ইসহাকের সঙ্গে মেয়েটির যেসব কথাবার্তা হয় এবং তার মুখ থেকে যেসব কথা বের করে, মেয়েটি দলের লোকদেরকে সব জানায়।
এটি বণিক কাফেলা নয়। এরা সবাই খৃস্টানদের গুপ্তচর এবং নাশকতার কর্মী। মিসরে দায়িত্ব পালন করে এখন ফিরে যাচ্ছে কিংবা অন্য কোন অঞ্চলে যাচ্ছে। সঙ্গে রক্ষীও আছে। দশ-বারোজন পুরুষ। দুটি মেয়ে। মেয়ে দুটি অত্যন্ত রূপসী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ছদ্মবেশ ধারণ করেছে বণিকের। তাদের সঙ্গে উট আছে, ঘোড়া আছে। ছায়া-পানি দেখে এখানে অবস্থান নিয়েছে। সন্ধ্যার খানিক আগে তারা দূর থেকে ইসহাককে দেখতে পায়। দুজন পুরুষ ও একটি মেয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে।
ইসহাক তুর্কি তাদেরকে দেখেছিলো। কিন্তু এই দেখাকে সে কল্পনা এবং মরিচিকা মনে করেছিলো। তার পরক্ষণেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো। খৃস্টান পুরুষ দুজন আর মেয়েটি তার কাছে যায়। মেয়েটি বললো, লোকটা সাধারণ মুসাফির মনে হয় না। পুরুষ দুজন অভিমত ব্যক্ত করে, আনাড়ি কোন পথচারীই হবে। অন্যথায় এ দশা ঘটতো না। তথাপি ইসহাকের শারীরিক গঠন-আকারে তাদেরও কিছুটা সন্দেহ জাগে, অন্য কিছু হতে পারে। কিছুটা সন্দেহ, কিছুটা কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে তারা ইসহাককে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসে এবং এই তাঁবুতে শুইয়ে দেয়। ফোঁটা ফোঁটা করে ইসহাকের মুখে পানি ও মধু ঢালে। ইসহাক বিড় বিড় করে ওঠে। ইসহাক অচেতন ছিলো। এই অচেতন অবস্থা আর ঘুমের মধ্যেই মানুষের মস্তিষ্ক জেগে ওঠে। গোয়েন্দাদের বিশেষভাবে নির্দেশনা দেয়া থাকে, যেনো তারা শত্রুর এলাকায় অচেতন না হয়। অজ্ঞান অবস্থায় অনেক সময় তার কাছ থেকে গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে। মরুভূমি ইসহাককে অসহায় ও অচেতন করে দিয়েছিলো। অন্যথায় তার যথেষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিলো। অচেতন অবস্থায় যদি তার মুখ থেকে বিড় বিড় শব্দ বের না হতো, তাহলে কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারতো না।
ইসহাক বিচক্ষণ ও কৌশলী হওয়া সত্ত্বেও চেতনা ফিরে পেয়ে এখন সে খৃস্টান মেয়ের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে। মেয়েটি সুদক্ষ খৃস্টান গোয়েন্দা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মেয়েটি নিশ্চিত হয়ে যায়, লোকটি মুসলমান এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর। তাঁবুর বাইরে গিয়ে সে সঙ্গীদের জানায়, আমার সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এই সুদর্শন লোকটি সুলতান আইউবীর গোয়েন্দাই বটে।
বড় শিকার- দলনেতা বললো- এখন জানতে হবে, লোকটা কী তথ্য নিয়ে যাচ্ছে এবং কোথায় কার নিকট যাচ্ছে।
তথ্য কোথা থেকে এনেছে জানার পর আরো জানতে হবে, ওখানে তারা। কতোজন আছে এবং তাদের আস্তানা কোথায়। দলের একজন বললো।
কিন্তু আমাদের পরিচয় সে যেনো বুঝতে না পারে- দলনেতা বললো আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দাদের ভালো করে জানি। তারা মৃত্যুকে বরণ করে নেবে; তবু তথ্য দেবে না। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
