ইযুদ্দীন ক্ষণিকের জন্য গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। পরক্ষণে আল আদিলকে বললেন- হঁ, আমি হাব ও দামেশকে এমন এক সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করতে পারি, যা কখনো ছিঁড়বে না। কিন্তু…। কিন্তু সেই সম্পর্কটা অটুট রাখার জন্য আপনি একটি কাজ বরং আমার একটি আকাঙ্খা পূরণ করে দিতে পারেন।… আমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবাকে বিয়ে করতে চাই যদি ভদ্র মহিলা রাজি হয়।
আমি আজই দামেশক চলে যাবো- আল-আদিল বললেন- আমি আশা করি তিনি সম্মত হবেন।
আল-আদিল দামে পৌঁছে যান। রোজি খাতুনকে পুত্রের মৃত্যুর সংবাদটা জানান। শুনে তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন।
আল-আদিল রোজি খাতুনকে জানালেন- আস-সালিহ ইযযুদ্দীনকে হাবের গবর্নর নিযুক্ত করে গেছে। আর… আর ইযুদ্দীন আপনাকে বিবাহ করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
রোজি খাতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এই পরিণয় আপনার আর ইযযুদ্দীনের নয়- আল-আদিল বললেন এই বিবাহটা হবে দামেশক ও হালবের। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে আগামীতে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং ক্রুসেড বিরোধী অভিযান আরো জোরদার হবে।
ঠিক আছে- রোজি খাতুন বললেন- ইসলামের মর্যাদার খাতিরে আমি এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলাম। আমার ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা বলতে কিছু নেই। ৫৭৭ হিজরীর ৫ শাওয়াল মোতাবেক ১৯৮২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইযুদ্দীন ও রোজি খাতুনের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়।
৭.৩ সাপ ও খৃস্টান মেয়ে
সাপ ও খৃস্টান মেয়ে
সাপটা দেড় বিঘতের বেশি লম্বা হবে না। কিন্তু প্রাণীটা ইসহাক তুর্কির এমন শক্তিমান ঘোড়াটাকে উপুড় করে ফেলে দিলো। গন্তব্য এখনো বহুদূর। সিনাই মরুদ্যানের অর্ধেক পথ এখনো বাকি।
ইসহাক তুরস্কের নাগরিক। সুঠাম দেহ, সুদর্শন চেহারা, আকর্ষণীয় গাত্রবর্ণ, নীলরঙা চোখ। দেখে কেউ বলতে পারবে না লোকটা মুসলমান না খৃস্টান। যেমন সুঠাম, তেমনি সুদর্শন। তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীতে যখন যোগ দেয়, তখন ইসহাক তুর্কির বয়স আঠার বছর। সৈনিকগিরি করে অর্থ উপার্জন তার উদ্দেশ্য ছিলো না। ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত এক সত্যিকার মর্দে মুমিন ইসহাক। ক্রুশের অনুসারীদের ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ইসহাক ইসলামের জন্য কাজ করতে দামেশক এসেছিলো। এসেই ভর্তি হয়ে যায় সুলতান আইউবীর বাহিনীতে। সুলতান আইউবী মিসরের গবর্নর নিযুক্ত হলে ইসহাক তুর্কিকে মিসর পাঠিয়ে দেয়া হয়। গর্বের সাথে নিজেকে তুর্কি দাবি করতো ইসহাক।
তুরস্কের বহু নাগরিক সুলতান আইউবীর বাহিনীর সৈনিক ছিলো। তাদের উপর সুলতান আইউবীর পরিপূর্ণ আস্থা ছিলো। সুলতান যখন কমান্ডো ফোর্স গঠন করেন, তখন তুর্কিদেরই বেশি নিয়োগ দান করেন। সেই ফোর্স থেকে গোয়েন্দা বাহিনীও গঠন করা হয়েছিলো। ইসহাক তুর্কি তাদেরই একজন।
বাহিনীতে যোগ দেয়ার পরপরই ইসহাক তুর্কি নিজেকে অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান-বিচক্ষণ ও দুঃসাহসী কমান্ডো প্রমাণিত করে। তাকে কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। তারপর তাকে খৃস্টানদের বিভিন্ন অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তির লক্ষ্যে প্রেরণ করা হয়।
অতিশয় কর্তব্যপরায়ণ ও দুঃসাহসী মানুষ ইসহাক তুর্কি। জীবনটা হাতে নিয়ে মাটির কয়েক স্তর নীচ থেকেও তথ্য বের করে আনার সাহস যোগ্যতা আছে তার।
কিন্তু এই মুহূর্তে সিনাই মরুদ্যানে দেড় বিঘত লম্বা সামান্য একটা সাপ কঠিন এক পরীক্ষায় ফেলে দিলো লোকটাকে।
ইসহাক তুর্কি খৃস্টান অধ্যুষিত মুসলিম অঞ্চলে কর্মরত ছিলো। সেখান থেকে চলে যায় হাব। এখন একটি নিরতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে কায়রোর পথে। সুলতান আইউবী এখন কায়রো। অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে হবে ইসহাককে। তাই অবিশ্রাম পথ চলছে লোকটা।
সবুজ-শ্যামল এলাকা থেকে বেরিয়ে এসেছে ইসহাক তুর্কি। সম্মুখে বালির সমুদ্র, যার ভেতর থেকে কোন পথভোলা পথিক কখনো জীবিত বের হয়নি।
মরুভূমি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর শত্রু। ইসহাক তুর্কি মরু বিশেষজ্ঞ। সবুজ অঞ্চল থেকে পানি সংগ্রহ করে ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে সে। পথটা তার জানাশোনা ছিলো। কোথায় কোথায় পানি আছে জানতো।
এই মরু অঞ্চলে একাধিকবার যুদ্ধও করেছে ইসহাক তুর্কি। হাল্ব থেকে রওনা হয়ে এ পর্যন্ত নির্ভয়ে-নিরাপদেই এসে পৌঁছেছে। খৃস্টান আর মরু যাযাবরদের ভয় করে না ইসহাক। এই যুদ্ধ-বিগ্রহ আর অবিরাম পথচলাকেই জীবন মনে করে লোকটা। তার বিশ্বাস, আল্লাহর সন্তুষ্টি এই জিহাদের মধ্যেই নিহিত।
সম্মুখে বিশাল মরু অঞ্চল। স্থানে স্থানে টিলা-পর্বত। ঘোড়াটাকে সামান্য বিশ্রাম দেয়ার জন্য একটি টিলার আড়ালে দাঁড়িয়ে যায় ইসহাক। দুপুরের সূর্যটা খানিকটা পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েছে। ইসহাক একটি টিলার আড়ালে ছায়ায় বসে পড়ে। তার চোখের পাতা বুঝে আসে।
খানিক পর ঘোড়াটা উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে। ইসহাকের চোখ খুলে যায়। ঘোড়াটা সামান্য জায়গার মধ্যে চারদিক ঘুরে ঘুরে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু বেশি দৌড়াতে পারলো না। থেমে গেলো। সমস্ত শরীর কাঁপছে প্রাণীটার।
কী হলো? ইসহাক এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে পায়, সে যে জায়গাটায় শুয়েছিলো, তার চার-পাঁচ পা দূরে দেড় বিঘত লম্বা একটা সাপ। সাপটার রং কালো। কালোর মধ্যে সাদা সাদা গোলাকার দাগ। সাপটা ছটফট করছে। লেজের দিক থেকে দেহের অর্ধেকটা থেতলানো।
