বারবারার ইশারা-ইঙ্গিতে ইসহাক বুঝে ফেলে এরা খৃষ্টান এবং এদের আর কোন তথ্য দেয়া যাবে না। ব্যাপারটা অনুধাবন করে ইসহাক মনে মনে চমকে ওঠে বটে; কিন্তু অভিজ্ঞ গুপ্তচর বলে কিছুই প্রকাশ পেতে দেয়নি। তার সন্দেহ দৃঢ় সত্যে পরিণত হয়। সে বুঝতে পারে, সুলতান আইউবীর উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া তথ্য জানার এদের এতো আগ্রহ কেন। তার চেতনা আসে, সে তো ঘুমকাতর নয়। তবে কি তাকে বেহুশ করে রাখা হয়েছিলো। ঘুম থেকে জেগে সে বিস্ময়কর এক ঘ্রাণ অনুভব করেছিলো। তার আর সন্দেহ রইলো না তাকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছিলো? কিন্তু একটি প্রশ্ন তার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, দ্বিতীয় মেয়েটি তাকে ইশারা করে গেলো কেন? তবে কি মেয়েটি মুসলমান, এদের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে।
মিষ্টিমধুর কথা, পাগলকরা মুচকি হাসি আর মনকাড়া ভাবভঙ্গিতে ইসহাককে তথ্য প্রকাশের জন্য কসরত চালিয়ে যাচ্ছে মেরিনা। ইসহাকের মাথাটাও কাজ করে যাচ্ছে দ্রুত কীভাবে এদের কবল থেকে মুক্তিলাভ করবে।
ইসহাক মেরিনাকে জিজ্ঞেস করে- তোমাদের কাফেলায় কতোজন লোক আছে মেরিনা সংখ্যা বলে। ইসহাক আরো কিছু প্রশ্ন করে শেষে বললো- দাও, আমাকে ঘোড় দাও।
ইসহাক বাইরে চলে আসে। এদের সংখ্যা যাচাইয়ের চেষ্টা করে। কীভাবে এদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া যায়, সে ফন্দি করতে থাকে। তার জন্য যে ঘোড়া প্রস্তুত করে রাখার কথা বলা হয়েছিলো, বাইরে এলে সে কোন ঘোড়া দেখতে পায় না।
মেরিনা ইসহাকের পাশে এসে দাঁড়ায়।
ঘোড়া কোথায়? ইসহাক জিজ্ঞেস করে।
আমি দেখছি। বলেই মেরিনা চলে যায়।
***
তুমি ঠিকই বলেছিলে- মেরিনা দলনেতাকে বললো- লোকটা পাথর, ঘোড়া ছাড়া কোন কথাই বলছে না। আমার কথার কোন পাত্তাই দিচ্ছে না।
তার কোন সন্দেহ জাগেনি তো? খৃস্টান দলনেতা বললো।
এ পর্যন্ত না- মেরিনা বললো- তবে তার মুখ থেকে আসল তথ্য বের করা যাচ্ছে না।
তার মানে তোমরা ব্যর্থ! খৃস্টান দলনেতা বললো।
দলনেতা জানে না, বারবারা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে। সে প্রমাণ করে দিয়েছে, মেরিনা জাদুকর নয় যে, অসম্ভব কাজও করে দেখাবে। সুলতান আইউবীর এই গোয়েন্দাকে পলায়নের কাজে সহায়তা করার ইচ্ছা তার আছে। পারলে মজাটা জমতো ভালো। মেরিনার দম্ভ মাঠে মারা যেতো। কিন্তু তার কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
ইসহাক আবারও তাবু থেকে বেরিয়ে আসে। মেরিনা ও তাদের নেতা দূরে একস্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ইসহাক দৌড়ে তাদের নিকট চলে যায়। জিজ্ঞেস করে- ঘোড়া কোথায়?
কোথাও নেই- দলনেতা রাগান্বিত কণ্ঠে বললো- তোমার যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ।
ইসহাক কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। তার সঙ্গে না আছে তরবারী, না খঞ্জর। ইসহাক তাদের আসল পরিচয় জেনে গেছে। তথাপি বললো- আমার অবাক লাগছে, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তোমরা আমার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছো কেন?
