সূর্যটা মাথার উপর উঠে এসেছে। পায়ের তলার বালি উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। ইসহাক টিলাময় অঞ্চলে পথ চলছে। ডান-বাম মোড় ঘুরে ঘুরে হাঁটছে ইসহাক। অঞ্চলটির বালুময় জমিন প্রমাণ করছে এ পথে ইসহাক ছাড়া অন্য কোন মানুষের আগমন ঘটেনি।
ইসহাক হাঁটছে তো হাঁটছেই। এই ডানে মোড় তো পরক্ষণেই বামে। আসলেই কি সে পথ অতিক্রম করছে কিছুই বুঝতে পারছে না ইসহাক।
এভাবে এক স্থানে মোড় ঘুরতে গিয়েই হঠাৎ চমকে ওঠে দাঁড়িয়ে যায় ইসহাক। মাটিতে পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। চিহ্নটা তারই পায়ের, যা অপর একটি টিলার পাশ হয়ে মোড় ঘুরে গেছে। ইসহাক বুঝে ফেলে, সে মরুভূমির নিঃসীম বিপজ্জনক ধোঁকায় পড়ে গেছে। যতোই হাঁটছে, একটুও অগ্রসর হচ্ছে না। কারণ, এতোক্ষণ যাবত হাঁটার পরও সে টিলাময় অঞ্চল থেকে বের হতে পারেনি।
ইসহাক পার্শ্বের টিলার উপর উঠে যায়। চতুর্দিকে চোখ মেলে তাকায়। তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা গোল গোল উঁচু উঁচু বালির স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। সূর্যের আগুন আর বালির উত্তাপ ইসহাকের দেহের রস চুষে নিতে শুরু করেছে। পা দুটো যেন কয়েক মণ ওজন হয়ে গেছে।
ইসহাক পানি পান করে। দিকটা আন্দাজ করে নীচে নেমে আসে। কিন্তু পরিস্থিতি যাই হোক, মাথাটা ঠিক রেখে কাজ করতে হবে। প্রতিটি মোড় মুখস্ত করে রাখতে হবে। এসব ক্ষেত্রে তার প্রশিক্ষণও আছে। এখন প্রশিক্ষণটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে সে।
ইসহাক আবার হাঁটতে শুরু করে। এখন সে প্রতিটি টিলা, প্রতিটি মোড় হিসেব করে করে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু মরুভূমির নির্মমতা তার মাথাটা ঘুলিয়ে ফেলছে। ইসহাকের সহনশক্তি অস্বাভাবিক। অন্যথায় বহু আগেই তাকে বালির বিছানায় শুয়ে পড়তে হতো।
এখন বিকাল। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। ইসহাক মরুভূমির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু এখন তার দেহের ভার বহন করার শক্তি নেই। কর্তব্যের অনুভূতিটাই তাকে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।
ইসহাক সম্মুখপানে তাকায়। দেখে, কতগুলো ঘোড়া সারিবদ্ধ হয়ে তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ঘোড়ায় একজন করে আরোহী। ইসহাক হাঁক দেয়। আবার উচ্চকণ্ঠে ডাকে। কিন্তু কোন সাড়া নেই। ঘোড়াগুলো আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইসহাক তুর্কি দাঁড়িয়ে যায়। চোখ দুটো বন্ধ করে মাথাটা সজোরে একটা ঝাঁকুনি দেয়। সে বুঝে ফেলে, আসলে ওগুলো ঘোড়া নয়- কল্পনা। ওগুলো মরিচিকা, যা কিনা মরুভূমির ভয়ানক এক প্রতারণা।
এখন পা টেনে টেনে হাঁটছে ইসহাক।
***
ইসহাক অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে। এখন দিন না রাত সে বুঝতে পারছে না। এক স্থানে তার পা ফসকে যায়। পড়ে গিয়ে গড়াতে গড়াতে নীচে চলে যায়। তার খানিকটা চৈতন্য ফিরে আসে। সে এদিকে-ওদিক তাকায়। তীব্র পিপাসা অনুভব করে। পিপাসায় কণ্ঠনালীতে কাঁটা বিঁধছে যেনো। ঠোঁট দুটো শুকনো কাঠের ন্যায় খসখসে হয়ে গেছে। কিন্তু তার কাছে না আছে পানির মশক, না আছে খেজুরের থলে। ওগুলো কোথায় হারিয়ে এসেছে খবর নেই।
ইসহাক এখন অনেকটা অসহায় ও হতাশ। তবুও চলার চেষ্টা করছে। যেদিকে তাকায় শুধু সাদা সাদা পরিচ্ছন্ন অগ্নিশিখা দেখতে পাচ্ছে। শিখাগুলো যেনো তাকে গোল বৃত্তের ন্যায় ঘিরে রেখেছে।
সে দাঁড়িয়ে যায়। এক স্থানে তিনজন লোক দেখতে পায়। দুজন পুরুষ, একজন নারী। তিনজনই এক নাগাড়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকগুলোর পেছনে সামান্য দূরে খেজুর গাছও চোখে পড়ে ইসহাকের। তাদের সন্নিকটে টিলা। ইসহাক তুর্কি এসবকেও কল্পনা জ্ঞান করে এবং মরিচিকা বলে ধারণা করে। তার হতাশা আরো বেড়ে যায়। তাতে দেহের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে যায়। ডাকাডাকি করে লাভ নেই। কাল্পনিক দৃশ্য আর মরিচিকারা তো সাড়া দিতে পারে না। মরিচিৎকার কাজ পথচারীদের লোভ দেখিয়ে কাছে টানা আর নিজে পেছনে সরে যাওয়া। এক সময় তার পেছনে পেছনে ছুটে চলা মানুষটি পরাজিত হয়ে লুটিয়ে পড়ে আর মরুভূমির বালি তার চামড়া-মাংস চুষে চুষে কংকালে পরিণত করে।
ইসহাক তুর্কির মধ্যে এতোটুকু জীবন অবশিষ্ট আছে, সে লোকগুলোকে কল্পনা বলে স্থির করেছে। কিন্তু চলার জন্য সম্মুখপানে পা ফেলা মাত্র পা দুটো নিথর হয়ে দুদিকে সরে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে মরুভূমির মরিচিকা-কল্পনা সব ঘন অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
ইসহাক চৈতন্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আবার ধীরে ধীরে তার চৈতন্য ফিরে আসে। কারো কথপোকথন কানে আসছে তার। ইসহাক বালির উপর লুটিয়ে পড়েছিলো। তখন পায়ের নীচের বালিগুলো আগুনের উপর রাখা লোহার পাতের ন্যায় গরম ছিলো। কিন্তু এখন জ্ঞান ফিরে আসার পর ইসহাক শীতলতা অনুভব করছে।
ওখানেই মরতে দেয়া ভালো ছিলো- ইসহাক পুরুষালী কণ্ঠ শুনতে পায়- এখন তুলে বাইরে ফেলে দাও। লোকটা পথভোলা কোন পথিক হবে হয়তো।
না, লোকটা কোন সাধারণ পথচারী মনে হচ্ছে না। আরেকটি পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেলো।
হুশ ফিরে আসুক- এবার নারীকণ্ঠ- আমার সন্দেহ হচ্ছে। লোকটা অচেতন অবস্থায় বিড় বিড় করছিলো। বলছিলো, কায়রো আর কতো দূর? সুলতান…। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী! আপনি সতর্কতার সঙ্গে কায়রো থেকে বের হবেন। আমি অনেক মূল্যবান সংবাদ নিয়ে এসেছি। লোকটাকে আমি একটু যাচাই করে দেখবো।
