এ লক্ষ্যেই তো আমরা মুসলমানদের মাঝে আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়েদের ছেড়ে দেই- মার্টিন বললো- তাদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা কাজটা এ জন্য করি, যাতে ইসলামের পতন ঘটে এবং ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
মার্টিন বারবারাকে নিজের দিকে টেনে এনে ফিসফিস করে বললো এমন রাতটাকে নিরামিষ আলাপে বিস্বাদ করো না বারবারা! এসো বাইরে যাই। দেখো, চাঁদটা কতো সুন্দর!
আমার মনটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে- বারবারা বললো- আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমার হৃদয়ে ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। আমি কোথাও যাবো না। তুমি যেতে পারো।
একদিন এমন আসবে, তুমি আমার পায়ের উপর পড়ে কাকুতি-মিনতি করে বলবে, মার্টিন আমাকে বাঁচাও; ওরা আমাকে কুকুরের মুখে তুলে দিচ্ছে। তখন কিন্তু আমি তোমাকে সাহায্য করবো না।
এখনো আমি কুকুরের মুখেই আছি- বারবারা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- আমি কোনদিন তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবো না। তুমি এখান থেকে চলে যাও।
মার্টিন ক্ষুব্ধ মনে উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁবু থেকে বেরিয়ে যায়।
বারবারা মার্টিন চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং অপেক্ষা করতে থাকে মার্টিন কখন ঘুমিয়ে পড়ে। সে জানে, দলনেতা আর মেরিনার ফিরতে অনেক দেরি হবে।
খানিক পর বারবারা তাবু থেকে বের হয়। বসে বসেই সামনের দিকে এগুতে থাকে। সম্মুখের জায়গাটা সামান্য গভীর। বারবারা সেখানে নেমে পড়ে। সেখান থেকে ঝুঁকে ঝুঁকে কূপের পেছনে চলে যায়। অনেক দূর ঘুরে ইসহাক যে তাঁবুতে অবচেতন পড়ে আছে, সেখানে পৌঁছে যায়। বারবারা জানে না, ইসহাককে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে। সে তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়ে। বাতিটা জ্বলছে। বারবারা পা ধরে ইসহাককে নাড়া দেয়। কিন্তু ইসহাক জাগলো না। মাথা ধরে নাড়ায়। হাত ধরে টানে। কিন্তু না, কিছুতেই লোকটা নড়ছে না।
ওঠো হতভাগা!- বারবারা ইসহাকের গালে চড় মেরে বিরক্তির সাথে বললো- তুমি প্রতারণার জালে আটকা পড়েছে। আমরা সবাই গোয়েন্দা। তুমি কায়রো যেতে পারবে না। বৈরুতের কারাগারের অন্ধকার পাতাল প্রকোষ্ঠে নির্যাতনের মুখে ধুকে ধুকে মরবে।
ইসহাক অচেতন পড়ে আছে। যেনো মরে গেছে। বারবারা তাবুর বাইরে হাল্কা হাসির শব্দ শুনতে পায়। কিন্তু ভয় পায় না। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কিনা। শব্দগুলো নিকটে চলে আসার পরও মেয়েটি ইসহাকের নিকট বসে থাকে। হাসি আর ফিসফিস কথোপকথনের শব্দ তাঁবু পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। একটি কণ্ঠ মেরিনার। নেতার সঙ্গে কয়েদী দেখতে এসেছে।
আমরা মুসলমান- বারবারা ইসহাককে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে বললো- তোমাকে আমরা এমন একটি ঘোড়া দেবো, যে তোমাকে দুদিনের মধ্যে কায়রো পৌঁছিয়ে দেবে।
বারবারা! বারবারা! বারবারা দলনেতার কণ্ঠ শুনতে পায়। পেছন ফিরে তাকায়। দলনেতা ও মেরিনা দাঁড়িয়ে আছে। নেতা বললো- এই মুহূর্তে তুমি তোমার কর্তব্য পালন করতে পারবে না। লোকটাকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে।
