মেয়েটিকে সুলতান আইউবীর উচ্চপদস্থ একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার পেছনে নিয়োজিত করা হয়েছিলো। কিন্তু সে উদ্দেশ্যে সফল হতে পারেনি। দলনেতা টের পেয়ে যায়, বারবারা ও মেরিনার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। পরস্পর সহকর্মী হয়ে কাজ করার পরিবর্তে এখন তারা একজন অপরজনকে ঘায়েল করার সুযোগটাই কাজে লাগায়। এই পরিস্থিতি মিশনের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মেয়েটি এই দল ত্যাগ করে অন্য দলে যাওয়ার চিন্তা করে।
বারবারা দলনেতার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। মেরিনা তার সঙ্গে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়। নিজের অশুভ পরিণতি চোখের উপর ভাসছে মেয়েটির। আর এখন কিনা মেরিনা বলে ফেললো, বেশ্যাবৃত্তিই বারবারার মানানসই পেশা। প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে বারবারার মনে।
এই লোকটার কাছ থেকে তথ্য কেবল আমিই বের করতে পারবো মেরিনা বললো- এ কাজ বারবারার সাধ্যের অতীত।
বারবারা ক্ষুব্ধ মনে নিজের তাবুতে চলে যায়।
***
রাতে লোকটা পালাবার কোন সুযোগ পাবে না- দলনেতা বললো- এ যাবত পালাবার কোন কারণও নেই। তথাপি সতর্ক থাকতে হবে। লোকটাকে অজ্ঞান করে রাখো।
খানিক পর মেরিনা ইসহাকের তাঁবুতে প্রবেশ করে। ইসহাক শুয়ে আছে। প্রদীপটা জ্বলছে। মেরিনার হাতে একটি রোমীল। রোমালটি অচেতনকারী ওষুধে ভেজা। মেরিনা পা টিপে টিপে ইসহাকের নিকট গিয়ে বসে পড়ে। রোমালটি ইসহাকের নাকের উপর রেখে কিছুক্ষণ পর সেটি সরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যায়। মেরিনা সঙ্গীদের জানালো- আগামীকাল সূর্য উঠার সামান্য পর হুঁশ ফিরে পাবে।
এবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো- দলনেতা বললো- আগামী দিন সালাহুদ্দীন আইউবীর এই গোয়েন্দাকে তার চাহিদা মোতাবেক ঘোড়া ঠিকই দেবো, তবে সেই ঘোড়ায় সে কায়রো নয়- আমাদের সঙ্গে বৈরুতে যাবে। লোকটা আমাদের সফরসঙ্গী হবে।
সুলতান আইউবীর একজন গোয়েন্দাকে নিজেদের কজায় নিয়ে আসা তাদের জন্য বিরাট সাফল্য। তারা উৎসবে মেতে ওঠে। মদের আসর বসায়। সাফল্যের আনন্দে মেরিনার পা যেনো মাটিতে পড়তে চাচ্ছে না।
কিন্তু আজ বারবার মনে আনন্দের পরিবর্তে তুষের আগুন জ্বলছে। ফুর্তিতে যোগ না দিয়ে নিজ তাঁবুতেই ব্যথিত মনে অবস্থান করছে।
দীর্ঘ রাত পর্যন্ত আমোদ-ফুর্তিতে কাটিয়ে প্রত্যেকে যার যার তাঁবুতে চলে যায়। দলনেতা মেরিনাকে নিয়ে একসাথে চলে যায়।
ব্যর্থ ও বেদনাহত বারবারা নিজ তাঁবুতে বসে অস্থির সময় অতিবাহিত করছে। অন্তরে তার প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। বাইরের আসরের হৈ-হুঁল্লোড় তার আগুনকে আরো উত্তেজিত করে তুলেছে। বারবারা উঠে তাবুর পর্দা ফাঁক করে উঁকি দিয়ে বাইরে তাকায়। দেখে, তাদের দলনেতা, আর মেরিনা টিলার দিকে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তারা টিলার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়।
বারবারার কানে মেরিনার কণ্ঠ বাজছে- একমাত্র আমিই তার কাছ থেকে তথ্য বের করতে পারবো। বারাবারার মাথায় চিন্তা জাগে, ইচ্ছে করলে আমি মেরিনাকে ব্যর্থ করতে পারি। একটা পন্থা এই হতে পারে, আমি ইসহাককে বলে দেবো আমরা সকলে খৃস্টান গোয়েন্দা, তুমি সতর্ক হয়ে যাও। আবার সহযোগিতা দিয়ে লোকটাকে ভাগিয়েও দিতে পারি। প্রতিশোধ আগুনে প্রজ্জ্বলমান বারবারার মাথায় নানা ভাবনা জাগে।
সকলের ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে বারবারা। তার চোখে ঘুম আসছে না। এমন সময় তাঁবুর পর্দা সরে যায়। কে যেনো ফিসফিস শব্দে তাকে ডাকছে।
বারবারা বুঝতে পারে কে এসেছে।
চলে যাও মার্টিন- বারবারা ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো- চলে যাও এখান থেকে।
মার্টিন চলে যাওয়ার পরিবর্তে তাঁবুতে ঢুকে পড়ে এবং বারবারার পাশ ঘেঁষে বসে- তোমার হয়েছেটা কী বলো তো? তুমি কি মনে করো, দলনেতা মেরিনাকে হৃদয় থেকে ভালোবাসে? তুমি কি বিশ্বাস করো, তোমাকে সে মন দিয়ে ভালোবেসেছিলো? এ সবকিছুই তার বদমায়েশী ও ফষ্টিনষ্টি। বারবারা! তুমি অযথা হৃদয়ের উপর অস্থিরতার বোঝা চাপিয়ে কর্তব্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছো। তুমি যদি সত্যিকার ভালোবাসার প্রত্যাশী হয়ে থাকো, তাহলে সেটা তুমি আমার কাছ থেকেই আশা করতে পারো। আমি তোমাকে অন্তর থেকে কামনা করি। তুমিই বলো, আমি কি তোমাকে কখনো ধোকা দিয়েছি?
তোমরা আপাদমস্তক প্রতারক- বাবারা ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো- তোমরা প্রত্যেকেই ধোকাবাজ। আমি আমার কর্তব্য থেকে সরে যাইনি। তবে আমার হৃদয় জগতটার প্রতিই অনীহা এসে গেছে। আমাদেরকে শৈশব থৈকেই প্রতারণার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে যে, আমরা মুসলমানদের ধোকা দিয়ে ক্রুশের মোকাবেলায় তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে দেবো। কিন্তু সেই বিদ্যা আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছি। গলায় কুশ ঝুলিয়ে আমরা অপকর্ম করছি এবং একে অপরকে ধোঁকা দিচ্ছি। মুসলমানরা আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান। তারা গুপ্তচরবৃত্তি-নাশকতার কাজে মেয়েদের ব্যবহার করে। আমাদের নেতা আমাকে ভালোবাসার টোপ দিলেন। কিন্তু মেরিনা বেশি চালাক বলে তাকে হাত করে নিলো। তুমি আমাকে দখল করার চেষ্টা করছে। ফল দাঁড়াচ্ছে, এখন আমরা পুরো দলটিই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছি। তোমাদের সঙ্গে যদি আমরা দুটি মেয়ে না থাকতাম, তাহলে তোমরা অত্যন্ত সফলতার সাথে কর্তব্য পালন করতে সক্ষম হতে। নারীর উপস্থিতি পুরুষদের মধ্যে শত্রুতার জন্ম দিয়ে থাকে।
