আমি আশাবাদী এই জন্য যে, নূরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের বিধবা মুহতারামা রোজি খাতুন ইযুদ্দীনকে বিয়ে করেছেন- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আপনি নিশ্চয়ই জেনেছেন, মুহতারামা রোজি খাতুন এই বিবাহ এ জন্য কবুল করেছেন, যেনো হালব ও মসুলের শাসক ও সেনাবাহিনী আমাদের পক্ষে কাজ করে। দ্র মহিলার এছাড়া বিবাহের আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?
তথাপি আমার সন্দেহ হচ্ছে- সুলতান আইউবী বললেন- সন্দেহের কারণটা হলো, ইযুদ্দীন খৃস্টানদের দ্বারা সরাসরি বেষ্টিত। নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি তলে তলে খৃষ্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে পারেন। ওখানকার খবরাখবর আমার তাড়াতাড়ি জানা দরকার। আমি কখনো অন্ধকারে পথ চলি না তুমি তো জানো।
আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন মহামান্য সুলতান। আলী বিন সুফিয়ান পরামর্শ দেন।
আমি বেশি দিন অপেক্ষা করবো না- সুলতান আইউবী বললেন তুমি জানো, আমি বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছি। এতো তোমার সম্মুখের ঘটনা, আমি দিন-রাত অবিশ্রাম বাহিনীকে মহড়া করাচ্ছি। গোপন কথাটা শুনে নাও, আমি হালব-মসুলের দিকে যাবো না। আমার টার্গেট এখন বৈরুত। এখন আর আমি প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়বে না। হা, মসুল প্রভৃতি অঞ্চলে যাওয়ার অর্থ হবে, আমি প্রতিরক্ষা লড়াই করতে যাচ্ছি। কিন্তু এখন আমার যুদ্ধ হবে আক্রমণাত্মক-মারমুখী। বৈরুত ফিরিঙ্গিদের হৃদপিণ্ড। হাত-পায়ে আঘাত হানার পরিবর্তে কেন দুশমনের হৃদপিণ্ডে এক আঘাত হেনে নিঃশেষ করে দেবো না। এখন আমি বাহিনীকে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। নিজ এলাকায় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকলে আমি কোনদিন বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছতে পারবো না। বুঝতে চেষ্টা করো আলী। ওদিক থেকে কোন সংবাদ এখনো না আসার কারণ কী। আমার দুটি তথ্যের প্রয়োজন। প্রথমত, বৈরুতে ফিরিঙ্গি বাহিনীর তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, হাবে ইযযুদ্দীনের উদ্দেশ্য কী। আমার জানার প্রয়োজন, আমরা আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না তো।
বৈরুতে ইসহাক তুর্কি আছে- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- নিজে না আসলে অন্য কাউকে পাঠিয়ে দেবে। আমি এখান থেকে কাউকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
আমি বেশি দিন অপেক্ষা করতে পারবো না আলী- সুলতান আইউবী বললেন- তুমি এখান থেকে কাউকে পাঠাবে। সে খবর নিয়ে যাবে, তারপর আসবে। এই যাওয়া-আসার মাঝে সময় ব্যয় হবে কমপক্ষে তিন, মাস। না, আমি এতোদিন অপেক্ষা করতে পারবো না। দিন কয়েকের মধ্যেই আমি বাহিনীকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেবো।
তা এই অগ্রযাত্রা কি অন্ধকারের পথচলা হবে না আলী বিন সুফিয়ান বললেন।
কমান্ডো ইউনিটগুলোকে অগ্রগামী বাহিনীরও অনেক সম্মুখে ছড়িয়ে রাখবো- সুলতান আইউবী বললেন- আমি আল্লাহর আদেশে তারই পবিত্র ভূমির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছি। নিজের নিরাপত্তার জন্য আমি মিসরে আরামে বসে থাকতে পারি না আলী।
১৯৮২ সালের কোন একদিন সুলতান আইউবী খৃস্টানদের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে তার প্রেরিত গোয়েন্দাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় অস্থির প্রহর গুনছেন। আপনারা পেছনে পড়ে এসেছেন, তার দুমাস আগে নূরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র আল-মালিকুস সালিহ- যিনি হাবের গভর্নর নিযুক্ত হয়ে সুলতান আইউবীর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুবরণ করেছেন। সুলতান আইউবীর সঙ্গে তার যুদ্ধ না করা এবং সুলতানের জোটভুক্ত হয়ে কাজ করার চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গোপনে গোপনে খৃষ্টানদের সঙ্গে মিতা রেখেছিলেন। তার মৃত্যু সংবাদ খৃস্টান ও সুলতান আইউবী উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আল-মালিকুল সালিহ মৃত্যুর পূর্বে ইযযুদ্দীন মাসউদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যান। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে ঘটনাটি, সেটি হচ্ছে ইমুদ্দীন-রোজি খাতুনের বিবাহ। নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী এবং আল-মালিকুস সালিহর মা এই বিয়ে সংসার পাতার জনা বরণ করেননি। সুলতান আইউবীর ভাই আল-আদিল ইবুদ্দীনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, এই বিবাহ হবে দামেশক ও হাবের বিবাহ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে গৃহযুদ্ধের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান শক্ত হবে। রোজি খাতুন শেষ পর্যন্ত এই বলে সম্মতি প্রদান করেন যে, তার ব্যক্তিগত সব কামনা-বাসনা মরে গেছে। তিনি শুধুমাত্র ইসলামের মর্যাদার খাতিরে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন।
রোজি খাতুন ত্যাগ স্বীকার করে নেন এবং ইযযুদ্দীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। হাল্ব এবং মসুলের প্রজাতন্ত্রগুলোর উপর বহুদিন যাবত খৃস্টানদের প্রভাব কাজ করে আসছিলো। যার ফলে এই প্রজাতন্ত্রগুলো সুলতান আইউবীর বিপক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায় এবং তিন বছর পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত থাকে। আপনারা তার বিস্তারিত কাহিনী পড়ে এসেছেন। এখন রোজি খাতুন ইযযুদ্দীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে খৃস্টানরা চিন্তায় পড়ে যায়, রোজি খাতুন খৃস্টানদের সবচেয়ে বড় শত্রু জঙ্গীর স্ত্রী। বিচক্ষণ এই মহিলা তো হা মসুল ও অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলসমূহ থেকে খৃস্টানদের প্রভাব নস্যাৎ করে দেবেন। ওদিকে মিসরে সুলতান আইউবী এই ভাবনায় অস্থির যে, খৃস্টানরা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ফেলে কিনা। সুলতান আরো ভাবছেন, আরবে তার অনুপস্থিতিতে খৃস্টানরা স্বার্থ উদ্ধার করার অপচেষ্টা করতে পারে।
