সুলতান আইউবী বর্তমান এবং অনাগত ভবিষ্যতের একটা সম্ভাব্য চিত্র এঁকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন, খৃস্টানরা অগ্রযাত্রা করে হাল্ব-মসুল অবরোধ করে নেয়ার আগে তিনি দ্রুতগতিতে অগ্রযাত্রা করবেন এবং বৈরুত অবরোধ করে ফেলবেন।
সুলতান আইউবীর এ এক চরম স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। বৈরুত অবরোধ করতে হলে তাকে শত্রুর এলাকা অতিক্রম করে যেতে হবে। পথেই সংঘাতের আশঙ্কা বিদ্যমান।
যা হোক, সুলতান আইউবী সম্ভাব্য সব ধরনের সকল শঙ্কা-বিপদের পরিসংখ্যান মাথায় নিয়ে সবরকম পরিস্থিতির মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। গোয়েন্দা রিপোর্ট ব্যতীত অভিযান-অগ্রযাত্রা ছিনি কমই করেছেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতির দাবি ভিন্ন। ইযুদ্দীনের নিয়ত কী এবং ওখানে রোজি খাতুনের প্রতিপত্তি আছে কিনা জানা খুবই প্রয়োজন ছিলো তার।
আলী বিন সুফিয়ানের প্রেরিত গোয়েন্দারা আনাড়ি কিংবা ভীতু নয়। তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা কায়রোতে পৌঁছানোর জন্য জীবন বাজি রাখা তাদের জন্য মামুলি ব্যাপার। একটা দীক্ষা তারা সবসময় মনে রাখে যে, অর্ধেক যুদ্ধ লড়াই শুরু হওয়ার আগেই গোয়েন্দারা জয় করে থাকে। তারা এও জানে, একজন গোয়েন্দার কর্তব্য অবহেলা কিংবা ভুল তথ্য গোটা বাহিনীকে শেষ করে দিতে পারে। আবার একজন মাত্র গুপ্তচর দুশমনকে অস্ত্র সমর্পণ করাতে বাধ্য করতে পারে।
ইসহাক তুর্কির উপর আলী বিন সুফিয়ানের পরিপূর্ণ আস্থা আছে। লোকটি যেমন যোগ্য, তেমনি সাহসী। তদুপরি পরিপক্ক, ঈমানদার মুসলমান। আলীর এই আস্থা যথার্থ। ইসহাক তুর্কি দক্ষতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সগ্রহ করে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলো। সে সুলতান আইউবীকে অবহিত করতে আসছিলো যে, বল্ডউইনের ফিরিঙ্গি বাহিনী বৈরুতের আশপাশে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইযযুদ্দীনের ঝোঁক খৃষ্টানদের প্রতি। কাজেই সুলতান যেনো বৈরুতের দিকে পা বাড়ান। তদুপরি সুলতান যদি অগ্রযাত্রা করেনই,তার অনুকূলে ইসহাক ফিরিঙ্গি বাহিনীর বিস্তার ও অবস্থানের নকশা তৈরি করে আসছিলো। কিন্তু পথেই ইসহাক খৃস্টান গোয়েন্দাদের জালে আটকা পড়ে গেলো।
***
বলো, সেই তথ্যটা কী, যা তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট নিয়ে যাচ্ছো?- খৃস্টান গোয়েন্দা ইসহাককে জিজ্ঞেস করে। বললল- আমরাও মুসলমান। সুলতান আইউবীর সমর্থক ও অনুগত। তোমার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত আছে। খাদ্য-পানীয়ও ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সুলতানকে এরূপ সমর্থক-অনুগতদের থেকে নিরাপদ রাখুন-ইসহাক বললো- আমি এই মেয়েটাকে বলেছিলাম, মধ্যরাতে পর আমাকে তুলে দিও, আমি রাত থাকতেই রওনা হয়ে যাবে। কিন্তু তোমরা আমাকে জাগালে না। রাত কেটে দিনেরও অর্ধেকটা চলে গেছে। সময় তো নষ্ট হয়েছেই, তদুপরি এখন রওনা হলে ঘোড়া অতোটা পথ অতিক্রম করতে পারবে না যতোটা রাতে পারতো।
