাকে যেনো এখানে আসতে না দেই।
আমি যদি সেই নির্দেশ অমান্য করি, তাহলে কী হবে। রোজি খাতুন পাল্টা প্রশ্ন করেন।
আমাকে গোস্তাখী করার সুযোগ দেবেন না- মহিলা অনুরোধের সুরে বললো- মনিবের আদেশ আমাকে মানতেই হবে।
আরেক মধ্যবয়সী মহিলা এসে হাজির হয়। সে রোজি খাতুনের পাশে এসে দাঁড়ায়। রোজি খাতুনকে সঙ্গে করে তার কক্ষে নিয়ে যায়। মহিলা বলতে শুরু করে- আমি আপনার সেবিকা। সর্বক্ষণ আপনার কাছে থাকার নির্দেশ পেয়েছি। আরো নির্দেশ পেয়েছি, আপনাকে যেনো নির্ধারিত সীমানার বাইরে যেতে না দেই।
রোজি খাতুন চমকে ওঠেন। সেবিকা বললো- আপনি ভয় পাবেন না। আমি জানি, আপনি কী স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে এসেছেন। আপনার প্রতিটি স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। আমাকে আপনার সহকর্মী মনে করুন। এই মহল খৃষ্টানদের কড়া নজরদারির মধ্যে আছে। আপনার পুত্র তাদের হাতের খেলা ছিলেন। বর্তমান আমীরও- যিনি এখন আপনার স্বামী- খৃষ্টানদের মদদপুষ্ট ও অনুগত হয়েই থাকবেন। এখানকার বহু উজির ও উপদেষ্টা খৃস্টানদের কেনা দাসে পরিণত হয়েছে।
সালাহুদ্দীন আইউবীর ব্যাপারে মহলের লোকদের অভিমত কী? রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন। এখানে তার কোন প্রভাব আছে কি?
এতোটুকু নেই, যতোটুকু আছে খৃস্টানদের- সেবিকা গোপনীয়তা রক্ষা করে বললো- মহলে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা আছে। আমি নিজে সেই গ্রুপের সদস্যা। আমি আপনাকে ভালো করেই জানি। তাই নিজের পরিচয়টা দিয়েছিলাম। তবে সব কথা এখনই বলবো না। আপনি ইযযুদ্দীনের নিকট আপত্তি জানান। তিনি আপনাকে এই কক্ষের কয়েদী বানাবেন কেন।
তাতো করবোই।
তার উদ্দেশ্যটা আপনার নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে- সেবিকা বললো পরবর্তী পরিস্থিতিই প্রমাণ করবে, আমি মিথ্যা বলিনি। সত্য হলো, ইযযুদ্দীনের আপনাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্য হলো, তিনি আপনাকে কয়েদী বানাবেন। আপনাকে নিজের মতো করে কাজ করতে দেবেন না। সুলতান সালাহুদ্দিন আইউবীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক চিরদিনের জন্য নষ্ট করা দিতে এবং আপনাকে দামেশক থেকে বের করে আনাই তার উদ্দেশ্য। দামেশকের মানুষ সুলতান আইউবীর সমর্থক ও অনুগত এ জন্য যে, আপনি ওখানে ছিলেন। এখন শত্রুরা দামেশকের জনগণকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। ফলে মুসলমানরা পুনরায় গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে এবং খৃস্টানরা অনায়াসে আমাদের ভূখণ্ডগুলো দখল করে নেবে।
এই তথ্যগুলো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট পৌঁছানো যায় না? রোজি খাতুন জিজ্ঞেস করেন।
সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে- সেবিকা উত্তর দেয়- আমাদের দলের কমান্ডার অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সাহসী এক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তার নাম ইসহাক তুর্কি। আমি তাকে ভালো করে জানি। আপনার ছেলের মৃত্যুর পর খৃষ্টানদের পরিকল্পনা জানতে খৃষ্টানদের অঞ্চলে চলে গেছে। শীঘ্রই এসে পড়বে।