ঐ মুসলমানগুলোকে আমিও ভালোভাবেই জানি- মেয়েটি অর্থবহ মুচকি হেসে বললো- তথ্য তো দেবেই, নিজের খঞ্জর দ্বারা নিজের হৃদয়টাও বের করে আমার পায়ের উপর রাখবে।
তুমি সেই মুসলমানদেরু জানো, যারা ক্ষমতা আর বিত্তের নেশায় মাতাল হয়ে গেছে- অপর এক খৃস্টান বললো- সাধারণ মুসলমান আর সাধারণ সৈনিকের পাল্লায় তুমি পড়েনি। তোমাদের দ্বারা বিভ্রান্ত মুসলমানরাই সম্পদ ও মর্যাদার গোলাম হয়ে থাকে। কিন্তু যেসব মুসলমানের নিকট ঐশ্বর্যের স্থলে ঈমান বড়, তাদের কাছে গিয়ে দেখো।
দলে আরো একটি খৃস্টান মেয়ে আছে। সেও এই বৈঠকে উপস্থিত। এ পর্যন্ত সে কোন কথা বলেনি। দলনেতা তার প্রতি তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- তুমি এই মুসলমানটার কাছ থেকে তথ্য বের করতে পারবে না বারবারা।
মেয়েটি মুখ তুলে দলনেতার প্রতি তাকায়।
দলনেতা আবার বললো- তুমি কায়রোতে আমাদের অনেক ক্ষতি করেছো। মেরিনার দক্ষতা দেখো এবং তার থেকে শেখো। আমি তোমাকে আর সুযোগ দেবো না। মেরিনার দক্ষতার কথা চিন্তা করো। আমরা সবাই লোকটাকে পথভোলা পথিক মনে করেছিলাম। কিন্তু মেরিনা ঠিকই ধরে ফেলেছে, লোকটা মূল্যবান শিকার হবে। আমি তোমাকে এ জন্য মিসর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি যে, তুমি ক্রুশের উপকার করার পরিবর্তে ক্ষতি করছো।
তোমার পরিণতি খুবই মন্দ হবে বারবারা- অপর এক খৃষ্টান বললো এই পেশায় তোমরা একজন রাজকন্যার মর্যাদ পেয়ে থাকে। কিন্তু তুমি এই মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। তারপর কারো গনিকা কিংবা বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া তোমার আর কোন উপায় থাকবে না।
উহ্! পাশ থেকে মেরিনা ঘৃণা প্রকাশ করে বারবারার উদ্দেশে বললো- এ তো যোগ্যই এ কাজের।
বারবারা ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে মেরিনার প্রতি তাকায়। রাগে-ক্ষোভে তার চেহারা লাল হয়ে গেছে। কিন্তু কোন কথা বলছে না। মেয়েটি মেরিনার মতোই রূপসী ছিলো। কিন্তু মিসর যাওয়ার পর তার দক্ষতায় ভাটা পড়ে যায়। সমস্যাটা সৃষ্টি করেছে দলনেতা। লোকটা পদস্থ অফিসার এবং সুদর্শন যুবক। বারবারাকে তার ভালো লাগতো। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েটির সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারা দুজনে দুজনার হয়ে যায়। কিন্তু এই দৃশ্য মেরিনার সহ্য হয় না। সে তার কূটচাল প্রয়োগ করে দলনেতাকে বারবারা থেকে সরিয়ে নিজের মুঠোয় নিয়ে আসে। তার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলা শুরু করে দেয়। বারবারার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বারবারা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে এবং কর্তব্য পালনে অবহেলা শুরু করে। এই সুযোগে মেরিনা এমনও পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায় যে, বারবারার সন্দেহে নিপতিত হয়ে ধরা পড়ার উপক্রম হয়। কিন্তু শেষমেশ রক্ষা পেয়ে যায়।
