ঘোড়াটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ইসহাক বুঝতে পারে, দংশনের আগে কিংবা পরে সাপটা ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়েছে। এখন তার চলচ্ছক্তি অবশিষ্ট নেই। ইসহাক তুর্কি সাপটার মাথাটা পায়ের নীচে পিষে ফেলে।
ঘোড়াটা বাঁচার আশা নেই। মরুভূমির বিচ্ছু আর এ জাতের সাপ এতোই বিষাক্ত যে, যাকে দংশন করে, সে পানি পান করারও সুযোগ পায় না। মরুভূমির পথিকরা প্রখর সূর্যতাপ এবং দস্যুদেরও এতো ভয় করে না, যতোটা করে এই সাপ-বিচ্ছুকে। এই সাপ মেঠো ও পাহাড়ী অঞ্চলের সাপের ন্যায় বুক টেনে সামনের দিকে অগ্রসর হয় না। এরা পাশের দিকে এক বিস্ময়করভাবে চলাচল করে থাকে।
ইসহাক হতাশ নয়নে ঘোড়াটার প্রতি তাকায়। ঘোড়াটা সজোরে কেঁপে ওঠে। মুখটা হা হয়ে গেছে। পাগুলো বাইরের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে কোন সাহায্য করার ক্ষমতা ইসহাকের নেই। উন্নত জাতের যোদ্ধাঘোড়া। ঘাস-পাতা, তরুলতাহীন মরু বিয়াবান, ক্ষুৎপিপাসা কিছুই আমলে নেয় না।
এরূপ একটি ঘোড়ার মৃত্যুতে ইসহাকের বিরাট ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হলো, এখন তাকে পায়ে হেঁটে কায়রো পৌঁছতে হবে। তাকে অতি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার কথা ছিলো। বুকে করে যে মূল্যবান তথ্য ইসহাক নিয়ে যাচ্ছিলো, তা যদি যথাসময়ে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছানো না যায়, তাহলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ইসহাক অনুতপ্ত চোখে ঘোড়াটার দিকে তাকায়। ঘোড়ার একটা পায়ের উপর তার দৃষ্টি পড়ে। ক্ষুরের সামান্য উপরে কয়েক ফোঁটা রক্ত জমে আছে। সাপটা এখানেই দংশন করেছে।
ঘোড়া মরে গেছে। ইসহাক ঘোড়ার যিন থেকে খেজুরের থলে এবং পানির মশক খুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। মৃত সাপটার প্রতি তাকিয়ে ঘৃণার সাথে বললো- সাপ আর খৃস্টানের স্বভাব একই।
***
ইসহাক টিলাময় এলাকা থেকে বেরিয়ে গেছে। উপর থেকে সূর্যটা যেনো আগুন ঢালছে। ১১৮২ সালের এপ্রিল মাস। বসন্তকাল। কিন্তু মরু এলাকায় কখনো বসন্ত আসে না। ইসহাক তুর্কির সামনে এখন বালির সমুদ্র। বালি এমনভাবে চিক চিক করছে, যেনো এই আধা মাইল পথ অতিক্রম করলেই পানি পাওয়া যাবে।
ইসহাক এখনো সজীব-তরতাজা। খেজুরের থলে, মশক, তরবারী আর খঞ্জরের ভার তার অনুভবই হচ্ছে না। চলার গতি তীব্র। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব কায়রো পৌঁছে যাওয়ার প্রত্যয় এখনো বিদ্যমান।
ইসহাক হাঁটছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ডুবে গেছে।
একস্থানে সামান্য সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি দেয় ইসহাক। কয়েকটা খেজুর খেয়ে পানি পান করে। মিনিট কয়েক শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে উঠে বসে।