এটা আমার শিকার বারবারা- মেরিনা তাচ্ছিল্যভরা হাসি হেসে বললো এর থেকে কীভাবে তথ্য বের করতে হবে, সেটা শুধু আমিই জানি।
দলনেতা ও মেরিনা হেসে ওঠে। এই তিরস্কারের হাসি বুঝতে পারে বারবারা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বললো- আমি কোন ভুল করিনি, আমি আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম।
যাও, ঘুমিয়ে পড়ো। দলনেতা আদেশের সুরে বললো।
বারবারা উঠে দাঁড়ায়। তাঁবু থেকে বেরিয়ে যায়।
দলনেতা ইসহাকের শিরায় হাত রাখে। তারপর মেরিনাকে নিয়ে চলে যায়।
ইসহাক তুর্কি সুলতান আইউবীর জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে।
***
আলী বিন সুফিয়ান!- কায়রোতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাঁর ইন্টেলিজেন্স প্রধান আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন- ওদিক থেকে এ যাবত কোন সংবাদ আসেনি। তার অর্থ হচ্ছে, ওখানে কোন পরিবর্তন ঘটেনি, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমি বিষয়টা মানতে পারছি না।
আর আমিও মানতে পারছি না- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- ওখানে কোন পরিবর্তন আসবে, সমস্যা দেখা দেবে অথচ আমাদের নিকট কোন খবর আসরে না। ওখানে আমাদের যে লোক আছে, তারা সাধারণ গোয়েন্দা নয়। ইসহাক তুর্কিকে আপনি তো ভালো করেই জানেন। মাটির বুক চিরে তথ্য বের করে আনার মতো হিম্মত ও মোগ্যতা তার আছে। অন্যরাও তার মতোই বিচক্ষণ।
ওদিকে যেসব ঘটনার উদ্ভব হয়েছে, খৃস্টানরা তা দ্বারা স্বার্থ উদ্ধার করবেই- সুলতান আইউবী বললেন- বল্ডউইন তার ফিরিঙ্গি বাহিনীকে নিয়ে হাল্ব ও মসুলের আশপাশে অবস্থান করছে।
কিন্তু আল-মালিকুস সালিহ তো মারা গেছে- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- হালবের শাসক এখন ইযযুদ্দীন। তিনি তো খৃস্টানদের আনুগত্য করার মতো লোক নন।
আলী!- সুলতান আইউবী মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন- তুমি কি তাহলে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত? তুমি সম্ভবত এ জন্য ই্যুযুদ্দীনকে পরিপক্ক মুসলমান মনে করছে যে, আমি তাকে বন্ধু ভাবি এবং তার সাহায্যার্থে পরিকল্পনা বদল করে তালখালেদের উপর আক্রমণ করেছিলাম আর্মেনীয়দের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিলাম। তাই না? কিন্তু শুনে রাখো আলী। আমি আমার মুসলমান শাসক ও আমীরদের উপর ভরসা রাখতে পারি না। ইযযুদ্দীন আমাদের পক্ষভুক্ত শাসক হতে পারে। কিন্তু তার আমীর-উজীরদের মধ্যে খৃস্টানদের অনুগত লোকও আছে। আলী! তুমি কি দেখোনি, একজন ঈমানদার শাসকও মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের তোষামোদমূলক পরামর্শের জালে এসে মুমিন থেকেও দেশ-জাতিকে ভুল সিদ্ধান্ত দ্বারা ধ্বংসের অতলে নিক্ষেপ করে থাকে। আমি পরামর্শ পরামর্শকের বিরোধী নই। শিক্ষা গ্রহণের আগে পরামর্শ নেয়া কুরআনের নির্দেশ। কিন্তু যিনি শাসনকার্য পরিচালনা করেন, তার এতোটুকু বুদ্ধি বিচক্ষণতা থাকতে হবে, যেনো পরামর্শকদের উদ্দেশ্য ও চরিত্র বুঝতে সক্ষম হন। তোষামোদ-চাটুকারিতা রাজত্বের মোহকে চাঙ্গা করে তোলে। একসময় শাসক তোষামোদের সুর লহরীতে সুখনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত বুদ্ধির শাসক যত বড় যোদ্ধা কিংবা দুনিয়াবিমুখই হোক না কেন, জাতি ও মাতৃভূমিকে নিয়ে সাগরে ডুবে মরে। এমনি আশঙ্কা আমার ইম্যুদীনের ব্যাপার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।