যদি লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি বলল, তোমার সুলতানের জন্য কী বার্তা নিয়ে যাচ্ছিলে? খৃস্টান দলনেতা বললো।
শুধু এটুকু যে, আমাদের এক আমীর ইযযুদ্দীন নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবাকে বিয়ে করেছেন। ইসহাক উত্তর দেয়।
এই সংবাদ বাসি হয়ে গেছে- খৃস্টান দলনেতা বললো- তোমাদের সুলতান এ সংবাদ পেয়ে গেছেন দুমাস আগে। এখন তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আসল কথা বলল।
তোমরা কি আসল কথা বলে থাকো? ইসহাক জিজ্ঞেস করে।
আসল তথ্য, সঠিক তথ্য তোমাকে দিতেই হবে- খৃস্টান দলনেতা বললো- আর তোমাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। তোমার সাথে অন্ত্র থাকলেও আমাদের লোকগুলোর মোকাবেলা করতে পারতে না। আমি তোমার বেঁচে থাকার এবং রাজপুত্রের ন্যায় বেঁচে থাকার বুদ্ধি দিতে পারি। আমার প্রস্তাব মেনে নাও। আমাদের সঙ্গে চলো। আমাদের জন্য সেই কাজ করো, যা সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য করেছো আর বিত্ত-বৈভবের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করো।
খৃস্টান দলনেতা মেরিনার প্রতি ইঙ্গিত করে বললো- এর মতো মেয়েরা তোমার সেবার জন্য একপায়ে খাড়া থাকবে। কী দরকার এভাবে বনে বাদারে মরুবনে ঘুরে মরবে!
আমি ক্রুশের জন্য কাজ করবো?
না করবে তো আমাদের কয়েদখানার অন্ধকার পাতাল কক্ষে বন্দি হয়ে থাকবে- খৃস্টান দলনেতা বললো- সেটাই হবে তোমার জন্য জাহান্নাম। তুমি মরবেও না, জীবিতও থাকবে না। আমরা তোমাকে এমন শাস্তি দেবো, যার কল্পনাও হবে তোমার জন্য ভয়ঙ্কর। আমাদের সঙ্গে চলো। ফিরে তো আর যেতে পারবে না।
তা তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে কীভাবে?- ইসহাক বললো- আমি তোমাদের দলভুক্ত হওয়ার পর তোমরা আমাকে আমারই এলাকায় প্রেরণ করবে। তোমরা কীভাবে নিশ্চিত হবে, আমি নিজ এলাকায় থেকে যাব কিংবা তোমাদের ধোকা দেবে না?
আমাদের নিকট তার ব্যবস্থা আছে- খৃস্টান দলনেতা বললো তুমি নিজ অঞ্চলের কথা বলছে। আমরা ইচ্ছে করলে তোমাকে তোমার ঘরের গোপন ঠিকানা থেকেও বের করে আনতে পারবো। সেই বিদ্যা আমাদের আছে। তোমার ধারণা কী, তোমাদের দেশে আমাদের যতো গুপ্তচর আছে, তাদের মধ্যে তোমাদের দেশের কোন লোক কি নেই? দশজন গোয়েন্দার একটি দলে আমাদের লোক থাকে মাত্র দুজন। বাকিরা তোমাদেরই ভাই। আমাদেরকে ধোঁকা দেবে এমন সাহস তাদের কারো নেই। এমন দুঃসাহস দেখানোর পরিণতি কী তা তারা জানে। কেউ এমন অপরাধ করলে আমরা শুধু তাকেই হত্যা করি না, প্রথমে তার স্ত্রী-সন্তানদের এক এক করে হত্যা করে লাশগুলো তার সামনে রাখি। তারপর তাকে হত্যা করি। আর যে আমাদের অনুগত থেকে কাজ করে, তার জন্য জগতটাকে স্বর্গ বানিয়ে দেই। কেউ ধরা পড়ে গেলে তার পরিজনের সম্পূর্ণ দায়ভার আমরা বহন করে নেই।