ইসহাকের মনে বেজায় আনন্দ যে, এক মহা-মূল্যবান তথ্য নিয়ে সুলতান আইউবীর নিকট যাচ্ছে সে। পানাহারের প্রয়োজনটা বেশি অনুভব করছে না ইসহাক। তার আত্মা পরিতৃপ্ত। কর্তব্যপরায়ণ মানুষ যখন কর্তব্য আদায় করে ফেলে, তখন তার আত্মা আনন্দিত হয়। ইসহাক তুর্কিও আত্মিক আনন্দে পরিতৃপ্ত।
ইসহাক উঠে দাঁড়ায়। তারকার দিকে তাকায়। দিক নির্ণয় করে হাঁটতে শুরু করে।
মরুভূমির রাত ততোটা শীতল হয়ে থাকে; যতোটা উত্তপ্ত থাকে দিন। তাই মরু অঞ্চলে রাতের সফর আরামদায়ক।
ইসহাক হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে তার মনের পাতায় অনেক কিছু ভেসে ওঠে। চিন্তা করে, এতো দীর্ঘ পথ এই সামান্য সময়ে অতিক্রম করতে পারবে কি। কোন নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী-উজ্জ্বারোহী যদি পাওয়া যায়, তাহলে তার বাহনটা কেড়ে নিয়ে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিংবা যদি কোথাও অবস্থানরত কাফেলা পাওয়া যায়, তাহলে তাদের একটা উট বা ঘোড়া চুরি করে একটা বিহিত করা যায়। এছাড়া আর কোন উপায় দেখছে না ইসহাক।
ইসহাক আশায় বুক বেঁধে পথ চলতে থাকে। রাত অতিক্রান্ত হচ্ছে। ইসহাকের পায়ের তলা থেকে মরুভূমি ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে। এখন তার ক্লান্তি অনুভব হতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্লান্তি, ঘুম, ক্ষুধা ও পিপাসা কয়েকদিন পর্যন্ত সহ্য করার প্রশিক্ষণ তার আছে। ইসহাক ক্লান্তির প্রথম অনুভূতিটা একটা সঙ্গীতের কাছে পরাজিত করে দেয়। সে গান গাইতে শুরু করে- যুদ্ধের গান।
রাতের শেষ প্রহরে ইসহাক এক স্থানে বসে পড়ে। সামান্য পানি পান করে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।
এখনো সূর্য উদিত হয়নি। ইসহাক সজাগ হয়ে যায়। ক্ষিধেয় পেটটা ঠো চো করছে। কিন্তু এই ক্ষুধাটাকেও জয় করে নেয় ইসহাক। এক ঢোক পানিও পান না করে হাঁটতে শুরু করে। গন্তব্য এখনো অনেক দূর। তাই যে সামান্য, খেজুর-পানি আছে, তা এখনই শেষ করা যাবে না।
দূর থেকে আরেকটি বিপদ চোখে পড়ছে ইসহাকের। বালির গোল গোল অসংখ্য টিলা। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে টিলাগুলো। দেখতে সবগুলো এক রকম। সবগুলোর উচ্চতাও প্রায় সমান। অপরিচিত কোন লোক তার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লে বের হতে পারবে না। এলাকাটা একটা মরণ ফাঁদের রূপ ধারণ করে আছে। কারণ, অনেক পথিক একই টিলার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মনে করে সে পথ অতিক্রম করছে। আসলে সে গন্তব্যের দিকে না গিয়ে টিলার চতুর্দিকেই ঘুরছে। মরু বিশেষজ্ঞরাও এরূপ অঞ্চলকে ভয় করে।
ইসহাক তুর্কি প্রথমে ভাবে, দিক অনুযায়ী এই টিলাময় অঞ্চলটা তার অতিক্রম করার কথা ছিলো না। তাহলে কি সে ভুল পথে এসেছে? ইসহাক অস্থির হয়ে ওঠে। এখন তাকে সামনের দিকেই অগ্রসর হতে হবে। ইসহাক সম্মুখে এগিয়ে যায় এবং টিলার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে।
