এই কথোপকথনকেও ইসহাক তুর্কির কল্পনা মনে হতে লাগলো। কিন্তু সে জানে না, এই কণ্ঠ সেই দুই পুরুষ ও এক মেয়ের, যাদেরকে সে মরুদ্যানে নিজের সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখেছিলো। তাদেরকে সে কল্পনা বলে মনে করেছিলো। কিন্তু আসলে তারা বাস্তবে মানুষ ছিলো- কল্পনা নয়।
তুমি এর কাছে বসে থাকো- একজন বললো- জ্ঞান ফিরে এলে পানি পান করতে এবং কিছু খেতে দিও। তারপর তার পরিচয় জানা যাবে। লোকটি বাইরে বেরিয়ে যায়।
ইসহাক ধীরে ধীরে চোখ খুলে। ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি তার কানে আসে। সে পুরোপুরি সজাগ হয়ে যায় এবং উঠে বসে। অলক্ষ্যে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে- এই ঘোড়াটা আমাকে দিয়ে দাও।
নাও, সামান্য পানি পান করো- ইসহাক একটি নারীকণ্ঠ শুনতে পায়। এক মেয়ে এক পেয়ালা পানি হাতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। মেয়েটি বললো- সামান্য পান করে নাও। একসঙ্গে সবটুকু পান করো না, অন্যথায় মারা পড়বে।
পিপাসাকাতর ইসহাকের পানির বড় প্রয়োজন। মেয়েটির পরিচয় জানার চেষ্টা করে ইসহাক। পানির পেয়ালাটা হাতে নিয়ে ঠোঁট লাগিয়ে কয়েক ঢোক পান করে। তারপর পেয়ালাটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে বললো আমি জানি, এরূপ অবস্থায় বেশি পানি পান করা ঠিক নয়।
ইসহাক মেয়েটাকে পরখ করে। যুবতী মেয়ে। পোশাক-আশাকে এই অঞ্চলের মরু যাযাবরদের মতো হলেও গঠন-আকৃতি ও চেহারায় এখানকার মেয়েদের মতো নয়। মাথায় পেঁচানো রোমালের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান চুলও যাযাবর মেয়েদের মতো মনে হলো না। ইসহাক ভাবে, এই অঞ্চলে তো কোন সম্ভ্রান্ত ধনী ঘরের মেয়েদের আসার কথা নয়। এখানে সাধারণত যাযাবররাই আসে।
তুমি কি কোন কাফেলার সঙ্গে আছে? ইসহাক মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে।
হা- মেয়েটি জবাব দেয়- আমি এক বণিক কাফেলার সঙ্গে আছি। আমরা ব্যবসায়ী। তুমি কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাচ্ছো?
ইসহাক তুর্কি উত্তর দেয়ার পরিবর্তে পানির পেয়ালাটা আবার ঠোঁটে লাগায়। কয়েক ঢোক পান করে। আস্তে আস্তে তার শরীরে সজীবতা ফিরে আসছে। চিন্তা করার শক্তি ফিরে পেয়েছে ইসহাক। তার মনে পড়ে যায়, সে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা এবং নিজের আসল পরিচয় যাবে বলা না।
আমিও একটি বণিক কাফেলার সঙ্গে ছিলাম- ইসহাক চিন্তা করে উত্তর দেয়- এক রাতে এখান থেকে দূরবর্তী এক স্থানে একদল দস্যু আমাদের কাফেলার উপর আক্রমণ চালিয়ে সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। উট-ঘোড়াগুলোও নিয়ে গেছে। আমি একা ওখান থেকে পালিয়ে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছি।
আমি তোমার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করছি। বলেই মেয়েটি বেরিয়ে যায়।
ইসহাক তুর্কি একটি তাঁবুতে বসা। প্রদীপ জ্বলছে। ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে সে বাইরের দিকে তাকায়। জোৎস্না রাত। বাইরে ফকফকা চাঁদের আলো। তিন-চারজন লোককে ঘোরাফেরা করতে দেখতে পায় ইসহাক। মেয়েটির গাল ভরা হাসি শুনতে পায় সে। পরক্ষণে মেয়েটিকে তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। ইসহাক পেছনে সরে গিয়ে নিজ জায়গায় বসে পড়ে। তাঁবুতে প্রবেশ করে মেয়েটি ইসহাকের সামনে খাবার রাখে। ইসহাক খেতে শুরু করে।
তুমি কি এখন কায়রো যাচ্ছো? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
না- ইসহাক মিথ্যা উত্তর দেয়- আমি ইস্কান্দারিয়া যাচ্ছি।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তো কায়রোতে আছেন- মেয়েটি মুচকি হেসে বললো- ইস্কান্দারিয়া গিয়ে কী করবে?
সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আমার আবার কী সম্পর্ক! ইসহাক বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললো।
আমাদের তো আছে- মেয়েটি বললো- তিনি আমাদের সুলতান। তাঁর নির্দেশে আমরা জীবন কুরবান করতেও প্রস্তুত আছি।
ভালো কথা- ইসহাক বললো- কিন্তু আইউবী কায়রোতে আছেন সে কথা আমাকে বললে কেন?
শোন- মেয়েটি ইসহাকের মাথায় হাত রেখে বললো- তোমার একটি ঘোড়া দরকার। তুমি সুলতান আইউবীর নিকট যাচ্ছে। আমরা তোমাকে সাহায্য করবো। তোমাকে ঘোড়া দেবো। তুমি অনেক তাড়াতাড়ি সুলতানের নিকট পৌঁছে যাবে।
এসব তুমি কীভাবে জানলে? ইসহাক বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
ও কথা জিজ্ঞেস করো না- মেয়েটি বলছে- তুমি তোমার কর্তব্য পালন করছে। আমাদের দায়িত্ব আমাদেরকে পালন করতে দাও। তোমাকে ঘোড়া দিয়ে প্রমাণ করবো, আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি।
মেয়েটি এমন ধারায় কথা বললো যে, ইসহাক চিন্তায় পড়ে যায়। বললো- হ্যাঁ, আমাকে অনেক তাড়াতাড়ি সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছতে হবে।
জরুরী কোন সংবাদ আছে মনে হয়?
ওসব জিজ্ঞেস করো না- ইসহাক উত্তর দেয়- সব কথা বলাও যায় না। সবকিছু সকলের জানারও প্রয়োজন নেই।
আমি তোমার ঘোড়ার ব্যবস্থা করছি- মেয়েটি উঠতে উঠতে বললো- তুমি বিশ্রাম নাও। রাত সবে মাত্র শুরু হয়েছে। শেষ প্রহরে রওনা হলেই চলবে।
মেয়েটি তাবু থেকে বেরিয়ে যায়। ইসহাক তুর্কি বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
***
কে না বলেছিলে ওকে ওখানেই মরতে দিলে ভালো হতো?- মেয়েটি তাঁবুর বাইরে গিয়ে দলের লোকদের বললো- ওস্তাদ মানে আমাকে? লোকটা আইউবীর গুপ্তচর। বলছে কি জানো, বলছে, আমাকে একটা ঘোড় দাও, সুলতান আইউবীর নিকট তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। লোকটা যখন অচেতন অবস্থায় বিড় বিড় করছিলো, তখন আমি কান পেতে শুনছিলাম, সে আইউবীর নাম উচ্চারণ করে বলছে, আমি বড় মূল্যবান তথ্য নিয়ে এসেছি।