তুমি অনেক ক্লান্ত ছিলে- মেরিনা অস্নেহে বললে- এমন গভীর সুম ঘুমিয়েছিলে যে, আমি তোমাকে জাগিয়ে তোলা অবিচার হবে মনে করেছি। আমরা তোমার জন্য যে ঘোড়াটা প্রস্তুত করে রেখেছি, ওটা এতো ভালো যে, সময় যেটুকু নষ্ট হয়েছে তা পুষিয়ে দেবে।
ইসহাক তুর্কি এখনো বুঝতে পারেনি, যাকে ওরা ক্লান্তির পর গভীর নিদ্রা বলছে, আসলে তা কোন ওষুধের ক্রিয়ার অচেতনতা। এতো দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও তার শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে। ইসহাক শারীরিকভাবে এখনো ভ্রমণে সমর্থ নয়। তবু এক্ষুনি রওনা হওয়ার জন্য ব্যাকুল সে।
ইসহাকের যখন চোখ খুলেছিলো, তখন সূর্য মাথার উপরে উঠে এসেছে। খৃস্টান দলনেতা ও মেরিনা তার চৈতন্য ফিরে আসার আগেই তার কাছে এসে বসেছিলো। ইসহাক চোখ খুললে তারা তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। তারা এমন ধারায় কথা বলে যে, ইসহাক তুর্কির মনে কোন সন্দেহ জাগেনি। সে তার সকল পরিকল্পনার কথা বলে যাচ্ছে। তবে ইসহাক সুলতান আইউবীর জন্য কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছে তা বলছে না।
খৃস্টান দলনেতা তাঁবু থেকে বেরিয়ে যায়। ইসহাককে কুপোকাত করার জন্য রেখে যায় মেরিনাকে। চিত্তহারী মেয়ে মেরিনা ইসহাককে উত্তেজিত করে তোলার লক্ষ্যে বললল- আমি তোমাকে হৃদয়ের গভীর থেকে অলোবাসি। তাকে প্রেমের আহ্বানসহ আরো অনেক কথা বলতে থাকে মেরিনা।
কায়রো পৌঁছে প্রেমালাপের জন্য সময় বের করে নেবো- বললো ইসহাক- তুমি যদি আমাকে হৃদয় থেকেই কামনা করো, তাহলে আমাকে কর্তব্য পালনে সাহায্য করে।
ইসহাক উঠে দাঁড়ায়। লম্বা পায়ে তাবু থেকে বেরিয়ে যায়। বলতে শুরু করে- আমাকে ঘোড়া দাও, এক্ষুনি দাও।
কিছু খেয়ে নাও- মেরিনা ইসহাকের বাহু ধরে তাবুতে ফিরিয়ে নিতে নিতে বললো- আমি তোমাকে না খাইয়ে যেতে দিতে পারি না।
মেরিনা ইসহাককে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ ইসহাককে কোন কিছুই গলাতে পারছে না। তাঁবুতে নিয়ে মেরিনা ইসহাককে বসিয়ে দেয় এবং ভাবুর দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে হাঁক দেয় খাবার তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো, সময় নেই। উনি এক্ষুনি চলে যাবেন।
বারবারা খাবার নিয়ে এসে ইসহাকের সামনে রেখে পেছনে সরে দাঁড়ায়। মেরিনা ইসহাকের পার্শ্বে উপবিষ্ট। বারবারা মেরিনাকে পেছন করে দাঁড়ায়। ইসহাক খেতে শুরু করে। খাওয়ার মধ্যে ইসহাক বায়রার প্রতি তাকায়। বারবারা হাতে ক্ষুদ্র একটি কুশ লুকিয়ে রেখেছিলো। অতি সতর্কতার সাথে সেটি ইসহাককে দেখায়। নিজের বুকে হাত রেখে মেরিনার প্রতি ইঙ্গিত করে। তারপর বাইরের দিকে ইশারা করে আঙ্গুল নাড়ায় এবং আঙ্গুলটি নিজের ঠোঁটের উপর রাখে। বারবারা তাবু থেকে বেরিয়ে যায়।
